#পূর্ণতায়_তুমি_আমার
#শেখ_মরিয়ম_বিবি
পর্ব ০১
ফজরের আযানের পর মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে ঝিলিকের, বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে অযু করে নামাজ আদায় করে নিলো, তারপর মায়ের সাথে টুকটাক ঘরের কাজ করে নিজের কিছু কাজ শেষ করে তারপর আবার চলে যায় গোসল করতে, গোসল করে এসে সকালের নাস্তা খেয়ে তৈরি হতে থাকে,কারন আজ সে একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যাবে চাকরির ইন্টারভিউয়ের জন্য, ঝিলিক তৈরি হতে থাকুক এই সুযোগে আমি তার পরিচয় পর্বটি সেরে ফেলি,
কথক :- ঝিলিক নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়ে, দুই বোন এক ভাই,মা বাবা মিলে মোট পাচ সদস্যের পরিবার ,ঝিলিকের এস এস সি পরীক্ষার পর তার বাবার এক্সিডেন্ট হয় যার দরুন তিনি কর্মোক্ষম হয়ে পড়ে, বাবাই ছিল সংসারের একমাত্র আয় সম্বল মানুষ। আর সাধারণ ভাবেই তার এই দুর্ঘটনার প্রভাব তার পরিবারের উপরেই পড়ে,যার দরুন ঝিলিকদের তিন ভাইবোন কেই জীবিকার তাগিদে আর বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে রাস্তায় নামতে হয় , ঝিলিক প্রথমে একটা দর্জি কারখানায় কাজ করে কিন্তু সেখানকার পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারায় সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে পরে একটা বুটিকের দোকানে চাকরি নেয় তবে সেই চাকরিটা ও তাকে ছাড়তে হয় কারন ওখানে বেতন কম দিতো যার কারনে ওর পরিবারের খরচ চালাতে কষ্ট হয়ে পড়তো, আর কিছুদিন আগেই সে তার একজন পরিচিত লোকের কাছে শুনেছে গার্মেন্টসে বেতন বেশি দেয় আর অভার টাইম করলেও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পাওয়া যায় তাই সে সেই চাকরিটা ও ছেড়ে দেয় এবং আজ সে ঐ পরিচিত লোকের গার্মেন্টসে যাবে চাকরির ইন্টারভিউয়ের জন্য।
আপাতত এতটুকুই জেনে রাখুন বাকীটা ধীরে ধীরে জানতে পারবেন, এবার চলুন গল্পে ফেরা যাক।
কথক :-সকাল ৭.৪৫ মিনিট, ঢাকার নাম করা একটি গার্মেন্টস কোম্পানির সামনে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক মানুষ,এরা সবাই মুলত এই কোম্পানির কর্মচারী, একেকজন একেক পোস্টে কাজ করে। কোম্পানির ভিতরে ঢুকার সঠিক সময় কাটায় কাটায় সকাল ৮ টা ,এর এক মিনিট হেরফের হলেই বেতন কাটা,তাই সবাই চেষ্টা করে ঠিক সময় মতো আসার। সবার মতোই ঝিলিক ও তার সেই পরিচিত মানুষের সাথে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, চলুন এক ঝলকে জেনে নেই ঝিলিকের পরিচিত মানুষটি সম্পর্কে! সেই পরিচিত মানুষটি আসলে বিশেষ কেউ না তাদের সাথেই এক মহল্লায় অনেক বছর ধরে বাস করে,সেই সুবাদে তার মায়ের অনেকটাই ভালো মতো চেনাজানা যদিও ঝিলিক তার সাথে আগে খুব একটা মেলামেশা করেনি কিন্তু ঐ যে মায়ের চেনাজানা তাই সে নিশ্চিন্তে তার সাথে চলে এসেছে এমনিতে আমাদের ঝিলিক যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ,সবার কথায় তাল ও মেলায় না আর যার তার সাথে যেখানে সেখানে চলেও যায় না,ওহ হ্যা পরিচিত মানুষটির নাম হচ্ছে পারভীন আক্তার,তার একটি সাত বছরের ছেলে সন্তান আছে,স্বামী হারামজাদা আরেক বিয়ে করে সেই বউ নিয়ে পগারপার মানে কোথায় আছে কেউ জানে না আর পারভীন জানতেও চায় না ,সে তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ভালো আছে, আলহামদুলিল্লাহ!!! ছেলেটিকে মাদ্রাসায় রেখে হাফেজি পড়াচ্ছে আর নিজে গার্মেন্টসে কাজ করে মা ছেলের জীবিকার যোগান দিচ্ছে,এই হলো পরিচিত মানুষটির পরিচয়!
বিস্তারিত জানতে গল্পেই থাকুন!
ঝিলিক:- পারভীন আপু এরা সবাই কি একসাথেই কাজ করে?
পারভীন আক্তার:- হ,এরা সবাই এই ফ্যাক্টরির মানুষ,তয় সেক্টর আলাদা আলাদা।
ঝিলিক:- ওহ্!
পারভীন আর ঝিলিক নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, আশেপাশে কি হচ্ছে চলুন দেখে আসি!
কথক:- কোম্পানির বিল্ডিংয়ের সামনে ছোট্ট একটা চা সিগারেটের দোকান আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে এক হাতে চা ও অন্য হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আনন্দ, একবার চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে তো একবার সিগারেটে ঠোঁট লাগাচ্ছে ( ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, আর বিশেষ করে সম্পর্কের জন্য বিপজ্জনক,তাই ধুমপান না করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে ) এমন করেই একবার চায়ে চুমুক দিয়ে চোখটা এদিক ওদিক ঘুরাতেই মেইন গেইটের সামনেই যেন হঠাৎ করে চোখ আটকে গেল, দুর থেকে দেখা যাচ্ছে হালকা গোলাপি রঙের একটা ওড়নার মাঝে একটা হাসোজ্জ্বল চেহারা,কথা বলার মাঝে মাঝেই চোখটা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে, আবার হঠাৎ করেই মুখ টিপে হেসে উঠে,এসব দেখে আনমনেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল আনন্দের, হঠাৎ ই বেলের আওয়াজে ধ্যান ভাঙ্গে আনন্দের, হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ৮ টা বাজতে ৫ মিনিট বাকী, ফ্যাক্টরির ভিতরে ঢুকতে হবে তাই তাড়াতাড়ি করে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দোকানদারের বিল পরিশোধ করে মেইন গেইটের দিকে আগাতে থাকে সেই গোলাপী রঙের ওড়নার দিকে চেয়ে চেয়ে, কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই গোলাপী ওড়নাওয়ালী ভিতরে ঢুকে পরে তাই আর কিছু বলা হয় না তবে আনন্দ বুঝতে পারলো একে আগে কখনো এই কোম্পানিতে দেখেনি হয়তো নতুন জয়েন হয়েছে তাহলে কে করালো জয়েন আর কোন ফ্লোরে,আরো একটি বিষয় আনন্দ লক্ষ্য করেছে গোলাপী ওড়নাওয়ালীর সাথের মেয়েটাকে কেমন পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছিল কিন্তু কে সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা, পিছন দিক থেকে দেখার কারনে আনন্দ পারভীন কে চিনতে পারিনি ।( আপনারা আবার অন্য কিছু মনে কইরেন না)
কথক:-সবাই ভিতরে ঢুকে যার যার কাজে লেগে গেল, শুধু বসে রইল ঝিলিক একা। ঝিলিক এখানে নতুন দেখে অনেকেই এসে পরিচিত হলো, আবার কাজের সম্পর্কে,ফ্যাক্টরি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দিতে লাগলো!
এরকম করেই কেটে গেলো অনেকটা সময়,এর মধ্যে পারভীন একবার গিয়ে খবর নিয়ে এসেছে বস এসেছে কিনা,কারন বস আসলে ঝিলিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ও কে যেই কাজ করতে বলা হবে ও তাই করবে, কিন্তু বস না আসার কারনে ঝিলিক পারভীনের সাথেই বসে রইল আর টুকটাক কথার ফাঁকে ফাঁকে পারভীন কে সাহায্য করতে করতে নিজেও কিছু কাজ শেখার চেষ্টা করছে।
কথক:-সকাল এখন ৯.৩০ মিনিট, আনন্দ পুরো ফ্লোর ঘুরে পারভীন যেই সিরিয়ালে কাজ করে ঠিক সেই সিরিয়ালের প্রথম মেয়ে স্টাফের সাথে কথা বলছিল,মেয়েটার মেশিনে ডিস্টার্ব দিচ্ছে সেই বিষয়ে।
কথক:-এখন জেনে নেওয়া যাক আনন্দ সম্পর্কে, আনন্দ এখানে কি করে? আনন্দ এই গল্পের কোন চরিত্র বহন করবে?
আনন্দ হচ্ছে এই গার্মেন্টসের ফ্লোর ইনচার্জ, আনন্দ দেখতে সুদর্শন,ফর্সা,প্রায় ৬ ফুটের অধিক লম্বা, ফিটফাট ফিটনেসের অধিকারের একজন পুরুষ। অনার্স মাস্টার্স শেষ করে ভালো চাকরি না পাওয়ার কারনেই গার্মেন্টসে ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে কাজ নেয় তাও অবশ্যই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কারন এদেশের চাকরির বাজার সোনার বাজারের চাইতে বেশি গরম। যেদেশে অযোগ্য লোক যোগ্য জায়গা দখল করে বসে থাকে, বছরের পর বছর নিজের ভুড়ি বাড়াতে ব্যস্ত থাকেন, নিজের বউয়ের সোনার ব্যাংক তৈরিতে গরীবের শেষ সম্বল কেড়ে নিতে ও দ্বিধাবোধ করেন না, নিজেদের ছেলে মেয়েকে বিদেশ পাঠিয়ে স্বাধীনতা নামক উশৃঙ্খল জীবনযাপনে উৎসাহিত করে সেদেশের প্রতিনিধিরা আনন্দদের মতো পরিশ্রমী,মেধাবী, মধ্যবিত্তের- নিম্মবিত্তের ঘরের ছেলে মেয়েদের জীবনের যন্ত্রনা বুঝবে কি করে ? আর তাই তো আজ ঘুষ ছাড়া চাকরির বাজার অচল,কোথাও নেই মেধা আর পরিশ্রমের দাম,যার আছে টাকার জোর তার জন্য এ শহরের সব কিছুই আছে। ঠিক আনন্দ ও তেমনি ,গ্রামীন মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে,বাবা কৃষি কাজ করলেও গ্রামে তাদের অবস্থা মোটামুটি ভালো, একটা ছোট বোন,মা বাবা আর আনন্দ কে নিয়ে আনন্দের চার সদস্যের ছোট একটি পরিবার, ছোট বোনটি খুলনা মেডিকেল কলেজে পড়ে, মানে মেডিকেল স্টুডেন্ট! আর আনন্দ অনার্স মাস্টার্স শেষ করে প্রথমে সরকারি চাকরির জন্য অনেক ঘুরেছে কিন্তু ঐ যে হয় "মামার জোর নয় টাকার জোর " কিন্তু আনন্দের তো মামার জোর নেই আর টাকার জোরে সে চাকরি নিবে না কারন সে বিশ্বাস করে তার যোগ্যতা আছে তাহলে কেন সে টাকা দিয়ে চাকরি নিয়ে নিজের মেধা আর যোগ্যতাকে ছোট করবে তার চেয়ে বরং সেই চাকরিই সে করবে না। আর দেখা যাবে এই ঘুষের টাকা যোগার করতে গিয়ে তার বাবাকে সর্বশান্ত হতে হবে,তখন! তখন তার মা-বাবার, বোনের কি হবে ।থাক দরকার নেই এমন চাকরি করার যার জন্য নিজের পরিবারকে কষ্ট দিতে হয়,আর নিজের কাছেও ছোট হতে হয় । তাই একসময় সে সরকারি চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে নিজে থেকে কিছু করার চিন্তা করতে লাগলো কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারে এই গার্মেন্টসের ফ্লোর ইনচার্জ এর চাকরির কথা,এখানে নাকি ভালো ভাবে সার্ভিস দিতে পারলে এই কোম্পানির বিদেশের অফিসে ভালো পেমেন্টে ট্রান্সফার করিয়ে দেয়, সুতরাং আল্লাহ চাইলে এখানেও তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে পারে আর তাছাড়া বসেই বা থাকবে কতদিন,বাবার কাছ থেকে এখনো হাত পেতে টাকা চাইতে লজ্জা করে ,যেখানে এখন তার নিজের বাবা মায়ের একমাত্র বোনের দায়িত্ব নেওয়ার কথা সেখানে সে এখন ও.. এসব ভেবেই সে এই চাকরির ইন্টারভিউ দেয় এবং আল্লাহর রহমতে হয়েও যায় । আনন্দ এই কোম্পানিতে আছে তিনবছর ধরে, মোটামুটি সমস্ত কর্মচারীদের কাছেই আনন্দ খুব পছন্দের একজন মানুষ,অনেকের তো "দিলকি ধারকান"! কিন্তু আনন্দের এইসবে সময় নেই,সে ব্যস্ত তার ক্যারিয়ার নিয়ে তবে অবশ্যই সে অনেক ফ্রেন্ডলি ,সবার সাথেই বেশ হাসিখুশি ভাবেই মিলেমিশে কাজ করে ,তো এতক্ষনের পরিচয়ে নিশ্চিত বুঝে গেছেন উনি হচ্ছে আমাদের গল্পের হিরো,হ্যা উনি ই এই গল্পের নায়ক "আনন্দ জুবায়ের ফরাজী" !
কথক:-চলুন গল্পে ফিরে যাই।
কথক:-সবার সাথে দেখা করে কার কি সমস্যা জানতে জানতে আনন্দ ঠিক পারভীনের দুই মেশিন আগে এসে দাড়িয়ে ঐখানে থাকা মেয়ে স্টাফের সাথে কথা বলছিল তখনই পারভীন আনন্দ কে ডাক দেয়,
পারভীন:- আনন্দ ভাই।
কথক:-পারভীনের ডাক শুনে আনন্দ সেদিকে তাকায় আর তাতেই তার দৃষ্টি আবার ও থমকে যায়,মনে মনে বলে আরে এই টা তো সেই গোলাপী ওড়নাওয়ালী কিন্তু কে সে? ঝিলিক বিপরীতমুখী হয়ে কিছু একটা করছিলো তাই সে আনন্দের বিপরীত দিকে ছিল বলে আনন্দ এখনো তাক দেখতে পারিনি, হঠাৎ ই আবার পারভীনের ডাকে হুঁশ আসে আনন্দের সে একটু থতমত খেয়ে ই বলতে লাগলো
আনন্দ:- হ্যা, হ্যা, বলুন কি হয়েছে?
পারভীন:- একটু এদিক আসেন না ভাই,কথা ছিল!( অনুরোধে সুরে)
কথক:- শোনো আমি বুঝেছি তোমার কথা আমি অবশ্যই বসকে জানাবো দেখি উনি কি বলেন,তবে নিশ্চিত থাকো যাই হবে আমি জানাবো এই কথাটি ঐখানে থাকা মেয়ে স্টাফকে বলে পারভীনের দিকে এগিয়ে এসে বললো,হ্যা আপু বলেন আপনার কি কথা আছে, আনন্দ কথা তো বলছে পারভীনের সাথে কিন্তু ওর দৃষ্টি রয়েছে ঝিলিকের দিকে।
পারভীন ও ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের পিছনের দিকে তাকিয়ে ঝিলিক কে একনজর দেখে বলতে লাগলো আপনার সাথে ওর সম্পর্কেই কথা ছিল, আনন্দ কপাল কুঁচকে পারভীনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো ওর তাকানোর ভঙ্গিমা বুঝতে পেরেই পারভীন আবারও বলতে লাগলো,
পারভীন :- ভাই ওর নাম ঝিলিক, খুব অসহায় একটা মেয়ে, একটা চাকরির দরকার ছিল।
আমাদের এখানে তো লোক লাগবে তাই আমি ওকে আমার সাথে করে নিয়ে এসেছি।
আনন্দ:- ওহ,তো এখানে আমি কি করতে পারি?
পারভীন:-আমি সকালে একবার বসের রুমে গিয়ে দেখে এসেছিলাম কিন্তু তখন উনি আসেননি।তবে এখন আমার মনে হচ্ছে আমার চেয়ে আপনি সাথে করে নিয়ে গেলে বিষয়টি আরো ভালো হতো,না মানে আপনার আর আমার মাঝে তো তফাৎ তো আছেই, বুঝছেন আমি কি বলতে চাই?
আনন্দ:- হুম
কথক:-আনন্দ আর পারভীনের কথার মাঝেই ঝিলিক ওদের দিকে ঘুরে তাকায় আর আনন্দের দৃষ্টি আবার ও ঝিলিকের উপর পড়ে, একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে যার কারনে এক পলকের চোখাচোখি হয়ে যায়, পরক্ষনে ঝিলিক চোখ নামিয়ে নিলেও আনন্দের দৃষ্টি সেখানেই থম মেরে যায় কিন্তু পারভীনের কন্ঠস্বর শুনে সে নিজের মধ্যে ফিরে আসে তার পর বলতে লাগলো,
আনন্দ:- তো কাজকর্ম কিছু কি জানেন?
কথক:- ঝিলিক বলতে শুরু করতেই ওর কথার মাঝেই পারভীন বললো ,
পারভীন:- ভাই ও এই সেক্টরে নতুন,আগে কখনো গার্মেন্টসে কাজ করে নাই,তবে অনেক মেধাবী দুয়েক দিন দেখিয়ে দিলে ইনশাআল্লাহ সব কাজ ই পারবো।
আনন্দ:-হ্যা ঠিক আছে তবে যেহেতু কোন কাজ জানা নাই তাহলে আমার মনে হয় হেল্পার হিসেবেই নিবে।
কথক:- পারভীন একটু ইতস্তত করে বললো
পারভীন:- না ভাই আমি চাই না ও হেলপার হিসেবে জয়েন করুক, গার্মেন্টসের কাজ জানে না ঠিক আছে কিন্তু...!
কথক:-আনন্দ পারভীন কে থামিয়ে বলতে লাগলো,
আনন্দ:- দেখুন কাজ না জানলে কি করাবে,আর নতুন অবস্থায় প্রথম প্রথম তো হেলপার হিসেবেই নিবে, আপনি নিজেও তো তাই করেছেন, তাহলে এখন এইসব কেন বলছেন?
কথক:-পারভীন আনন্দের কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলতে লাগলো,
পারভীন:- আমি আর ও,আমি ওর মতো হলে তো কাজেই দিছিলো কিন্তু তা আর হওয়ার নয়!
কথক:- আনন্দ পারভীনের কথায় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
আনন্দ:- মানে?
পারভীন একবার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে আবার ও আনন্দের দিকে ফিরে বললো,
পারভীন:- ভাই আমি গন্ডমূর্খ , অশিক্ষিত মানুষ সামনে পিছনে এক ছেলে ছাড়া কিছুই নাই তাই আমি যা কামাই তাতে আমার দিন চইলা যায় কিন্তু এই যে এরে দেখতেছেন এ দেখতেই ছোট কিন্তু এর কাঁধে বয়ে বেড়ানো দায়িত্ব গুলো কিন্তু অনেক বড়।
ভালো পড়ালেখা জানা,একটা ভালো দোকানে চাকরিও করতো কিন্তু বেতনটা একদমই কম দিতো,ঘরে অসুস্থ বাবা, সংসারের নানারকম সমস্যা তো থাকেই এত কিছু না ভাই ঐ অল্প বেতনের চাকরি দিয়ে হয় না তাই চাকরিটা ছেড়ে দিছে আর আমিও ভরসা দিছি এখানে ভালো বেতনের চাকরির তাই আজকে আমার সাথে এইখানে আসছে। এখন আমি আপনার হাতে তুলে দিলাম। উপরে আল্লাহ নিচে আপনি একমাত্র ভরসা।
কথক:- একদমে কথাগুলো বলে থেমে গেল পারভীন । আনন্দ কিছু সময় মাথা নিচু করে রইল তারপর মাথা তুলে ঝিলিকের দিকে একবার তাকিয়ে পারভীনকে বললো,
আনন্দ:- দেখুন আমি বুঝতে পারলাম সব কিছু কিন্তু আমিও তো এখানে কাজ করি আমার কথায় তো আর সব হবে না,তাই না !
যাক গে,আমি বসের কাছে নিয়ে যাই তারপর দেখি বস কি বলে, আপনি চিন্তা করবেন না আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করবেন ইনশাআল্লাহ!!! উনার ভাগ্যে এখানকার কাজ থাকলে হবে অবশ্যই না হলে আর কি ই বা করার আছে?
পারভীন অনুরোধের সুরে বললো,
পারভীন:- ভাই প্লিজ!
কথক:- আনন্দ পারভীনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আশ্বাসের সাথে বললো দেখুন আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো আপনি চিন্তা করবেন না ,কথাটি বলে চলে যেতেই আবার ও পিছনে ফিরে ঝিলিকের উদ্দেশ্যে বললো,
আনন্দ:- আপনার নামটা যেন কি?
কথক:-ঝিলিক মৃদু হাসির সহিত বললো,
ঝিলিক:-জান্নাতুর নুসাইবা ঝিলিক!
কথক:- আনন্দ প্রশান্তির একটা হাসি দিয়ে বলল মাশাআল্লাহ!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিলো, তারপর আবার আনন্দের কথায় মাথা তুলে তাকালো, আনন্দ বললো আপনি এখানে আপার সাথেই কিছুক্ষণ বসুন,আমি পুরো ফ্লোরটা এক রাউন্ড দিয়ে আসি তারপর বসের রুমে নিয়ে যাবো, এখানে ই থাকবেন আমি নিজেই নিয়ে যাবো, ঠিক আছে?
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় সায় দিয়ে মাথা হিলিয়ে মৃদু স্বরে বলল জ্বী! আনন্দ ও মুচকি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। আনন্দ চলে যেতেই পারভীন আনন্দ সম্পর্কে ঝিলিক কে সব কিছু বুঝিয়ে বললো।
কথক:- সকাল ১০:১৫ মিনিট, মেহতাব মজুমদার নিজের কেবিনে বসে কিছু একটা করছিলেন, মাত্র কিছু সময় আগেই অফিসে এসে পৌছালেন,পিয়নকে চা আনতে বলে নিজের কাজে হাত দিলেন তখনই দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পান, সেদিকে না তাকিয়েই বললো ,
মেহতাব মজুমদার:+ কামিং
কথক:- আনন্দ দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে সালাম দিয়ে মেহতাব সাহেবের সামনে গিয়ে দাড়ায় আর মেহতাব সাহেব ও তার দিকে তাকিয়ে ভ্রকুটি করে জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
মেহতাব মজুমদার:- আরে আনন্দ,এখন এই সময় তুমি কিছু কি বলবে?
কথক:- আনন্দ কোনরকম ভনিতা ছাড়াই বলতে লাগলো,
আনন্দ:- স্যার আমাদের কোম্পানিতে নতুন কিছু লোক নেওয়ার কথা ছিল।।
মেহতাব মজুমদার:- হ্যা তো ?
আনন্দ:- স্যার আমার পরিচিত একটি মেয়ে আছে যার আপাতত একটা ভালো কাজের দরকার,তো আপনি যদি বলেন আমি তাকে নিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম,আসলে নিয়ে আসতে কি চাচ্ছিলাম, অলরেডি সে এখন আমার সাথেই আছে।
কথক:- মেহতাব মজুমদার কিছুক্ষণ ভেবে তারপর, অনেকটা আগ্রহী হয়ে বললেন,,
মেহতাব মজুমদার:- তোমার পরিচিত, গার্লফ্রেন্ড!!
কথক:- মেহতাব সাহেবের কথায় প্রথমে আনন্দ হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষনেই গার্লফ্রেন্ড কথাটা মনের মধ্যে একবার ভাবতেই লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো, আনন্দ কে এভাবে লজ্জা পেতে দেখে মেহতাব সাহেব এবার অনেকটা উচ্চ স্বরে হেসে দিলেন আর তার হাসিতে আনন্দের লজ্জার পরিমাণ আরো বেড়ে গেল, কিছু সময় হাসার পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললেন,,
মেহতাব মজুমদার:- যাও নিয়ে আসো আগে তারপর দেখি কি করতে পারি তোমার জন্য।
কথক:-মেহতাব মজুমদারের কথায় আনন্দ আশ্বস্ত হয়ে চলে গেলো পারভীনের কাছে, গিয়ে দেখে ঝিলিক এক গালে হাত দিয়ে টেবিলের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।
আনন্দ:- উহুম! উহুম!!
কথক:- হঠাৎ এমন শব্দের কারনে ঝিলিক সচকিত হয়ে পিছনে ঘুরে দেখে আনন্দ ওর ঠিক পিছনে অনেকটাই কাছাকাছি দাড়িয়ে আছে, আনন্দ কে নিজের এত কাছে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে গিয়েই পিছন দিকে ব্যালেন্স হারিয়ে পড়ে যেতে নিলেই আনন্দ শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরে ফেলে, ঝিলিক ও ভয়ে পেয়ে চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে ফেলে, দু হাত গুটিয়ে নিজের বুকের কাছে এনে রাখে, আনন্দ ঝিলিকের এই ভয় পেয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলাটা'য় বেশ মজা পেয়েছে তাই নিরবেই হেসে দিলো, হঠাৎ পারভীনের কন্ঠে দুজন'ই স্বাভাবিক হয়, আনন্দ ঝিলিকের কোমড় থেকে হাত সরিয়ে নিতেই ঝিলিক একটু দুরে সরে গিয়ে দাড়ায় । পারভীন দু'জনকে এই অবস্থায় দেখে একটু আশ্চর্য হয়ে কৌতুক করে বললো,
পারভীন :- কি হইছে ভাই ?
আনন্দ একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে তাই আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,
আনন্দ:- আম..আম... আমি আসলে এসেছিলাম,ববব বস এসেছে আমি উনার সম্পর্কে কথা বলে এসেছি, উনাকে নিয়ে যেতে বলেছে,চচচলুন আমার সাথে।
কথক:- ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বললো শেষের কথাটি।
পারভীন আনন্দের কথায় খুশি হয়ে একবার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে তারপর বললো,
পারভীন :- সত্যি!
আনন্দ:- হুম।
পারভীন:- ভাই আপনি সাথেই থাইকেন,নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু ঠিক করে দিয়েন।
আনন্দ:- অবশ্যই! চলুন । (কথক :- আনন্দ ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে শেষ কথাটি বললো।)
কথক:- ঝিলিক পারভীনের দিকে তাকিয়ে তার ইশারায় আশ্বস্ত হয়ে আনন্দের সাথে যেতে লাগলো, দুজন একটু আগ- পিছ হয়ে হাঁটছিল, আনন্দের কথায় আনন্দের দিকে তাকায়,
আনন্দ:- বাড়িতে কে কে আছে?
ঝিলিক:- মা, বাবা, আমি আর ছোট দুই ভাই-বোন।
আনন্দ :- আপনি বড়?
ঝিলিক :- হুম।
আনন্দ :- আর ভাই?
ঝিলিক :- সবার ছোট,বোন মেজো।
আনন্দ :- বাবার কি হয়েছে?
ঝিলিক :- এক্সিডেন্ট,বাস ধাক্কা দিয়ে ফেলে চলে গিয়েছিল!
কথক :-ঝিলিকে'র কথায় পিছনে ফিরে ঝিলিকের দিকে তাকায়, আনন্দের হঠাৎ এমন পিছনে ঘুরে যাওয়ায় ঝিলিক ও দাঁড়িয়ে পড়ে আর আনন্দের দিকে তাকায়,ঝিলিকের এই অসহায় মুখটা আনন্দের খুব খারাপ লাগছে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো যেভাবেই হোক ঝিলিক কে সে সাহায্য করবে।
আনন্দের এরকম ভাবে তাকিয়ে থাকার কারণে ঝিলিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে,তাই সে ডান হাত দিয়ে নিজের গলার নিচ চুলকাতে চুলকাতে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করে। আনন্দ আবারও প্রশ্ন করে,
আনন্দ :- পড়াশোনা কতটুকু করেছো?
ঝিলিক :- ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছি এই বছর , এখনো রেজাল্ট পাই নি।
( ## বি: দ্র :- পরবর্তীতে জানতে পারবেন ঝিলিকের ইন্টার পরীক্ষা দেওয়ার কাহিনী তাই কেউ প্লিজ গালিগালাজ কইরেন না। )
আনন্দ :- আলহামদুলিল্লাহ ! (সারপ্রাইজড হয়ে )
তাহলে এরপর কি আর পড়াশোনা করার ইচ্ছা নেই?
কথক :- আনন্দের এমন প্রশ্নে এইবার ঝিলিক পুরোপুরিভাবে আনন্দের দিকে চোখ তুলে তাকায় তারপর দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলে,
ঝিলিক:- কেন পড়বো না, নিশ্চয়ই পড়বো, ইনশাআল্লাহ !
কথক :- ঝিলিকের এমন আত্ন-বিশ্বাস দেখে আনন্দের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। ঝিলিক আনন্দের এমন হঠাৎ খুশির কারন বুঝলো না তবুও চুপ করে রইলো।
ঝিলিক কে চুপ থাকতে দেখে আনন্দ বললো, "চলুন বসের কেবিনে যাই"।
তারপর দুজনেই চুপচাপ হাঁটতে লাগলো।
আনন্দ (মেহতাব মজুমদার ) বসের দরজায় টোকা দিয়ে একটু ফাঁক করে জিজ্ঞেস করলো ,"স্যার আসবো? "
মেহতাব সাহেব:- ইয়েস।
কথক :- আনন্দ ঝিলিক কে সাথে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো, ঝিলিক একটু নার্ভাস অনুভব করছিলো তাই সে আনন্দের পিছনে গিয়ে দাড়ায়।বস ঝিলিক'কে দেখে আনন্দের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, "ওর কথাই বলেছিলে"? আনন্দ সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল যার অর্থ হ্যা।
তারপর উনি ঝিলিক কে সামনে এসে চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন,আর আনন্দ কে বললো চলে যেতে।বস আনন্দ কে চলে যেতে বলায় ঝিলিক মুখ ঘুরিয়ে আনন্দের দিকে তাকিয়ে রইল, আনন্দ ঝিলিকের চাহনি দেখেই বুঝলো যে ঝিলিক এখানে একা থাকতে ভয় পাচ্ছে তাই সে চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে বুঝালো চিন্তা নেই আমি এখানেই আছি। ঝিলিক আনন্দের চোখের ভাষায় আশ্বস্ত হয়ে বসের দিক মুখ ফিরালো, তখনই আনন্দ বললো।
আনন্দ:- স্যার আমি এখানে থাকলে কি কোন অসুবিধা হবে,না মানে আসলে ও একা এখানে একটু নার্ভাস ফিল করছে, নতুন পরিবেশ তো তাই,যদি আপনি অনুমতি দেন তো আমিও থাকি !
কথক :- বস আনন্দের দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন পারলে আনন্দ কে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে, বসের এরকম তাকানোর মানে বুঝে ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে ইশারায় বুঝালো আপনি চলে যান, আমি ঠিক আছি। কিন্তু আনন্দ তবুও দাঁড়িয়ে রইল তাই দেখে বস বললেন,
মেহতাব মজুমদার :- দেখ আনন্দ আমি বুঝতে পারছি তোমার গার্লফ্রেন্ড কে নিয়ে তুমি সচেতন কিন্তু কি বলো তো এটাতো একটা অফিস ,আর এখানে নিশ্চয়ই কিছু নিয়মনীতি আছে। আর আমি এখন যেহেতু তোমার গার্লফ্রেন্ডে'র ইন্টারভিউ নেবো তো সেখানে'তো আর তোমাকে এলাউ করতে পারি না তাই না! সুতরাং তুমি এখন আসতে পারো।
কথক :- আনন্দ মেহতাব সাহেবের কথার পিঠে বলার মতো কোন কথা খুজে না পেয়ে ঝিলিকের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বাইরে চলে গেল,আর এদিকে মেহতাব সাহেবের মুখে ঝিলিক "আনন্দের গার্লফ্রেন্ড" এই কথাটা শোনার পর ই ঝিলিক তব্দা খেয়ে চুপ হয়ে গেছে। ও শুধু মনে মনে এটাই বির-বির করছে আমি "ওনার গার্লফ্রেন্ড"!
ঝিলিকের হুঁশ ফিরে মেহতাব সাহেবের কর্কশ কন্ঠে।
মেহতাব মজুমদার :- তা তোমার নাম কি?
ঝিলিক:- জান্নাতু'র নুসাইবা ঝিলিক।
মেহতাব মজুমদার :- আগে কোথায় কাজ করেছো?
ঝিলিক :- একটা বুটিকের দোকানে।
মেহতাব মজুমদার (বস) :- সেখানে কি করতে?
ঝিলিক :- ডিজাইনার পোশাক বিক্রি করা, নতুন কাজের অর্ডার নেওয়া আর সব স্টাফদের কাজের হিসাব রাখা।
মেহতাব মজুমদার ( বস ) :- পড়াশোনা কতটুকু করেছো?
ঝিলিক :- এইবার ইন্টার দিয়েছি, এখনো রেজাল্ট দেয়নি ।
মেহতাব মজুমদার :- বাড়িতে কে কে আছে?
ঝিলিক :- মা বাবা, আমি আর ছোট দুই ভাই-বোন।
মেহতাব মজুমদার :- বাবা কি করে?
ঝিলিক:- উনি অসুস্থ,কোন কাজ করতে পারে না, আমরা তিন ভাই-বোন ই কাজ করে সংসার চালাই।
মেহতাব মজুমদার :- ওহ্, তো তাহলে গার্মেন্টসের কাজ সম্পর্কে তোমার পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা আছে?
ঝিলিক :- উহুম, না ।
কথক :- মেহতাব সাহেব কিছুক্ষণ ঝিলিক কে পর্যবেক্ষণ করলো তারপর বললেন,
মেহতাব মজুমদার :- তাহলে তোমাকে কি কাজে দেওয়া যায় বলতো? একটু ভাবুক হওয়ার চেষ্টা করে বললেন কথাটি মেহতাব মজুমদার।
কথক :- মাথা তুলে মেহতাব সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝিলিক বললো,,
ঝিলিক :- আমাকে দু এক দিন দেখিয়ে দিলে ইনশাআল্লাহ যেকোনো কাজই করতে পারবো!
মেহতাব মজুমদার ( বস ) :- আচ্ছা তোমার কাগজপত্র নিয়ে এসেছো ?
ঝিলিক :- জ্বী।
মেহতাব মজুমদার :- দেখি ।
কথক :- ঝিলিক তার ব্যাগ থেকে সার্টিফিকেট সহ বাকী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ ফাইলটি বসের হাতে দিলেন,উনি মনোযোগ দিয়ে সব কিছু দেখে তারপর ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
মেহতাব মজুমদার :- প্রোডাক্টের স্টোক মিলাতে পারবে?
কথক :- ঝিলিক মৃদু হেসে মাথা উপর নিচ করে বললো,
ঝিলিক :- জ্বী।
## নোট :- (গার্মেন্টস কোম্পানির কাজ সম্পর্কে আমার কোনরকম কোনো ধারনা নেই তাই কোনরকম ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ ।)
কথক :- তারপর বেতন সহ বাকী সুযোগ-সুবিধা সমূহ আলোচনা করে ঝিলিকের ডিউটি সম্পর্কে সব কিছু আনন্দ বোঝাবে বলে ঝিলিকের চাকরি কনফার্ম বলে জানিয়ে দিলো। ঝিলিক খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে যেতে নিতেই উনি বললেন,
মেহতাব মজুমদার :- তুমি বসো আমি আনন্দ কে ডাকছি ।
কথক :- আনন্দ দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল,যখন ই সে শুনলো পিয়নকে অর্ডার করা হচ্ছে তাঁকে ডেকে আনার জন্য তখনই সে দরজার মুখে এসে দাঁড়ায় তা দেখে বস নিজেই তাকে ভিতরে ঢুকতে অনুমতি দেয়, এবং তাকে জানানো হয় ঝিলিকের পোস্ট সম্বন্ধে এবং সব কিছু বুঝিয়ে দিতে বলা হয় ।
পর্ব ০২
কথক :- ঝিলিক, আনন্দ বসের কেবিন থেকে বের হয়ে আগে পারভীনের কাছে যাচ্ছিল তখনই ঝিলিকের বসের ঝিলিক কে আনন্দের গার্লফ্রেন্ড বলা কথাটি মনে পড়ে তাই ও হঠাৎ ই দ্রুত হেঁটে আনন্দের বরাবর হয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করে,
ঝিলিক :- আচ্ছা স্যার আমাকে আপনার গার্লফ্রেন্ড কেন বললো?
কথক :- ঝিলিকের প্রশ্ন শুনে আনন্দ থমকে দাঁড়ায়, কিছুটা ইতস্তত করে ঝিলিকের মুখের পানে চেয়ে বললো,
আনন্দ :- আসলে আপনি যেমন ভাবছেন তেমন কিছু নয়। আসলে আমি!
ঝিলিক :- আমি কি ভাবছি ? আমি তো শুধু জানতেই চাইলাম যে উনি কেন বারবার আমাকে আপনার গার্লফ্রেন্ড ভাবছেন! ( একটু ভাবুক হওয়ার ভান ধরে )
আনন্দ :- দেখুন আমি বিষয়টি পরিষ্কার করে বলছি। সকালে আমি যখন আপনার চাকরির কথা বলতে গিয়েছিলাম তখন আমি শুধু বলেছিলাম যে আমার পরিচিত একটা মেয়ে আছে যার একটা ভালো চাকরি দরকার,আর তাতেই উনি মনে করেছেন মেয়েটি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে হয়তো। আর আমিও বিষয়টি পরিষ্কার করিনি কারন আমার মনে হয়েছে যদি পারভীনের পরিচিত বলি তাহলে হয়তো নরমালি নিবে বিষয়টি আর পারভীনের মতোই কোন কাজে বসিয়ে দিবে যেটা আপনারা চাইছিলেন না,আর সত্যি বলতে আমিও চাইছিলাম আপনি কোন ভালো পোস্টে কাজ করুন। That's it ! এর বেশি কিছু না।( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
কথক :- ঝিলিক কিছুক্ষণ আনন্দের পানে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয় । আনন্দ ঝিলিকের মুখশ্রী দেখে বুঝতে পারলোনা যে ঝিলিক ওর কথা বিশ্বাস করেছে কি করেনি । তাই জিজ্ঞেস করে,যে আপনি কি বুঝতে পেরেছেন আমার কথা। আনন্দের কথায় ঝিলিক মাথা তুলে একনজর আনন্দ কে দেখে আবারও মাথা নুইয়ে উপর নিচ করে হালকা মৃদু স্বরে জ্বী বলে।ওর কথায় আনন্দ হাফ ছেড়ে বাঁচে। তারপর মুচকি হেসে বলে চলুন। পারভীনের কাছে গিয়ে বসের সাথে ঝিলিকের কথোপকথন আর শেষে চাকরি নিশ্চিত হওয়ার কথা এবং কোন পজিশনে কাজ করবে তাও জানায়।এতে করে পারভীন আর তার আশেপাশের সকল সহকর্মীরাও অনেক খুশি হয়। অনেকে দুষ্টুমি করে ঝিলিকের কাছে মিষ্টি খেতে চায়। আবার অনেকে এসে অভিনন্দন ও জানায়, সবসময় কাজে সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দেয়। ঝিলিক পারভীন কে সব বললেও আনন্দের ঝিলিক কে বসের কাছে নিজের গার্লফ্রেন্ড বলে পরিচয় দেওয়ার কথাটি এড়িয়ে যায়।কারন ও বুঝতে পেরেছে কথাটি বলার মাঝে আনন্দের কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই তাই এই বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই ভালো।
আনন্দ ঝিলিক কে সঙ্গে নিয়ে গার্মেন্টসের পুরো বিল্ডিংটি ঘুরে দেখালো। " Abiba Trendy Fashion garments & company Limited" ৭ তলা বিল্ডিং, নিচতলায় জুট আর থান কাপড়ের গোডাউন,২ য় তলায় তৈরি কাপড়ের ওয়াশ ও স্ত্রী করা, কোয়ালিটি চেক করা হয় ,৩য় ও ৪র্থ তলায় মেয়েদের সেকশন মানে মেয়েরা সেলাই সহ বাকী কাজ করে আর ৫ ম ও ৬ষ্ঠ তলার একাংশে ছেলেরাও সেলাইয়ের কারিগর হিসেবে কাজ করে অপর পাশে রেডি মালের স্টোক রাখা হয় ,৭ম তলায় কোম্পানির মালিক ও ম্যানেজারসহ বাকী স্টাফদের কেবিন এবং বায়ারদের প্রোডাক্ট দেখানোর জন্য কিছু অংশ জুড়ে শোরুমের মতো করে সাজানো হয়েছে। ছেলে মেয়ে উভয়দের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ আর সব কর্মচারীদের খাবারের জন্য সুব্যবস্থা করা রয়েছে ছাদে। সব ফ্লোরে যাওয়া আসার জন্য রয়েছে লিফটের সুব্যবস্থা।মোট কথা একটা অত্যাধুনিক গার্মেন্টস কোম্পানির সব ধরনের সুযোগ সুবিধাই রয়েছে এই কোম্পানিতে। পুরো বিল্ডিং ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলো আর এভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। সব দেখতে দেখতে ছাদে এসে পৌঁছালো আনন্দ আর ঝিলিক। ছাদে পা রাখতেই কারো উচ্চ স্বরে চিৎকারে শব্দ শুনতে পেল ওরা ঝিলিক একটু ভীত হলেও আনন্দ সামনে এগিয়ে গিয়ে চারদিকে ঘুরে খুঁজতে লাগলো সেই পরিবেশ দুষনকারী নাগরিককে, এবং পেয়েও গেল ঠিক তারা ছাদের যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার ডানপাশের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফোনে খুব উত্তেজিত হয়ে কথা বলছিল। আনন্দ লোকটির পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ধীর আওয়াজে বললো,(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
আনন্দ :- আস্তে! এত চিৎকার করে পরিবেশ দূষণ কেন করছিস? ( একটু দুষ্টুমি করে ছদ্ম রাগ দেখিয়ে)
কথক:- ছেলেটি পিছন থেকে কারো এধরনের কথায় কপাল কুঁচকে ঘুরে দাঁড়ায় ,ঘুরেই আনন্দকে দেখতে পেয়ে কপালের ভাঁজ করা চামড়াগুলো টানটান করে ফেলে কিন্তু ফোনে তার ঐ উগ্রভাবে চিৎকার চেঁচামেচি বন্ধ করে না আর তা দেখে আনন্দ বুঝতে পারলো যে সিরিয়াস বিষয় তাই সেও একটু গম্ভীর হয়ে গেল। ছেলেটি কথা বলা শেষ করে আনন্দের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আনন্দের পিছনে একটি মেয়েকে দেখে থেমে যায় তারপর আনন্দের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
ছেলেটি :- মেয়েটি কে ভাই?
কথক:- আনন্দ নিজের পিছনে ফিরে ঝিলিককে দেখে আবারও ছেলেটির দিকে ফিরে বললো,ও ঝিলিক,আজ থেকে আমাদের সাথেই কাজ করবে। ছেলেটি আনন্দের কথায় একনজর ঝিলিক কে দেখে আবারও আনন্দ কে জিজ্ঞেস করলো,
ছেলেটি:- আমাদের সাথে, মানে আমাদের সাথে ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে? ( অনেকটা আহম্মক মার্কা লুকস দিয়ে)
ছেলেটির কথায় আনন্দ ঝিলিক দুজনেই প্রথমে হতভম্ব হয়ে যায় পরবর্তীতেই আনন্দ বলে উঠে ,
আনন্দ:- আরে নাহ,ও ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে নয়। ও মালের স্টোক হিসাব রাখবে। আজই জয়েন করছে,এই কিছুক্ষণ আগে। তাইতো সব কিছু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য পুরো বিল্ডিংটা ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছি।
ছেলেটি:- স্টোক হিসাবের জন্য নতুন লোক কেন, মাজেদ ভাই কই?
আনন্দ:- মাজেদ ভাইতো গ্রামে গেছেন, আসার কথা তো এই সপ্তাহের মধ্যেই। কিন্তু বস কেন নতুন লোক রাখলো এই পোস্টের জন্য ঠিক বুঝলাম না। আমাদের তো অনেক পোস্টই খালি আছে যেখানে ওর মতো লোকের প্রয়োজন ছিল। কি জানি কি চলছে বসের মনে!
কথক :- শেষের কথাটি আনন্দ অনেক চিন্তিত হয়েই বললো। ছেলেটি আনন্দের কথায় সায় দিয়ে আনন্দের পিছনে তাকিয়ে ঝিলিক কে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো,নাম কি যেন? ও ঝিলিক তাই না!
ঝিলিক ছেলেটার কথায় হালকা মুচকি হেসে মাথা নাড়ায় যার অর্থ হ্যা সে ঝিলিক। ছেলেটি ঝিলিক কে হাসতে দেখে নিজেও মৃদু হেসে বললো আমার নাম সোহাগ। আনন্দ সোহাগের দিক থেকে নজর সরিয়ে ঝিলিকের দিকে চেয়ে বলতে লাগলো,( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
আনন্দ:- ও সোহাগ।আমার সহকর্মী, মানে ও হচ্ছে জুনিয়র ফ্লোর ইনচার্জ।
ঝিলিক :- (ছোট্ট করে বললো) ওহ।
আনন্দ :- আচ্ছা আপনি কি জানো তোমার পজিশনে আরেকজন আছে?
কথক :- ঝিলিক দ্রুত গতিতে দুদিকে মাথা নাড়ায় যার অর্থ না তাকে এইরকম কিছু বলেনি। আনন্দ ঝিলিককে আবারও জিজ্ঞেস করে কিছুই বলেনি? ঝিলিক এবারও মাথা দুদিকে নাড়ায় এবং স্পষ্ট স্বরে বলল না। ঝিলিক এর কথায় আনন্দ আর সোহাগ একে অপরের দিকে তাকায়। ওদের মুখশ্রী দেখে ঝিলিকের মনে একটু খটকা লাগলো তাই সে নিজের মনের কৌতুহল দমিয়ে না রেখে জিজ্ঞেস করেই ফেললো,
ঝিলিক :- আচ্ছা কি হয়েছে, কোন সমস্যা?
কথক:- ঝিলিকের কথায় আনন্দ আর সোহাগ আবারও একে অপরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে দুজনেই একসাথে বলে উঠে নাহ,কিছুই না! সব কিছু ঠিক আছে। আচ্ছা চলুন,পুরো বিল্ডিং তো দেখিয়েই দিলাম এখন আপনার কাজের সাথে জড়িত সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ঝিলিকের কথায় উক্ত কথাটি বলে সোহাগের উদ্দেশ্যে বললো চল যাই । সোহাগ আনন্দের কথায় মাথা নাড়িয়ে ছাদ থেকে নামার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে দেয় আনন্দ আর সোহাগ সামনে ঝিলিক ওদের থেকে একটু পিছিয়ে হাঁটছিল, হঠাৎ ই আনন্দ কিছু একটা বলার জন্য পিছু ফিরে বলতে লাগলো আচ্ছা আপনি.. আনন্দের কথায় ফোড়ন কেটে ঝিলিক বললো,
ঝিলিক :- আমি আপনার ছোট আমাকে তুমি করেই বলতে পারেন। (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
কথক :- ঝিলিকের কথায় আনন্দ মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়,সাথে সোহাগ বলে উঠে,
সোহাগ :- হ্যা আমিও তাই মনে করি। তাছাড়া এই আপনি আপনি শব্দটা কেমন পরপর মনে হয় আর এমনিতেও তুমি তো আমাদের ছোট বোনের মতোই।
কথক:- সোহাগের কথায় ঝিলিক মুচকি হাসলেও ছোট বোন শব্দটা শুনে আনন্দের কাশি উঠে যায়। সে এই ছোট বোন শব্দটা ঠিক নিতে পারছে না। কি করেই বা নেবে বেচারা হিরো,সে তো প্রথম দর্শনেই অন্য কিছু বানিয়ে নিজের মনের ঘরে জায়গা দিয়ে ফেলেছে,তো কিভাবে সে নিজের মনের ঘরের রানীকে ছোট বোন বানাবে!! আনন্দের কাশি উঠা দেখে সোহাগ ঝিলিক দুজনেই সামনে এগিয়ে এসে বলতে লাগে,
সোহাগ:- ভাই আপনি ঠিক আছেন? ( বিচলিত কন্ঠে)
ঝিলিক :- ভাইয়া Are you ok? পানি খাবেন?
কথক:- ঝিলিক এই কথা বলে নিজের সাইড ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে, এদিকে ঝিলিকের মুখে ভাইয়া ডাক শুনে আনন্দের কাশি যেন আরো বেরে যায়, অনেকটা যক্ষা রোগীর মতো। ঝিলিক বোতল বের করে বোতলের ক্যাপটা খুলে আনন্দের দিকে বাড়িয়ে দেয় আনন্দ তাড়াতাড়ি করে পানির বোতল থেকে পানি খেয়ে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে, তারপর জোরে জোরে শ্বাস নেয়। সোহাগ আনন্দের পাশে পা ভাঁজ করে বসে আনন্দের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে, ঝিলিক একটু নিচু হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করে,
ঝিলিক :- ভাইয়া খারাপ লাগছে? আরো একটু পানি খাবেন?
কথক:- ঝিলিকের মুখে আবারও ভাইয়া শুনে, এইবার আনন্দ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে,এমন করে ঝিলিকের দিকে তাকায় যেন এখনই ঝিলিক কে ঝলসে দিবে, ঝিলিক ও আনন্দের রক্ত চক্ষু দেখে ভরকে যায়।ও বুঝতে পারলো না হঠাৎ এই রাগের কারনটা।আর বুঝবেই বা কি করে,ওর তো তার সাথে পরিচয় হলো মাত্র ঘন্টা চারেক,আর তাছাড়া সে তো আর আনন্দের মনের খবর জানে না। সোহাগ ও আনন্দের এমন রিএ্যাকশনে হতভম্ব হয়ে যায় ।ও কিছুই বুঝতে পারছে না। আনন্দ আক্রোশ ভরা দৃষ্টি নিয়েই ঝিলিক কে বলতে লাগলো,
আনন্দ :- লিসেন আমার মায়ের পেটের আপন ছোট বোন আছে,তাছাড়া ও একগাদা কাজিন বোন আছে সুতরাং আমার কোন পাতানো বোনের দরকার নাই,বুঝছো!? ( হুমকি স্বরুপ)
কথক:-ঝিলিক আনন্দের কথায় পুরোই হতবাক! মানে কি? নিজের ভেতরে প্রশ্নটাকে লালিত না করে আনন্দ কে বলেই ফেললো,
ঝিলিক :- মানে কি? আমি বুঝলাম না,পাতানো বোন মানে! (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
আনন্দ :- মানে ক্লিয়ার ! আমাকে তুমি ভাই বলে ডাকবে না! না মানে না , একদমই না!
ঝিলিক:- কিন্তু সবাই তো নিশ্চয়ই ভাই বলে ডাকে তাহলে আমি কেন নই?
আনন্দ:- সবাই ডাকলে ডাকুক, তুমি ডাকবে না।
ঝিলিক :- তাহলে আমি কি বলে ডাকবো?
আনন্দ :- ভাই বাদে যা খুশি!
ঝিলিক :- তাহলে কি মামা কিংবা আংকেল বলে ডাকবো? ( মজার ছলে)
কথক :- আনন্দ তো পুরো হতভম্ব হয়ে যায়, মনে মনে বলে কি বলে এই মেয়ে আমি কি ওর আংকেলের বয়সী,আমাকে দেখলে কি অনেক বয়স্ক মনে হয় ? রাগে,দুঃখে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠে , ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
আনন্দ :- এই মেয়ে আমাকে দেখলে কি তোমার বাবার বয়সী মনে হয়, আমাকে কি চল্লিশ পঞ্চাশ বছর বয়সী বৃদ্ধ লাগে যে তুমি আমাকে মামা আংকেল ডাকবে?
কথক :- ঝিলিক আনন্দের এইরকম রিএ্যাকশন আর অদ্ভুত কথাবার্তায় পুরোই ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়,ও ভীতু ও কনফিউজড হয়ে আবারও জিজ্ঞেস করলো ,
ঝিলিক :- তাহলে কি বলে ডাকবো?
কথক :- আনন্দ ঝিলিকের দিকে কিছুটা সময় কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে তারপর বলে,
আনন্দ :- যা খুশি ডাকো কিন্তু ভাইয়া না আর এসব স্টুপিট ডাক তো একদমই না।
কথক :- ঝিলিক নির্বাক হয়ে আনন্দের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে,তা দেখে আনন্দ বলে ,
আনন্দ :- তুমি আমার নাম ধরে ডাকতে পারো অথবা অন্য কোন নামে কিন্তু ভাইয়া না।প্লিজ। ( শেষের কথাটি আনন্দ অনেকটা আকুতি মাখিয়ে বলে ) (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
কথক:- আনন্দের এরূপ কথায় ঝিলিক ও সোহাগ দুজনেই হতবাক হয়ে যায়,সোহাগ আনন্দের মুখোমুখি হয়ে বলে,
সোহাগ:-ভাই আপনি ঠিক আছেন,কিসব বলছেন?
কথক :- সোহাগের কথায় কোনরকম উত্তর না দিয়ে আনন্দ ঝিলিককে চলো নিচে যাই বলেই হাঁটা শুরু করে। ঝিলিক আনন্দের কথা শুনে সোহাগের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আনন্দের পিছুপিছু হাঁটতে শুরু করে,সোহাগ ও আর কিছু বললো না তবে ও কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। কিছু মনে পড়তেই ওদের পিছনেই হাঁটতে শুরু করল। আনন্দ ও সোহাগ ছাদ থেকে নেমে প্রতি ফ্লোরে গিয়ে সবার সাথে ঝিলিকের পরিচয় করিয়ে দেয়। তারপর ঝিলিকের কাজ সম্পর্কে কিছুটা বুঝিয়ে দেয় এবং বলে মাজেদ ভাই আসলে আরো ভালো করে বুঝিয়ে দিবে। আনন্দ সবার কাছে ঝিলিক কে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দেয়।এতে প্রথমে ঝিলিক একটু অস্বস্তি অনুভব করলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে আনন্দ কেন এরকম করছে। সবার সাথে কথা বলার সময় দেখেছে এখানে সবাই আনন্দ কে কত সম্মান করে, আসলে আনন্দ মানুষটাই এমন। অত্যন্ত মিশুক, বন্ধুসুলভ একজন মানুষ। সবার সাথেই খুব সহজেই মিশে যেতে পারে। নিজের উপস্থিত ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) বুদ্ধি,সহজাত আকর্ষণ ক্ষমতা, মানবিক আচরণ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, সহমর্মিতা প্রকাশ করা, সবসময় চেষ্টা করা অন্যের কাজে সাহায্য করা, তারপর তো আছেই নিজের চার্মিং লুকস, সুমিষ্ট শ্রুতিমধুর আর সুসজ্জিত বাচনভঙ্গি সব মিলিয়ে আল্লাহ আনন্দকে মানুষ বশ করার ক্ষমতা দিয়েছেন আর সে তা ভালোভাবেই কাজে লাগায়। তাই সে ঝিলিক কে নিজের কাছের বন্ধু বলে পরিচয় দিয়েছে এতে করে যেমনি সবাই ঝিলিককে সম্মানের চোখে দেখবে ঠিক তেমনি ঝিলিকের জন্য নিরাপত্তার কাজ ও করবে। কিন্তু আনন্দ কি বুঝতে পেরেছে যে ওর এই কাছের বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা ঝিলিকের জীবনে অমাবস্যা নিয়ে আসবে! কি জানি সামনে আনন্দ ঝিলিকের জীবনে কি ঘটতে চলেছে?
সবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষ করে ঝিলিক পারভীনের কাছে চলে যায়, সেখানে কিছু সময় কথা বলে ৬ তলায় চলে যায় এবং সেখানে গিয়ে সোহাগের সামনে পড়ে,সোহাগ মুচকি হেসে ঝিলিক কে বলে,
সোহাগ :- আমাকে ভাইয়া ডাকতে পারো,আমি রাগ করবো না।
কথক :- ঝিলিক সোহাগের কথায় লজ্জা মিশ্রিত মুচকি হেসে মাথা নামিয়ে নেয়, তারপর সোহাগের উদ্দেশ্যে বলে,
ঝিলিক:- ভাইয়া এখন কি স্যারের কেবিনে যাওয়া যাবে?
সোহাগ:- হ্যা,যাবে। কিন্তু এখন কেন যাবে?
ঝিলিক :- না মানে আমি কখন কিভাবে শুরু করবো আজকের কাজটা,সেটা জানতেই আর কি!
কথক:- ওকে চলো আমিও যাবো।
ঝিলিক :- ওকে।
কথক :- সোহাগ আর ঝিলিক যেই না সাত তলার সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে তখনই দেখা হলো আনন্দ আর আরো একজন স্টাফের সাথে।ওরা নিচে নামছিল ঝিলিক কে দেখে আনন্দ থেমে যায়,আর ঐ ছেলেটিকে চলে যেতে বলে। ছেলেটি আনন্দের কথায় মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। আনন্দ সোহাগ আর ঝিলিক কে চোখের ইশারায় জানতে চায় কি সমস্যা? ঝিলিক আনন্দ কে বলে কিছু না।সোহাগ উপরে যাওয়ার কারনটা বলে আর তা শুনে আনন্দ ও ওদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়,আর তা শুনে সোহাগ বলে, ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
সোহাগ:- ভাই আপনিই যান। যেহেতু আপনি ছিলেন না তাই আমি ওর সাথে যাওয়ার কথা বলছিলাম এখন যখন আপনিই আছেন তাহলে আমার যেয়ে কোন কাজ নেই।
কথক :- সোহাগ কথাটি সহজ ভাব বললেও তার কথার মাঝে স্পষ্ট মজা লুকিয়ে ছিল। আনন্দ সেটা বুঝতে পেরে মৃদু হাসে, কিন্তু আমাদের বেচারি নায়িকা সহজ-সরল নারী সে কিছু বুঝতে না পেরে চুপচাপই রইল। সোহাগ তার কথা শেষ করে নিচে নেমে চলে গেল আর ঝিলিক আনন্দের সাথে বসের কেবিনে চলে গেল।
বসের কেবিনে গিয়ে ঝিলিক বসকে বললে সে ম্যানেজারকে ডেকে এনে ঝিলিক কে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে বলে আর তার আজকের কাজের হিসাব নিকাশ সব যেন ঝিলিক নিজে এসে বসের কাছে জমা দেয় সেটাও বলে দেয়।ম্যানেজার সাহেব বসের অর্ডারে ঝিলিক কে নিয়ে স্টোক আর ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) ঝিলিকের বাকী দায়িত্ব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে চলে যায় আর ঝিলিক ও চলে যায় নিজের কাজে। আনন্দ কিছু সময় ঝিলিকের পাশে পাশেই থাকে তারপর সেও চলে যায় নিজের কাজে অবশ্য যাওয়ার সময় নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে গেছে যাতে ঝিলিক কোন সমস্যা ফিল করলে তাকে ফোন দিয়ে জানায়।
এরপর আসে লাঞ্চের সময়, ঝিলিক প্রথমদিন দেখে নিজের জন্য কোন টিফিন বক্স আনেনি তাই সে খেতে যায় না। পারভীন ঝিলিক কে ডাকতে যায় কিন্তু ঝিলিক যেতে চায় না এমন সময় আনন্দ চলে আসে ,এসে দেখে পারভীন কোন কিছুর জন্য ঝিলিক কে জোরাজুরি করছে আর ঝিলিক বারবার ই নাকোচ করছে । তাই সে প্রশ্ন করে, কি সমস্যা? পারভীন সব খুলে বললে আনন্দ আদেশের সুরে ঝিলিক কে বলে চুপচাপ ছাদে গিয়ে পারভীনের পাশে গিয়ে বসতে সে দশ মিনিটের মধ্যেই আসছে। ঝিলিক বারন করতে গিয়েও আনন্দের রাগান্বিত চেহারা দেখে আর কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারলো না। চুপ করে পারভীনের সাথে ছাদে চলে যায়। পারভীন আনন্দের কথায় খুশি হলেও ঝিলিককে এরুপ আদেশের সুরে কথা বলায় বিষয়টা একটু খটকা লাগে তবুও মাথায় চাপ না নিয়ে বিষয়টি নরমাল ভাবেই নেওয়ার চেষ্টা করে। আনন্দ ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই দু প্যাকেট কাচ্চি আর এক লিটার সেভেন আপ নিয়ে হাজির হয়।
পারভীনের হাতে প্যাকেটগুলো দিয়ে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বলে চুপ করে খেয়ে নিতে। কেউ আর কোন কথা না বাড়িয়ে খেতে বসে পরে। এদিকে এই বিষয়টা অনেকের চোখেই শুলের মত বিঁধে।
আনন্দ পারভীনদের থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে সোহাগ আর রাসেলের ( অন্য একটি স্টাফ) সাথে গিয়ে খেতে বসে। খাওয়ার মাঝে মাঝেই আনন্দ আড় চোখে ঝিলিক কে দেখে,ঝিলিক একদম চুপ করে নিচু হয়ে খেয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার পার্ট চুকিয়ে সবাই আবার নিজনিজ কাজে চলে যায়। সন্ধ্যার সময় ও আনন্দ পারভীন আর ঝিলিকের জন্য নাস্তা দিয়ে যায়। এইবারের বিষয়টি ঝিলিকের একটু বিরক্ত লাগছে। পারভীন কিছু একটা আঁচ করার চেষ্টা করছে। আর ওদের আশেপাশের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কানাঘুষা শুরু করছে। রাতে কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় দেখলো আনন্দ মেইন গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ঝিলিক আর পারভীন কে দেখে ওদের সামনে এগিয়ে যায়। ঝিলিক আনন্দ কে দেখে মাথা নুইয়ে নেয়, আনন্দ পারভীন কে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- রিক্সায় তুলে দেই?( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
কথক :- পারভীন আনন্দের কথায় এবার পুরোই আশ্চর্য হয়ে যায়। আনন্দ সবাইকে কাজে সাহায্য করে কিন্তু আজ যেগুলো করছে সেইসব সাহায্য তো আগে কখনো কারো জন্য করতে দেখেনি। বসের কাছে নিজে নিয়ে গিয়ে কাজে লাগিয়ে দেওয়া,নিজ দায়িত্বে সব কিছু চিনিয়ে দেওয়া, দুপুরে নিজে গিয়ে খাবার এনে দেওয়া পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই লাগছিলো কিন্তু সন্ধ্যায় সবার সামনে শুধু তাদের দুজনের জন্য নাস্তা এনে দেওয়া এখন আবার রিক্সা করে দেওয়ার কথা বলছে! মানে কি এসবের? এমন তো নয় যে আগে আমার( পারভীন) অথবা অন্য কারো জন্য করেছে,আজ প্রথমবারের মতো আনন্দ কে এমন করতে দেখা যাচ্ছে! কিন্তু কেন,কার জন্যে? পারভীন আনন্দের দিকে তাকিয়ে আনমনে এগুলোই ভাবছিলো,আর আনন্দ এক ধ্যানে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ দুজনেই সচিত্রে ফিরে আসে ঝিলিকের কথায়।
ঝিলিক:- আমরা বাস অথবা অন্য কোন ব্যবস্থা করে নিতে পারবো। আপনার শুধু শুধু কষ্ট করতে হবে না। আনন্দ এখনো ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে আছে, ঝিলিকের কথার উত্তরে বললো,
আনন্দ :- তুমি চুপ থাকো! আমি তোমার মতামত জানতে চাই নি। আমি যা বলছি তাই হবে।( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
কথক :- পারভীন আশ্চর্য হয়ে আনন্দের দিকে তাকিয়ে আছে,ঝিলিকের প্রতি আনন্দের এমন অধিকারবোধ দেখে সেতো পুরোই তাজ্জব বনে গেছে। এখন ব্যাপারটা তার খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। কিন্তু আনন্দকে যতদুর চিনে তাতে তার কাছে আনন্দকে যথেষ্ট ভালো ছেলে বলেই মনে হয়, কিন্তু আদৌও সে ঝিলিকের জন্য ঠিক কিনা সেটাই হলো বড় বিষয়। আর তাছাড়া আসলেই যা ভাবছে তা কতটা ঠিক তাও তো নিশ্চিত নয়, সুতরাং সেটাই আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত।আর এমনিতেও প্রথম দেখাই এতটা পাগল হওয়ার মাঝেও তো কেমন একটা খটকা কাজ করছে! পারভীনের হাজার চিন্তার মাঝেই আনন্দ রিক্সা ডেকে আনে,রিক্সার বেলের আওয়াজে পারভীনের ধ্যান ভাঙ্গে আর সে দেখে তাদের সামনে একটা রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। আনন্দ তাড়া দিয়ে দুজনকেই রিক্সায় উঠিয়ে দিলো। পারভীন ও ঝিলিক আনন্দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ,রিক্সা চলতে শুরু করে আনন্দ দাঁড়িয়ে থেকে যতক্ষন অবধি দেখা যায় ঠিক ততক্ষনই দাড়িয়ে থাকে। এতসময় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সোহাগ আনন্দের এইসব কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছিলো, ঝিলিক ও পারভীন চলে যেতেই ও পিছন থেকে এসে আনন্দের কাঁধে ভর দিয়ে খোঁচা মেরে বললো,
সোহাগ:- ভাই আজ থেকে কি নতুন চাকরি পেয়েছেন? ( দাঁত কেলিয়ে)
কথক :- আনন্দ কপাল কুঁচকে সোহাগের হাত নিজ কাধ সরিয়ে পেটে হালকা একটা ঘুসি মেরে বললো মানে কি?
সোহাগ :- না মানে আজকাল নিজে গিয়ে মানুষের জন্য খানা আনা হয় আবার ছুটির পর রিক্সা ঠিক করে দেওয়া হয় তাই আর কি বললাম।তো এই সার্ভিস কি শুধু একজনের জন্যই না আমরাও এই সেবার তালিকায় আছি?
আনন্দ :- সবার জন্য সবকিছু না।এই সেবা শুধু একজনের জন্যই বরাদ্দ।
সোহাগ :- তো সেই একজনটা কি! ( রসিকতার হাসি দিয়ে বলল)
কথক:- আনন্দ লজ্জা মিশ্রিত মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আর তা শুনে সোহাগ রসিকতা করে বলে,
সোহাগ :- অঅঅ! আবার লজ্জা পাওয়াও হচ্ছে!
কথক:- বলে রাখা ভালো আনন্দ, সোহাগ কর্মক্ষেত্রে সিনিয়র জুনিয়র হলেও তাদের সম্পর্ক বন্ধু মতোই। তাই একে অপরের বিষয়ে সবকিছুই জানে । কেউ কারো কাছে থেকে কোনদিন কিছু লুকায় না।
পর্ব ০৩
পার্ট :- ৩
কথক :- "Abiba Trendy Fashion garments company & Limited " এ ঝিলিকের চাকরির ১ মাস হয়ে গেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই ঝিলিক নিজের কাজ,ব্যবহার, বন্ধুসুলভ আচরণ আর সহজ-সরল চালচলন দিয়ে কমবেশি সবার মনেই জায়গা করে নিয়েছে। ওর সাথে কাজ করা অথবা ওর আশেপাশে থাকা সবাই ওকে ভালো ভদ্র মেয়ে বলেই বিশ্বাস করে।সবাই ওর কাজে ওকে যথেষ্ট সহযোগিতা করার চেষ্টা সবসময় করে আর তারপর তো আনন্দ,সোহাগ আর মাজেদ তো আছেই। আনন্দ তো সবসময় চেষ্টা করে ঝিলিক কে নিজের দৃষ্টির মাঝেই রাখতে। সে তো দিনদিনই ঝিলিকের প্রতি আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঝিলিকের সব কিছুই যেন ওর ভালোলাগার প্রানকেন্দ্র হয়ে গেছে। প্রতিদিন সকালে কাজে এসে আগে ঝিলিক কে একনজর দেখাটা যেন অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। দুপুরের লাঞ্চের সময় ঝিলিক খেয়েছে কি খায়নি( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) তার খবরাখবর নেওয়াটা যেন রোজকার ডিউটিতে পরিনত হয়েছে। সন্ধ্যার সময় ও ঝিলিকের জন্য নাস্তা নিয়ে ঔযাওয়া,রাতে যাওয়ার সময় নিজ দায়িত্বে ঝিলিক কে রিক্সায় উঠিয়ে দেওয়া। ঝিলিক যখন যে ফ্লোরে থাকে সেখানে গিয়ে বারবার ঝিলিক কে দেখে আসা এমনকি প্রত্যেক ফ্লোরে নিজস্ব ব্যক্তিগতভাবে লোক রাখা যাতে করে ঝিলিকের কোন সমস্যা না হয় , ঝিলিককে কেউ কোনভাবেই ডিস্টার্ব না করতে পারে । ঝিলিকের প্রতি আনন্দের এই দুর্বলতার কারনটা মোটামুটি সবাই-ই বুঝে যদিও ঝিলিক তার তরফ থেকে অনেক-কেই তার আর আনন্দের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছে তাতে কি আনন্দ যে পরিমাণ ঝিলিকের প্রতি সচেতন আর যত্নশীল তাতে ঝিলিকের কথায় কারো বিশ্বাস না হওয়ার-ই কথা। আর ঝিলিকের ব্যবহার, মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসম্ভব সুন্দর গুন তার উপর ঝিলিকের প্রতি আনন্দের দুর্বলতার জন্য মোটামোটি সবাই-ই ঝিলিককে নিজের আপনজনের নজরে দেখে।
মাজেদ যেদিন প্রথম ঝিলিকের সাথে পরিচিত হয় তখন থেকেই নিজের ছোট বোনের মতো করে দেখেশুনে রাখে, নিজের পাশে পাশে রেখে সমস্ত কাজ ভালো করে বুঝিয়ে দেয়, ঝিলিক প্রথমে মাজেদ কে ভয় পেলেও পরবর্তীতে মাজেদের স্নেহের( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) কাছে নত হয় । আর যখন মাজেদ জানতে পারে ঝিলিকের প্রতি আনন্দের আগ্রহের কথা তখন তো মাজেদের যেন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সর্বক্ষন ঝিলিকের খেয়াল রাখা এরপর তো আছেই সোহাগ,সে তো আনন্দের আদেশে ঝিলিকের ফুট-ফরমায়েশ খাটতে এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকে। সব কিছু মিলিয়ে ঝিলিকের এই এক মাস ভালোই কেটেছে। তবে কথায় আছে না আলোর মাঝেই অন্ধকার লুকিয়ে থাকে।এখানেও ঠিক তাই হচ্ছে। ঝিলিকের জন্য ও তেমনই কিছু অপেক্ষা করছে। এরই মাঝে ঝিলিক তার কিছুটা আভাস পেয়েছে তবে ঐ যে আমরা সময় থাকতে সচেতন হইনা। যতক্ষন পর্যন্ত না আমরা আমাদের চুড়ান্ত ক্ষতির মুখোমুখি হই ততক্ষন অবধি আমাদের হুশ হয় না নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
ঝিলিকের ক্ষেত্রে ও তাই হচ্ছে। ঝিলিক হয়তো ভবিষ্যত বুঝতে পারছে না কিন্তু যা হচ্ছে সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করছে না।দেখা যাক ঝিলিকের এই হেয়ালিপনা তাকে কোথায় নিয়ে দাড় করায়। (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
ঝিলিক নিজের হাতের ফাইলপত্র নিয়ে ছয় তলার সিড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলো তখনই দেখা হলো সোহাগ আর আনন্দের সাথে।আজকে সকালে আনন্দ একটু বেশিই ব্যস্ত থাকার কারনে এখনো ঝিলিকের সাথে দেখা করতে পারেনি। তাই নিজের হাতের জরুরি কাজ শেষ করে ঝিলিকের সাথে দেখা করার জনই নিচে নামছিলো কিছু মুহূর্ত আগেই জানতে পেরেছে ঝিলিক পাচ তলায় ছিল তাই সেও নিচে নামছিল আর তখনই ঝিলিকের মুখোমুখি হয়। আনন্দ ঝিলিক কে দেখে প্রশান্তির একটা হাসি দেয় ঝিলিক ও বিনিময়ে একটি হাসি দিয়ে সালাম দেয় ,
ঝিলিক:- আসসালামু আলাইকুম ইনচার্জ সাহেব।
আনন্দ:- অলাইকুম আসসালাম মিস ঝিলিক!
কথক:- আনন্দ ঝিলিক কে ভাইয়া বা অন্য নামে ডাকতে নিষেধ করায় ঝিলিক আনন্দ কে ইনচার্জ সাহেব বলেই ডাকে। এতে আনন্দ ও প্রশান্তি পায়।আর ঝিলিক ও । অবশ্য আনন্দ ও ঝিলিক কে বাকী মেয়েদের মতো আপু না ডেকে মিস ঝিলিক বলেই( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) ডাকে।আর এটার জন্যই ঝিলিক আর আনন্দের সম্পর্কের বিষয়টি অন্যদের মনে আরো জোরালো হয়েছে।
আনন্দ ঝিলিকের সালামের উত্তর দিয়ে জানতে চায়,
আনন্দ:- কোথায় যাচ্ছিলে?
ঝিলিক:- ম্যানেজার স্যারের কেবিনে।
আনন্দ:- কেন?
কথক:- হাতের ফাইলগুলো আনন্দের দিকে তুলে ধরে।
ঝিলিক:- এগুলো একটু দেখাতে হবে। আসলে
ম্যানেজার স্যার বলেছিলো এই ফাইলগুলো বসকে দেখানোর আগে যেন একবার ওনাকে দেখাই তাই আর কি!
আনন্দ:- কেন?
ঝিলিক:- আমি কি জানি! ( নিজের দু কাধ নাচিয়ে বললো কথাটি)
কথক :- আনন্দ সোহাগ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আবার ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে বললো,
আনন্দ:- মাজেদ ভাই জানে এই কথা?
সোহাগ:- তুমি তো সবসময়ই ফাইল নিয়ে সরাসরি বসের কাছে জমা দাও,উনিই তো তোমার ফাইল চেক করে তাহলে আজ ম্যানেজার কেন চাইলো ?
ঝিলিক:- সত্যিই আমি জানি না!( অসহায় একটা মুখশ্রী করে)
আনন্দ:- মাজেদ ভাই জানে?
ঝিলিক:- না, ভাইয়াকে তো বলা হয় নাই এই কথা!
আনন্দ:- কেন? তোমার উচিত ছিল এই বিষয়ে একবার মাজেদের কাছে জিজ্ঞেস করা ।
ঝিলিক:- আমি মনে করেছিলাম এটা এমন কোন বড় বিষয় না তাই।
আনন্দ:- হ্যা এটা অবশ্যই তেমন বড় কোন বিষয় না।আমরাও যেকোন কাজে ম্যানেজারের কাছে আগে যাই উনি না থাকলে বা উনার দ্বারা আমাদের সাহায্য করা সম্ভব না হলে তখন সরাসরি বসের কাছে যাই । তবে তোমার বিষয়টি আলাদা কারন তুমি এই এক মাস চাকরির বয়স অবধি যেকোন কাজের জন্য সরাসরি বসের কাছে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছো,সেটা(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) তোমাকে আমার সামনেই বলা হয়েছে, আর তাছাড়া তুমি এর আগে কোন কাজের জন্য ম্যানেজারের কাছে যাওনি তাই বলছি হঠাৎ উনি কেন তোমাকে তার কেবিনে ডাকলো নিশ্চয়ই কোন জটিল বিষয় আছে?
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় যুক্তি খুঁজে পায় তাই জিজ্ঞেস করলো,
ঝিলিক:- তাহলে কি করবো? যাবো না?
আনন্দ- কেন যাবে না, অবশ্যই যাবে। তবে যাওয়ার আগে একবার ফাইলগুলো ভালো করে চেক করে নাও আর অবশ্যই মাজেদ কে জানিয়ে যাও।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়। তারপর সাড়ে ছয় তলার সিড়ি থেকেই ফিরে আসে । আনন্দ ও সোহাগ ও ওর পিছ পিছু আসে। ঝিলিক ছয় তলায় মাজেদ কে খুঁজে না পেয়ে পাচ তলায় চলে যায় সাথে আনন্দ ও সোহাগ ও। মাজেদ পাচ তলায় ছেলেদের সেকশনে কিছু একটা করছিলো। ঝিলিক গিয়ে তার কথা জিজ্ঞেস করতেই একটা ছেলে ইশারায় জানায় মাজেদ ভিতরে আছে ।
ঝিলিক ভিতরে ঢুকে সাথে সাথে আনন্দ ও সোহাগ ও ঢুকে। মাজেদ তৈরি মালের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছেলেকে কিছু একটা বোঝাচ্ছিলো। ঝিলিক গিয়ে ভাইয়া বলে ডাক দেয়,তা শুনে মাজেদ পিছু ফিরে ঝিলিক আনন্দ ও সোহাগকে একসাথে দেখে ভ্রুকুটি করে ইশারায় জানতে চায়,
মাজেদ:- কি সমস্যা?
ঝিলিক:- একটু ইমার্জেন্সি দরকার ছিলো, আপনি কি একটু এদিকে আসতে পারবেন?
কথক:- মাজেদ ঝিলিকের মুখ দেখে কিছু একটা ভেবে তারপর আনন্দ ও সোহাগ কে একবার পরখ করে নেয় তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে বললো,
মাজেদ:- শোনো তুমি গিয়ে তোমার কাজ করো।আমি কিছু সময়ের মধ্যেই আবার আসছি,এসেই তোমাকে ইনফর্ম করবো।
কথক:- ছেলেটি আচ্ছা ভাই বলে চলে গেল। মাজেদ ওদের কাছাকাছি এসে কোমড়ে হাত রেখে ডান পাশের ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
মাজেদ:- কি সমস্যা? কি খিচুড়ি পাকাচ্ছো তোমরা?
কথক:- ঝিলিক পিছু ফিরে একবার আনন্দ কে দেখে, আনন্দ চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে বললো মাজেদকে বলতে! মাজেদ এতক্ষণ এদের দুজনের চোখের খেলা দেখছিলো তাই নিজেই ঝিলিক কে জিজ্ঞেস করে,
মাজেদ:- ঝিল,কি সমস্যা? কিছু কি হয়েছে?
কথক:- মাজেদ ঝিলিক কে নিজের বোনের মতোই দেখে,তাই আদর করে অনেক সময়ই ঝিলিক কে ঝিল বলে ক্ষেপায়। ঝিলিক ও মাজেদের এইরকম স্নেহময় ডাকে মজা পায় যদিও সেটা সে প্রকাশ না করে রাগী ভাব প্রকাশ করে আর এতেই যেন মাজেদ ও আনন্দিত হয়। বলতে গেলে ঝিলিক আনন্দের চেয়ে মাজেদ ও সোহাগের সাথে বেশি ফ্রি হয়েছে গত একমাসে। তবে বিশ্বাস আর ভরসার জায়গাটা যেন আনন্দের মাঝেই নিহিত আর তাইতো আনন্দের পরামর্শ সবসময়ই খুব গুরুত্ব সহকারে নেয়। ঝিলিক কেন জানি আনন্দের সাথে ফ্রি হতে পারে না।হতে পারে না বললে ভুল হবে আসলে ও হতেই চায় না। এমনকি ও তো আনন্দকে দেখলে চেষ্টা করে যথাসম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রাখতে,যত সম্ভব আনন্দ থেকে দূরে থাকা যায় তাই চেষ্টা করে । মাজেদের কথায় ঝিলিক গাল ফুলিয়ে মাজেদের দিকে ছদ্ম রাগ নিয়ে তাকায়।আর তা দেখে মাজেদ, আনন্দ ও সোহাগ তিনজন ই একসাথে হেসে দেয়। এবার তো ঝিলিকের রাগ সাত আসমানে চড়ে বসে। চিৎকার করে বলে উঠলো,
ঝিলিক:- মাজেএএদদ ভাই।
ঝিলিকের এইরকম রাগে তিনজন ই চুপ হয়ে যায়। মুখে আঙ্গুল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তবে হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মিটিমিটি হাসছে আর তা দেখে ঝিলিক ফুস করে শ্বাস ছাড়ে। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বলে
ঝিলিক:- সবার হাসি শেষ হলে আমি কথা বলতে পারি?
কথক:- ঝিলিকের কথায় মাজেদ একটু সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বলে উঠলো,
মাজেদ:- জ্বী ম্যাম বলেন।
ঝি
লিক:- ভাই আমি যখন কাজে লেগেছিলাম তখন বড় স্যার বলেছিলেন,আমি যেন সবসময় সব কাজের জন্য সরাসরি ওনার কেবিনে ওনার কাছেই যাই। তাই আমি কোনদিন কোন কাজে ম্যানেজার স্যারের কাছে তো যাইনি।
মাজেদ:- হুম তো?
ঝিলিক:- আজকে সকালে আমি যখন গোডাউন থেকে বের হচ্ছিলাম তখন মোবারক আংকেল (ম্যানেজারের পিওন) আমাকে গিয়ে বললেন আমি যেন আজকের সকালের সিফ্টের হিসেব নিয়ে ম্যানেজারের কাছে যাই।
মাজেদ:- তারপর?
ঝিলিক:-আমি কি যাবো? না মানে শুধু আমাকে এমনিতে ডাকলে ঠিক ছিলো, কিন্তু এই হিসেবের পেপার নিয়ে যাওয়া কি উচিত হবে?
মাজেদ:- ফাইল গুলো কি ঠিকমতো চেক করেছো?
ঝিলিক:- হুম।
মাজেদ:- যাও।আমার তো মনে হয় না কোন অসুবিধা আছে।আর তাছাড়া ম্যানেজার স্যার যথেষ্ট ভদ্র আর ভালো মানুষ। আমার মনে হয় বড় স্যারের অনুমতি আছে তাই সে তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
ঝিলিক:- যাবো?
মাজেদ:- আল্লাহ ভরসা। যাও।
কথক:- ঝিলিক মাজেদের কথার পর আনন্দের দিকে তাকালে আনন্দ মুচকি হেসে সম্মতি দিলে সোহাগ ও যেতে বলে তারপর ওদের থেকে বিদায় নিয়ে ও ম্যানেজারের কেবিনের দিকে যায় । কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করলে ম্যানেজার সাহেব বলে, "আসুন"।ঝিলিক দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে সালাম দিলে ম্যানেজার সালামের উত্তর দিয়ে বসতে বলে। ঝিলিক চেয়ার টেনে বসে। ম্যানেজার একটি ফাইল চেক করছিলেন সেটা শেষ করে ঝিলিকের দিকে তাকায়।তারপর জিজ্ঞেস করে নাম কি যেন?
ঝিলিক:- ঝিলিক।
ম্যানেজার:- ঝিলিক! সুন্দর নাম। ( অদ্ভুত সুন্দর একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে)
ঝিলিক:- ধন্যবাদ স্যার! (কৃতজ্ঞতার সুরে)
ম্যানেজার:- কেমন আছো?
ঝিলিক:- আলহামদুলিল্লাহ স্যার!
ম্যানেজার:-তো এখানে কাজ করতে কেমন লাগছে?
ঝিলিক:- জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ , ভালো স্যার!
ম্যানেজার:- কেউ কোনভাবে ডিস্টার্ব করছে না তো?
ঝিলিক:- জ্বী না স্যার!
ম্যানেজার:- কিভাবে করবে? শুনলাম তো তুমি নাকি চব্বিশ ঘন্টা কারো নজরদারিতে রয়েছো যদিও বিষয়টি শুনে ভালো লাগছে আমার!
ঝিলিক:- নিশ্চুপ!!!
ম্যানেজার:- তো তুমি আনন্দের কি হও?
কথক:- ঝিলিক ম্যানেজারের কথায় অনেকটাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে যদিও এই এক মাসে ঝিলিক এই কথা শুনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তবুও এক মাস চাকরির বয়সে এই প্রথমবার ম্যানেজারের সাথে একা কথা হচ্ছে। তখনও এমন একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাতো ওর ভাবনারও বাইরে ছিলো। তাই ও ইতস্তত করে বলতে যাবে তার আগেই ম্যানেজার আবার বলে উঠলো,
ম্যানেজার:- আনন্দ অত্যন্ত ভালো ছেলে। আমি যা শুনেছি তা যদি সত্যি হয় তাহলে বলবো তুমি ঠকবে না বরং সুখীই হবে।
কথক:- ম্যানেজারের কথায় ঝিলিক কি বলবে তা ও খুঁজে পেল না কিন্তু ওর একটা খারাপ লাগা কাজ করছে এই ভেবে যে সবাই যা ভাবছে তাতো সত্য নয় কিন্তু ও এটা কাউকে বলতেও পারছে না আর বললে ও কেউ ওর কথা বিশ্বাস করে না তাই বলেও কোন লাভ নেই। তার চেয়ে বরং যার যা ভাবার ভেবে নিক।তাই ও চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করলো। ও চুপ থেকে মাথা নিচু করে রইল । ম্যানেজার কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে লাগলো
ম্যানেজার:-তো বসের সাথে কাজ করতে কেমন লাগছে?
ঝিলিক:- জ্বী স্যার ভালো।
ম্যানেজার:- বসের ব্যবহার কেমন দেখছো?
ঝিলিক:- ভা-ভা-ভালো( একটু তুতলিয়ে মাথা নত করে)
কথক:- ঝিলিকের এমন তোতলানোতে ম্যানেজার কিছু একটা আপনমনেই ভাবলেন তারপর বিড়বিড় করে বললেন,ভালো হলেই ভালো। ঝিলিক এবারও চুপ তাই দেখে ম্যানেজার মনে মনে ভাবলেন এই ভালোর মাঝে অন্য কোন রুপ যেন প্রকাশ না পায়।মেয়েটাকে দেখে যথেষ্ট সহজ-সরল মনে হচ্ছে আর এই সরলতাই মেয়েটার জন্য কাল না হয়ে দাড়ায়। তারপর ঝিলিকের উদ্দেশ্যে বললেন বাসায় কে কে আছে?
ঝিলিক:- মা বাবা,আর আমরা তিন ভাইবোন।
ম্যানেজার :- বাবা কি করে?
ঝিলিক:- উনি অসুস্থ,কাজ করতে পারে না ।
ম্যানেজার :- ওহ্।তো তাহলে তুমি কি বড়?
ঝিলিক:- হুম।
কথক:- এরপর ঝিলিকের পরিবার সম্পর্কে ম্যানেজার আরো অনেক প্রশ্ন করলেন ঝিলিক ও সুন্দর ভাবে তার উত্তর দিলো এক পর্যায়ে ম্যানেজার বললেন তোমার অনেক প্রশংসা শুনেছি।এই গার্মেন্টসে অনেক মেয়েই তো কাজ করে কিন্তু গত একমাসে তোমার কথা অনেকবার শুনেছি সেটা হোক আনন্দের কারনে কিংবা তোমার নিজের কারনে আর তাই তোমার সাথে একবার কথা বলার ইচ্ছে করলো। তুমি তো আর আমার সাথে কোন কাজ করোনা তাই তোমার সাথে বাকী সবার মতো যোগাযোগ নেই। অবশ্য শুধু তুমি একা না তোমার আগে আরো অনেক মেয়েই ছিলো যারা সরাসরি বসের সাথেই কাজ করতো।তবে তাদের সম্পর্কে যা শুনতাম তাতে তাদের সাথে দেখা করার ইচ্ছা কোনদিনও জাগেনি কিন্তু তোমার সম্পর্কে শুনতে শুনতে তোমার সাথে কথা বলার ইচ্ছা ও জাগলো আর তা দমিয়েও রাখলাম না তাই সকাল বেলা-ই তোমাকে ডেকে পাঠালাম। তুমি কিছু মনে করোনি তো? তুমি কিন্তু আমার মেয়ের মতো! আমার নিজেরও একটা মেয়ে আছে তোমার বয়সী।
ম্যানেজারের এই কথায় ঝিলিক এবার একটু আবেগী হয়ে পড়লো।আর বুঝতেও পারলো বাইরের সবাই ঠিকই বলেছিলো ম্যানেজার সাহেব ভালো মানুষ। তাই ও একটা মৃদু হাসির সহিত বললো
ঝিলিক:- জ্বী না আমি কিছু মনে করিনি।তবে একটু ভয় পেয়েছিলাম।
মানেজার:- ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি শুধু তোমাকে দেখার জন্য আর কথা বলার জন্যই ডেকেছি। তোমাকে কিছু কথা বলবো আমার মনে হচ্ছে তোমাকে বলা উচিত তাই আর কি!
কথক:- ম্যানেজারের কথায় ঝিলিক একটু নড়েচড়ে বসলো । ম্যানেজার একটা মুচকি হাসি দিয়ে বললো,তুমি যথেষ্ট সিনসিয়ার মেয়ে নিজেকে এভাবে ধরে রাখলে ইনশাআল্লাহ ক্যারিয়ারে অনেক দুর এগিয়ে যাবে। এই কথায় ঝিলিক বললো,
ঝিলিক:- ইনশাআল্লাহ স্যার দোয়া করবেন।
ম্যানেজার:- আচ্ছা তুমি বসের সাথে কাজ করে করফোর্ট ফিল করো তো নাকি? দেখো আমি তোমার বাবার মতো তাই তুমি যেকোন বিষয়ে আমাকে জ্ঞাত করতে পারো নির্দ্বীধায়।আমি তোমাকে সাহায্য করতে চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
কথক:- ঝিলিক ম্যানেজারের কথায় কি উত্তর দিবে সেটা ভেবে পাচ্ছেনা কারন ওর সাথে এখনো এমন কিছু সিরিয়াস ঘটেনি যার জন্য কারো কাছে অভিযোগ করা যায়।আর যা ও অনুভব করছে যদি সত্যি তেমন কিছু না হয় তাহলে শুধু শুধুই একজন নিরীহ মানুষকে দোষারোপ করা হবে।তাই ও চাচ্ছে নিশ্চিত হয়ে তারপর যদি সত্যি তেমন কিছু ঘটে তাহলে এই বিষয়ে অন্য কারো সাথে আলাপ করা যাবে। ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)কিন্তু ঝিলিক জানতেও পারলো না ওর এই ভালো মানুষীরুপী কাজটার জন্য ওকে কত বড় মাশুল দিতে হবে! এইসব ভেবেই ও ম্যানেজারকে বললো ,
ঝিলিক:- নাহ স্যার। আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে না।বস তো যথেষ্ট ফ্রেন্ডলি,আমার ভুলগুলো সুন্দর করে শুধরে দেয়। আর আমার সাথে যথেষ্ট সহজ ভাবেই কথা বলেন।
কথক:- ঝিলিকের কথায় ম্যানেজার কেন জানি সন্তষ্ট হতে পারলো না।উনি কিছু একটা শুনতে চাইছিলেন যেটা ঝিলিক বললো না তাই উনি ভাবলেন, হয়তো মেয়েটা বলতে চাইছে না আর নয়তো এখনো বসের আসল চেহারার দর্শন হয়নি। নাকি আনন্দের প্রেমিকা বলে এই মেয়েটিকে ছেড়ে দিবে।আদৌ কি তা সম্ভব? সম্ভব হলে তো ভালোই। এইসব কথা আপনমনে ভেবেই উনি ঝিলিককে বললেন "ঠিক আছে তোমার যদি অসুবিধা না হয় তাহলে তো অনেক ভালো তবে কখনো কোন বিষয় খারাপ লাগলে অবশ্যই আমাকে জানাবে ওকে"?
ঝিলিক "আচ্ছা" বলে উঠতে নিলেই হাতের দিকে তাকিয়ে ফাইল দেখে ম্যানেজারকে বললো ,"স্যার ফাইলটা"? ম্যানেজার ফাইলের দিকে একবার তাকিয়ে হালকা মৃদু হেসে বললো তোমার সব ফাইল তো স্যার নিজেই চেক করেন। ঝিলিক ম্যানেজারের কথার পিঠে বললো ,
ঝিলিক:-আপনি তো বলেছিলেন আমাকে সকালের সিফ্টের হিসেব যেন নিয়ে আসি।
ম্যানেজার:- সেটা তো তোমাকে এখানে আসতে বলার জন্য একটা অযুহাত মাত্র যাতে তুমি অন্য কিছু ভেবে নার্ভাস না হও তাই আরকি!
কথক:- তারপর ঝিলিক ম্যানেজারের কেবিন থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলো পাচ তলায়,সেখানে এসে দেখলো মাজেদ, আনন্দ ও সোহাগ এবং আরো দুজন মিলে কিছু নিয়ে আলোচনা করছে।
ঝিলিক কে দেখে আনন্দ সবার আগে ওর কাছে এগিয়ে আসলো এবং খুব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
আনন্দ:- কি বলছে? এত সময় কেন লাগলো?
কথক:- ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো,"এই মানুষটা আমাকে নিয়ে এত চিন্তা কেন করে? আমার সব কিছুতেই যেন ওনার আগ্রহ বেশী।উনি কি বোঝেন না ওনার এই বাড়াবাড়ি রকমের খেয়াল রাখাটা আমার জন্য কতটা খারাপ প্রভাব ফেলে"? ঝিলিকের এমন ভাবনার মাঝেই আনন্দ আবারও প্রশ্ন ছুড়ে,"কি ব্যাপার কিছু বলছো না কেন, এভাবে তাকিয়ে রয়েছে কেন"? ঝিলিক কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই মাজেদ সামনে এসে বললো,
মাজেদ:- "সব কিছু ঠিক আছে ঝিল"? "ম্যানেজার উল্টাপাল্টা কিছু বলেনি তো"?
কথক:- ঝিলিক ফোস করে একটা হতাশার শ্বাস ছেড়ে সোহাগের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
ঝিলিক:- আমাকে কিছু বলার জন্য একটু সময় তো দিবেন প্লিজ!
কথক:- আনন্দ এবার অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো,
আনন্দ:- কি এমন কথা যেটা বলার জন্য এখন আপনার লগ্ন দেখতে হবে? যতটা সময় তুমি এদিক ওদিক তাকিয়ে নষ্ট করছো ততক্ষনে তো বঙ্গবন্ধুর ৭-ই মার্চের ভাষণ ও শেষ হয়ে যেত!
কথক:- মাজেদ আনন্দ কে ঠান্ডা হতে বলে ঝিলিক কে বললো আচ্ছা ঠিক আছে বুঝেছি তোর একটু সময় লাগবে। তাহলে সবাই চলো আমরা ক্যান্টিনে যাই হালকা চা- পানি খাই ! আনন্দ নিজেকে ঠান্ডা করে মাজেদের কথায় সায় দিয়ে ক্যান্টিনে যাওয়ার জন্য সিড়ি দিয়ে হেঁটে উপরে উঠতে লাগলো মাজেদ ও সোহাগ ওকে অনুসরণ করতে লাগে আর ঝিলিক ওদের পিছুপিছু হাঁটতে শুরু করে। মাজেদ আনন্দের কাধে হাত দিয়ে বলে উঠলো,
মাজেদ:- এত ভয় পাওয়ার কি আছে? আমরা সবাই আছি তো! ইনশাআল্লাহ আমরা থাকতে ওর কোন ক্ষতি হতে দেব না।
আনন্দ:- কি করবো , কেন জানি ওর জন্য একটু বেশিই চিন্তা হয়, চোখের আড়াল হলেই যেন এক অজানা ভয় আঁকড়ে ধরে আমাকে।
সোহাগ:- ভাই বেশি ভাববেন না তো। ঝিলিক যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে ।ও নিজের খেয়াল রাখতে পারে।
আনন্দ:- হ্যা আমি জানি ও বুদ্ধিমতী মেয়ে কিন্তু আমি কি করবো বলো? আমি না চাইলেও বেহায়া মন যে মানে না।
সোহাগ:- আমরা আপনার অবস্থাও বুঝতে পারছি কিন্তু আপনাকেও একটা কথা মাথায় রাখতে হবে আর সেটা হলো," আপনার এই যে কেয়ার করা, ঝিলিকের প্রতিটি কদমের খবর রাখা সেটা আবার ঝিলিকের বিরক্তিকর কারন না হয়ে দাড়ায়। মেয়েরা কেয়ারিং, পজেসিভনেস পছন্দ করে কিন্তু তারও একটা সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয় আর সেটা যদি কখনো ভেঙ্গে যায় তখন কিন্তু শত( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) চেষ্টায়ও আর ঠিক করা সম্ভব নয়। আর তাছাড়া আপনি যে ওকে পছন্দ করেন সেটা কিন্তু ওকে এখনো সরাসরি বলেননি । তো ও কিভাবে বুঝবে যে আপনি কেন ওর প্রতি এতটা পজেসিভ? আগে সম্পর্কটার একটা নাম দেন তারপর দেখবেন এমনিতেই ও আপনার প্রতি আরো অনুগত হবে।
কথক:- আনন্দ সোহাগের কথাগুলো চুপ থেকে শুধু শুনলো । এর মধ্যেই ওরা ছাদে এসে পৌঁছালো। ছাদে এসে দাড়াতেই মাজেদ আনন্দের ডান কাধে হাত রেখে বললো,
মাজেদ:- " দেখো আনন্দ যখন বিপদ আসার তখন আমাদের শত চেষ্টার পর ও আসবে,তাই বলছি তুমি এত বেশি চিন্তা করে নিজেও একটু রিল্যাক্স থাকো আর ওকেও তোমার টেক-কেয়ার নামক আতঙ্ক থেকে মুক্ত রাখো।
কথক:-আনন্দ মাজেদের কথার উত্তরে মাজেদের দিকে আশ্চর্যিত হয়ে তাকালো তারপর বললো,
আনন্দ:- আমি ওকে আতঙ্কের মধ্যে রাখি?
মাজেদ:- তোমার কি মনে হয় না একটু আগে তুমি যেমন রিএ্যাক্ট করেছো তাতে ঝিলিক ঘাবড়ে গেছে?ঐ সময় এমন রিএ্যাক্ট করার মতো কোন কারন আদৌ ছিলো?
কথক:- আনন্দ মাথা নুইয়ে রেখে কিছুক্ষণ আগে নিজের দ্বারা ঘটানো মূহুর্তের কথা ভাবে তারপর নিজেই নিজেকে বললো," হ্যা চিন্তায় একটু বেশিই করে ফেলেছি,এটা একদমই উচিৎ হয়নি। আল্লাহ জানে ঝিলিক কি ভাবছে? মাজেদ আনন্দের কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওকে নিজের দিকে মনোযোগী করে , আনন্দ মাথা তুলে মাজেদের দিকে তাকিয়ে বলে,
আনন্দ:-হ্যা ভাই আপনারা ঠিকই বলছেন, আমি বোধহয় অতিরিক্ত চিন্তা-ই করছি কিন্তু কি বলেন তো আমি এই চিন্তা করাটা না বন্ধ করতে পারবো না আর করতেও চাই না! কারন আমি ওকে নিয়ে কোন রিস্ক নিতে চাই না! এতে ও যা খুশি ভাবুক আমার কিছু যায় আসে না।
কথক:- ঝিলিক ওদের থেকে বেশ অনেকটা পিছিয়ে ছিল তাই ও ওদের কোন কথাই ও শুনতে পায়না তবে ছাদের ফ্লোরে পা রাখতেই শেষ কথাটি কিছুটা শুনতে পেলেও বোধগম্য হয় না ওর দ্বারা। আনন্দের এমন খাপ ছাড়া কথায় মাজেদ ও সোহাগ একে অপরের দিকে তাকায় তারপর দুজনেই আনন্দের দিকে তাকিয়ে একটা হতাশার শ্বাস ছেড়ে আনন্দকে বলে,
মাজেদ:- সিরিয়াসলি! এতসময় যা বোঝালাম কোনটাই তোমার মাথায় ডুকেনি!
সোহাগ:- ভাই আপনাকে আর কিছু বলার নেই। আপনি আসলেই শেষ হয়ে গেছেন প্রেমে পড়ে।
কথক:- আনন্দ ওদের রিএ্যাকশনে হালকা মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে ওদের মুখপানে চেয়ে বলে,
আনন্দ:-Don't worry! আমি এমন কিছু করবো না যেটা ওর উপর কোন খারাপ প্রভাব ফেলে। সুতরাং তোমরা নিশ্চিত থাকো।
ঝিলিক:- আপনারা সবাই কি নিয়ে এত আলোচনা করছেন?
কথক:- ঝিলিকের কন্ঠের আওয়াজে সবাই ছাদের সিঁড়ির দিকে দৃষ্টি ফেলে, দেখে ঝিলিক ওদের দিকে কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তা দেখে আনন্দ বলে,
আনন্দ:- তোমাকে কেন বলবো? ছোট মানুষ ছোট-ই থাকো! বাচ্চাদের সব কথা শুনতে হয় না।
কথক:- আনন্দের এই কথাটা ঝিলিকের গায়ে অপমানের মতো লাগলো ঠিক যেন কেউ একগাদা জলন্ত কয়লা ঢেলে দিয়েছে ওর শরীরে তেমনই রাগে জ্বলছে ওর ছোট্ট শরীরটা। এমনিতেই তখন রাগ দেখিয়ে কথা বলেছিলো যার জন্য এখনো সরি বলেনি এখন আবার অপমান, মানতেই কষ্ট হচ্ছে বিষয়গুলো। তাই ও ওদের কারো সাথে আর কোন( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) কথা না বলে চলে গেলো ক্যান্টিনের দিকে। ঝিলিকের এমন ব্যবহারের সাথে ওরা তিনজনই পরিচিত তাই ওরাও কোন কথা না বলে চুপচাপ ওর পিছন পিছন গিয়ে বসে পড়লো । আনন্দ ঝিলিকের পাশের চেয়ারে,আর সোহাগ ও মাজেদ ওর বিপরীতে সামনের চেয়ারে। ঝিলিক আনন্দকে নিজের পাশে দেখে বিপরীত দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল আর তা দেখে আনন্দ মুখটা পেঁচার মতো করে ফেলে আর বাকীরা এদের এই খুনসুটি দেখে মিটিমিটি হাসছে। আনন্দ ঝিলিকের মনোযোগ পাওয়ার জন্য গলাটা খাকাড়ি দিয়ে বলে,
আনন্দ:- তো এখন কি বলা যাবে ম্যাম?
ঝিলিক:- ------ ( নিশ্চুপ)
আনন্দ:- উহুম-উহুম!!!
ঝিলিক:- মাজেদ ভাই কাউকে বলেন বাচ্চাদের সাথে যেন কথা না বলে! ( অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেই গাল ফুলিয়ে)
মাজেদ:- আনন্দ দেখো আমার বাচ্চা বোনের সাথে কথা বলবে না! ( মজার ছলে শাসনের ভঙ্গিতে)
আনন্দ:- মাজেদ ভাই কাউকে বলেন আমি "সরি"! দরকার পড়লে এই যে আমি কানে ধরছি!( ডান কান ধরে) তবু ও সে যেন আমার উপর রেগে না থাকে ,সে রেগে থাকলে আমারও যে ভালো লাগে না।
মাজেদ:- বনু সরি বলছে,আমি এখন কি বলবো যে, আমার বাচ্চা বোন সরি একসেপ্ট করছে?( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
সোহাগ:- মিটিমিটি হাসছে!
ঝিলিক:-( মাজেদের দিকে চেয়ে,আহ্লাদের মতো করে) আমি তো বাচ্চা তাই কারো উপর বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারি না। যান বলেন আমি এবারের মতো মাফ করে দিয়েছি পরেরবার কিন্তু আর কোন মাফ নেই বলে দিলাম!
কথক:- ঝিলিকের এমন বাচ্চাসুলভ আচরণ আর কথায় এবার তিনজন- ই একসাথে উচ্চ স্বরে হেসে ফেললো এবার ঝিলিক ও ওদের সাথে হাসলো। তারপর চায়ের অর্ডার দিয়ে ঝিলিক ম্যানেজারের কেবিনের সমস্ত কথা খুলে বললো। সব শুনে সবাই স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো।
দেরি করে দিয়েছি তবে পার্টগুলো বড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছি,সময় লাগলেও একসাথে পড়লে ভালো লাগবে ইনশাআল্লাহ।।।
#এই গল্পটার প্রধান কাহিনী বাস্তব থেকে সংকলন করা তাই, অনুরোধ করবো গল্পটা সম্পূর্ণ লিখতে শেয়ার করে আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন!
পর্ব ০৪
কথক:-দেখতে দেখতে চার মাস পার হয়ে গেল ঝিলিকের চাকরির বয়স। ঝিলিক তার কাজে আরো দক্ষ হয়েছে। যেমনি হয়েছে অনেকের সাথে সম্পর্ক গভীর আর ঠিক তেমনি দেখেছে অনেকের ঘৃণিত দৃষ্টি। চার মাসে যেমন বন্ধু ও বেড়েছে তেমনি অনেক অদৃশ্য শত্রু ও হয়েছে। এর মধ্যেই কোম্পানিতে অনেক নতুন কর্মী এসেছে, অনেক পুরাতন কর্মীরা চলে গেছে। তবে এর মধ্যে যেটা ভালো হয়েছে সেটা হলো আনন্দ ঝিলিকের সম্পর্ক। আনন্দ তো প্রথম থেকেই ঝিলিকে মশগুল কিন্তু ঝিলিক-ই বরাবর আনন্দের অনুভুতির বারোটা বাজিয়ে দিতো তবে এখন আর সেটা করেনা।কেন করেনা সেটা ও নিজেও জানেনা। তবে এটা পরিষ্কার বুঝতে পারছে আগে ওকে কেউ আনন্দ সম্পর্কিত কিছু জিজ্ঞেস করলে কিংবা আনন্দের প্রেমিকা বলে সম্বোধন করলেন ওর রাগ কিংবা অস্বস্তি বোধ হলেও আজকাল সেটা হয় না বরং কেমন যেন এক অজানা ভালো লাগায় পরিণত হয়েছে। এমনকি আজকাল নিজে থেকেই আনন্দের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করে,অন্য কোন মেয়েকে আনন্দের আশেপাশে দেখলেই রাগে যেন শরীর জ্বলে যায়। এই বিষয়টা আনন্দ নিজেও খেয়াল করেছে।তাই আনন্দ ঠিক করেছে খুব শ্রীঘ্রই ঝিলিকদের বাসায় প্রস্তাব পাঠাবে এখন শুধু একটু সময়ের অপেক্ষা। আর সেই সময়টা হলো অনার্স ভর্তি পরীক্ষার পর কারন আনন্দ চাচ্ছে ঝিলিক অন্তত অনার্স ভর্তি হোক তারপর সে তার পরিবারকে জানাবে ঝিলিকের বিষয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা এই বিষয়ে এখনো ঝিলিককেই সরাসরি বলা হয়নি আর যেখানে স্বয়ং কন্যা- ই জানে না তার বিয়ের কথা সেখানে আর কি করা যায়।
এসব ভাবনার মাঝেই চলে গেল আরো কিছুদিন ,আজ ঝিলিক অনেক খুশি।কারন আজ ঝিলিকদের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। আর ঝিলিক খুব ভালো রেজাল্ট পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। দুপুর দুটোর সময় অনলাইনে রেজাল্ট জেনেছে। সাইন্স গ্রুপ থেকে Aগ্রেড পেয়ে পাশ করেছে।( নোট:- বলে রাখা ভালো বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ভর্তি, পরীক্ষা কিংবা ফলাফল প্রকাশ করা সহ সকল শিক্ষা কার্যক্রম জেনারেল সব বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা স্কুল কলেজের থেকে মিনিমাম ২-৩ মাস দেরিতে সম্পন্ন হয় ।আমি নিজেই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি পাশ করে অনার্স ভর্তি পরিক্ষার্থী তাই এটা আমি খুব ভালো করেই জানি। আর এখানে নিজের শিক্ষক নিজেকে-ই হতে হয় তাই সারাদিন চাকরি করে রাতের কিছুটা সময় পড়াশোনা করে কোনরকম পাশ করাটাও অনেক বড় বিষয়, সেখানে এ গ্রেড অনেক বেশি ই পাওয়া) ঝিলিক রেজাল্ট পাওয়ার সাথে সাথেই বাসায় ফোন করে মা বাবা সহ সবাইকে জানায়। সবাই খুব খুশি। আনন্দ অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিলো লাঞ্চের টাইমের একটু আগে আর এসেছে আসরের পর । এসেই ঝিলিকের খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারে ঝিলিক সম্ভবত আসরের নামাজে গেছে । এবং মাজেদ এটাও জানায় যে ঝিলিক এ গ্রেড পেয়ে পাশ করেছে।যদিও আনন্দ অলরেডি এই খবর জানে কারন ও সকালে ঝিলিকের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার নিয়েছিল রেজাল্ট বের করার জন্য। সোহাগ আনন্দের অফিসে ফেরার কথা শুনে ওর সাথে দেখা করতে আসে। এসেই আনন্দকে খোঁচা মেরে বলতে লাগলো,
সোহাগ:- ভাই মিষ্টি খাওয়াবেন না, ভাবি পাস করল তাড়াতাড়ি মিষ্টি খাওয়ান! ভালো মিষ্টি খাওয়াবেন কিন্তু! ( মজার সহিত)
কথক:-আনন্দ সোহাগের কথায় মুচকি হাসে এবং তার কাঁধে চাপড় মেরে বলল,
আনন্দ:- নিশ্চয়ই খাওয়াবো! কেন খাওয়াবো না? আফটার অল মাই উঠবি ওয়াইফের বিষয় বলে কথা।
কথক:- তারপর আনন্দ সোহাগকে সাথে করে নিয়ে চলে গেল মিষ্টি কিনতে এবং মাজেদকে বলে গেল এই কথা জানি কোনভাবেই ঝিলিক না জানতে পারে। কারন ঝিলিক জানতে পারলে কোনদিনও আনন্দ কে মিষ্টি আনতে দিবে না। ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে সোহাগ আর আনন্দ 15 কেজি মিষ্টি নিয়ে ফিরে এলো অফিসে। পুরো অফিসের সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করল এবং ঝিলিকের জন্য স্পেশাল ভাবে 2kg রসমালাই নিয়ে আসে কারন রসমালাই ঝিলিকের ফেবারিট মিষ্টি তাই সেই রসমালাইটা নিয়ে চলে গেল ছাদে। ছাদে গিয়ে দেখে ঝিলিক ছাদের এক কোনে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে উপরে আকাশের দিকে চেয়ে আপন মনেই কিছু ভেবে যাচ্ছে। আনন্দ ওর পাশে গিয়ে দাড়াতেই ঝিলিক পাশ ফিরে আনন্দ কে একবার দেখে আবারও সামনে ফিরে চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। আনন্দ ওর দিকে চেয়ে পূর্ণ একটা হাসি দিয়ে বলে,
আনন্দ:- কনগ্রাচুলেশন!
কথক:-ঝিলিক আনন্দের শুভেচ্ছার বিনিময়ে একটা মুচকি হাসি উপহার দেয় তারপর বলে,
ঝিলিক:- জানেন আমার ছোট বেলা থেকেই পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা। সবসময়ই ভাবতাম আমি অনেক দুর পড়বো। সবচেয়ে উচ্চতম ডিগ্রী অর্জন করবো।আমার স্কুল জীবনের মতোই কলেজ ভার্সিটি জীবনটাও অনেক সুন্দর করে কাটাবো। খুব পড়বো, খুব!! স্কুলে যেমন ফাস্ট গার্ল আছি পরবর্তীতেও আমি সবার সেরা হবো। কিন্তু বলেনা আমরা সবসময় যা চাই তা পাই না।
কথক:- ঝিলিকের কথায় আনন্দ স্পষ্ট হতাশার ছাপ দেখতে পায়।কথা বলতে বলতেই ঝিলিকের মুখটা কেমন বিষন্নতায় ছেয়ে গেছে। আনন্দ কিছু না বলে চুপচাপ শুধু ঐ বিষন্ন হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে চেয়ে থাকে। কিছুক্ষণ থামার পর ঝিলিক আবারও বলা শুরু করে।
ঝিলিক:- আমি ছোট বেলা থেকেই অনেক স্ট্রাগল করে এস.এস. সি পরীক্ষা দিয়েছি। এই দশ ক্লাস অবধি পড়তে আমাকে কয়েকদফা পড়ালেখা বন্ধ করতে হয়েছে টাকার জন্য। আমি এই দশ বছরে শুধু ৮ম-১০ম ক্লাস অবধি কোচিং করার সুযোগ পেয়েছি তাও অনেক কষ্টের পর। কখনো নানী টাকা দিয়ে সাহায্য করতো তো কখনো আব্বু অনেক কষ্ট করে অথবা ঘরের মূল্যবান কিছু বিক্রি করে আমার পরীক্ষার ফি যোগার করতো কিংবা কখনো মেধাবী নিয়মিত ছাত্রী হওয়ার কারনে স্কুল কর্তৃপক্ষ মওকুফ করে দিতো। এত কিছুর পরেও কোনদিন পড়াশোনা ছাড়ার কিংবা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় আমার মধ্যে কাজ করতো না। সবসময়ই ভাবতাম আব্বু আম্মু ঠিক ম্যানেজ করে নিবে।কিন্তু এস.এস. সি পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার ঠিক তিনদিন আগে যখন আব্বুর এক্সিডেন্ট হয় তখন কেন জানি মনে প্রচুর ভয় ঢুকে গিয়েছিলো এই ভেবে যে সব শেষ আর বোধহয় হলো না আমার অনেক পড়াশোনা করার স্বপ্ন পূরণ। এখানেই বুঝি সব শেষ!!
কথক:- এতটুকু বলেই ঝিলিক চুপ হয়ে গেল,এখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, এইবার আনন্দ- ই জিজ্ঞেস করলো।
আনন্দ:- তারপর, তারপর কি হলো।মানে তুমি পরে আবার পড়াশোনা কিভাবে শুরু করলে?
কথক:- ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে ওর কথার উত্তর না দিয়ে বললো, ভালো লাগছে না! চলেন নিচে যাই,বলেই পিছু ফিরে হাটা শুরু করে। আনন্দ বুঝতে পারলো ঝিলিক আর কিছু বলতে চাচ্ছে না কিন্তু আজ আনন্দ শুনেই ছাড়বে কারন ঝিলিক কখনো নিজের থেকে নিজের সম্পর্কে কারো কাছে কিছু বলেনা।। তবে সবসময় নিজের মধ্যে চাঁপা কষ্ট পুষে রাখে যেটা ঝিলিকের জন্যই খারাপ।আর আনন্দ মনে করে কষ্টের কারন যেটাই হোক আর যত বড়-ই হোক না কেন সেটা কারো সাথে শেয়ার করলে কষ্টের পরিমান ও কমে আর কারনটারও একটা সঠিক সমাধান হয়। তাই ও ঝিলিকের হাতটা পিছন থেকে শক্ত করে ধরে, ঝিলিক হাতে টান পড়ায় পিছনে ঘুরে দেখতে পায় আনন্দ ওর হাত ধরে রেখেছে।ও একবার ওদের হাতের দিকে তো একবার আনন্দের মুখের দিকে তাকায়, আনন্দ ঝিলিকের চাহনির তোয়াক্কা না করে ওকে টেনে সামনে এনে রেলিংয়ের পাশে দাড় করায় তারপর জোর গলায় বলে,
আনন্দ:-পুরো কথা শেষ করবে তারপর এখান থেকে যেতে পারবে।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের এহেন ব্যবহারে হতভম্ব বনে যায়। আনন্দ আবারও বলে উঠলো,
আনন্দ:- কি হলো বলো!
ঝিলিক:- কি বলবো?
কথক:- ঝিলিকের এমন হেয়ালিপনায় আনন্দের এবার মেজাজ বিগড়ে গেলো ও একটু কর্কশ ভাবেই বললো,
আনন্দ:- এমন কেন তুমি? কি সমস্যা তোমার? কিসের জন্য নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখো? তোমার কি মনে হয় না তোমার ভেতরে যা লুকিয়ে রেখেছো তা বাইরে বের করা উচিৎ? কি মনে হয় আমরা তোমার কষ্টের অংশীদার হওয়ার যোগ্য না!
কথক:- ঝিলিক অপরাধী মুখে আনন্দের দিকে চেয়ে বললো,
ঝিলিক:- দেখুন এমন কিছু না। আমি তো জাস্ট এমনি বলতে চাই না। কি হবে বলে, বলুন! আমার ফেলে আসা দিন কি আর ফিরে আসবে? আসবে না তো তাহলে?
আনন্দ:- এতই যখন বোঝো তাহলে কেন থাকো অতীত নিয়ে? কেন তোমার অতীত তোমাকে সুখী হতে বাধা দেয়?
ঝিলিক:- আমি অতীত নিয়ে পড়ে থাকি না কিন্তু মাঝে মধ্যে মনে পড়লে শুধু একটু মন খারাপ হয় এই যা !
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রয়েছে সেটা দেখে ঝিলিক মাথা নুইয়ে ফেলে তারপর বলে আচ্ছা ঠিক আছে বলছি!
ঝিলিক:- আব্বুর এক্সিডেন্টের সপ্তাহের মধ্যেই আমরা দুইবোন কাজে লাগি কারন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আব্বুর এক্সিডেন্টের আগের থেকেই অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া এক্সিডেন্টের আগের থেকেই আব্বুর চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছিল তারপর হঠাৎ এক্সিডেন্ট! আব্বুর সঠিক চিকিৎসা তো দুরে থাক দুবেলা খাবারের যোগান দেওয়াটাও অনেক কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিলো।তার উপর মরার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো ছিলো আব্বুর বিভিন্ন পাওনাদার মানে যাদের সাথে আব্বু কাজ করতো তাদের পাওনা পরিশোধের জন্য চাপ। সব মিলিয়ে অবস্থা খুব-ই করুন। তাই বাধ্য হই সব কিছুকে পিছনে ফেলে কাজে নামতে। যে
মেয়েরা কোনদিন স্কুল আর ঘর ছাড়া কোথাও যাইনি সে মেয়েরা তখন শত পুরুষের মাঝে কাজ করতে মার্কেটের দর্জি কারখানায় যাই। কোথায় লেখাপড়া আর কোথায় কি! কখন কলেজে ভর্তি সময় শেষ টের পেলাম না। এমনিতেও লেখাপড়ায় আমাকে গাইড করার মতো কেউ ছিলো না । বরাবরই আমার পড়া আমি একাই পড়েছি,স্কুল সম্পর্কিত যেকোন খবরাখবর আমি নিজেই নিয়েছি। সুতরাং সেই আমি যখন পেটের তাগিদে ব্যস্ত তখন পড়ালেখা সংক্রান্ত তথ্য না পাওয়ার-ই কথা। এভাবেই একটা বছর কেটে গেলো,আরো একবছর পিছিয়ে গেলাম পরবর্তী বছরের ভর্তির সময় ও প্রায় শেষ তখন স্কুলের এক ফ্রেন্ড এর সাথে হঠাৎ দেখা। আসলে এসএসসি পরীক্ষার পর আব্বু যখন অ্যাকসিডেন্ট করে তখন আমি নিজেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলি।সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই তাই ওদের সাথে আর দেখা হয়না। যাই হোক,ঐ আমাকে ভর্তি হওয়ার জন্য বলে,রিকুয়েস্ট করে যাতে আমি পড়াশোনা না ছাড়ি। ভর্তি সংক্রান্ত কিছু তথ্যও দেয় যেহেতু সময়ও প্রায় শেষ সেহেতু এটাও বলে কোথায় গেলে ভর্তি হওয়া যেতে পারে অন্তত ওখানকার শিক্ষকরা চেষ্টা করবে। আমি সেখানে যাই শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করি কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার সাবজেক্ট অনুযায়ী আমাকে ভর্তি নিতে পারে না, আর যেখানে আমার সাবজেক্ট অনুযায়ী সিট খালি আছে সেখানে অনেক টাকা ঘুষ চায় যেটা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না তাই ওনারা আমার সাথে প্রথমে খুব খারাপ ব্যবহার করে পরে উনারা আমার সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে আমাকে সাজেস্ট করে আমি যাতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইন্টার পড়াশোনা করি। তাদের ব্যবহারে প্রথমে খুব কষ্ট পাই কিন্তু পরে যখন সাজেস্ট করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি পড়তে তখন সেখানেই চলে যাই। তারপর সেখানে গিয়ে সমস্ত খবরাখবর ভালো করে জেনে ভর্তি হই আর পড়াশোনা করা শুরু করি। তারপর দুই বছরের জায়গায় পাচ বছর লাগিয়ে মাত্র আজ শেষ হলো আমার এইচএসসি জার্নি। এরমধ্যে তো হাজারটা ফ্যামিলি ক্রাইসিস ছিলো-ই, ভাইটা নষ্ট হয়ে যাওয়া,আম্মুর অসুস্থতা। আব্বুর স্টোক করা বারবারই হসপিটালে যাওয়া। জীবনটা কেমন ছন্নছাড়া অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। আমার অনেক স্বপ্ন ধুলোয় ঢাকা পড়ে গেছে। জানেন আমি খুব সুন্দর আর্ট করতে পারতাম।এক সময় ভাবতাম পড়াশোনার পাশাপাশি আমি একজন ভালো আর্টিস্ট হবো কিন্তু দেখেন আমার ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
ঝিলিক:- জীবনটা এত কঠিন কেন ইনচার্জ সাহেব? আমি তো এমন জীবন চাই নি! খুব সহজ-সরল কিন্তু রঙিন একটা জীবন চেয়েছিলাম ।না থাকতো সেখানে অনেক অর্থ প্রাচুর্য শুধু মাত্র স্বচ্ছলতা আর সীমাহীন ভালোবাসা-ই চলতো।
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের এতসময় এক মনে তাকিয়ে ছিলো কিন্তু এখন ঝিলিকের প্রশ্নের উত্তরে বলল,
আনন্দ:-জটিল বলেই তো একে জীবন বলে এখানে যেমন উত্থান আছে তেমনি পতনও আছে।
কথক:- কিছুক্ষণ থামার পর আনন্দ ঝিলিককে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:-এত সমস্যা হয়ে গেছে এর মধ্যে তোমাকে তোমাদের কোন পারিবারিক আত্মীয়-স্বজন সাহায্য করেনি?
কথক:- ঝিলিক একটা তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে,
ঝিলিক:- আমার নানা বাড়ির অবস্থা আমাদের চাইতেও খারাপ তবুও তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে কোন রকম ভাবে কখনো কখনো সেটা আর্থিক হোক কিংবা অন্য ভাবে হোক করেছে কিন্তু দাদা বাড়ি তারাতো বছর মাসে কোনরকম একবার খোঁজ নিয়ে কিছু টাকা জাকাতের মতো পাঠিয়ে দিতো। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আমার বাবার আরও একটা পরিবার আছে যারা গ্রামের বাড়িতে থাকে আমরা চাইলেও গ্রামের বাড়ি গিয়ে উঠতে পারতাম না আর না সেখান থেকে কোন ফাইন্যান্সিয়াল হেল্প আনতে পারতাম। তাই বলতে পারেন এই যুদ্ধটা আমার বা আমার পরিবারেরই ছিল আমরা নিজেরাই পড়েছি, নিজে নিজেই থেকে উঠেছি সাহায্য করার মত এরকম কেউ ছিলনা।
কথক:-এবার আনন্দ বুঝতে পারল আসল সমস্যাটা কোথায় আসলে সমস্যাটা হলো ফ্যামিলি এবং ফাইন্যান্সের একসাথে যে কারণে ঝিলিকের এতটা বেশি ট্রাজেডির মধ্যে পড়ে গিয়েছে। ঝিলিক আবারো হতাশ হয়ে একমনে আকাশের দিকে সামনে চেয়ে রইল। তাই আনন্দ এবার ওর মন ভালো করার জন্য কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে বলল,
আনন্দ:-আচ্ছা তুমি যে এত ভালো রেজাল্ট পেয়ে পাস করলে মিষ্টি খাওয়াবা না? দেখো তুমি যদি ভাবো মিষ্টি না খাইয়ে ছাড় পাবে তাহলে কিন্তু তা হবে না আমি শুধু মিষ্টি না সাথে ট্রিট ও চাই!!
কথাটি বলেই ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট এলিয়ে দিলো ঝিলিক ও আনন্দের এমন কথায় একটু স্বাভাবিক হয় তারপর কিছুক্ষণ সামনেই চেয়ে রয় এরপর আনন্দের দিকে তাকিয়ে বলে,
ঝিলিক:- আজব এত কষ্ট করে পড়াশোনা করলাম আমি পাশ করলাম আমি এখন আমাকে মিষ্টি না খাইয়ে,আপনি খাইতে চাচ্ছেন!আজব পাবলিক ভাই আপনারা!
কথক:- কথাটি বলেই মুচকি হাসে। আনন্দ বুঝতে পারলো ঝিলিক কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়েছে তাই ও এবার ঝিলিক কে বলে,
আনন্দ:- ওকে ঠিক আছে আমি-ই মিষ্টি খাওয়াচ্ছি কিন্তু আমি আনলে তুমি খাবে বলো তো ?
কথক:- আনন্দের এহেন কথায় ঝিলিক বলে,
ঝিলিক:-কেন খাবো না! নিশ্চয়ই খাবো তবে সেটা রসমালাই হতে হবে তাহলেই দেখবেন কিভাবে সাবার করে দেই!
আনন্দ:- তাই!
ঝিলিক:-হুম!
কথক:-মাথা দুলিয়ে বলল
আনন্দ:- তাহলে মুখ খোলো!
ঝিলিক:- কেন?
আনন্দ:- খোলো, হা করো?
কথক:- ঝিলিক তো আনন্দের কথায় এমনিতেই মুখ হা করে ফেলে আর আনন্দ সেই সুযোগে টুপ করে একটা রসমালাই ওর মুখে ঢুকিয়ে দেয়। ঝিলিক তো এবার পুরোই থ! আনন্দ ঝিলিকের এরকম মুখ ভঙ্গি দেখে বলে মুখ বন্ধ করো!
ঝিলিক মুখ বন্ধ করে রাখে কিন্তু মিষ্টি চিবায় না, তাই এবার আনন্দ বলল কি হল খাও দেখো কেমন লাগে! ঝিলিক মিষ্টি চিবাতে চিবাতে আনন্দের দিকে চেয়ে থাকে আর মনে মনে বলে,দেখেছো আগেই মিষ্টি এনে রেখেছে আর এখন আমাকে এসে ফাঁকা আওয়াজ মারা হচ্ছে। আনন্দ ঝিলিকের ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা মিষ্টির রসটা নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে সেই আঙ্গুল টা নিজের মুখে পুরে নেয় আর এটা দেখে ঝিলিক তো পুরোই আশ্চর্য হয়ে পড়ে।আর এই কাজটা আনন্দ ঝিলিকের চোখে চোখ রেখেই করে। ঝিলিক আনন্দের গভীর চাহনি নিতে পারেনা তাই চোখ নামিয়ে নেয়। আনন্দ বলে,
আনন্দ:- তোমার ঠোঁটের কোনে হাসি মানায়। বিষন্নতা না।তাই আমি চাই তুমি সবসময় হাসিখুশি থাকবে। একটা কথা মনে রাখবে, তোমার জীবনে অতীতে যা হয়েছে তা হয়তো আমি ঠিক করতে পারবো না কিন্তু ভবিষ্যতে যা হবে তার জন্য সবসময় আমি তোমার পাশে আছি। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো তোমার পাশে থেকে তোমার সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে।সেটা যত কঠিনই হোক না কেন আমাকে তোমার পাশেই পাবে।আর সেটা তুমি চাইলেও আর না চাইলেও সেটা হোক আনন্দের কিংবা কষ্টের!
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের ডান হাতটা নিজের ডান হাত দিয়ে ধরে নিজের বুকের বা পাশে রেখে বলে,
আনন্দ:-ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় তোমাকে এখানে জায়গা দিয়েছি! আমি জানি না তোমার ভেতরে আমার জন্য কোন অনুভূতি আছে কি নাই কিন্তু আমার ভেতরে তুমি আছো আর থাকবে!!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় কোন উত্তর না দিয়ে শুধু মাথাটা নত করে ফেলে, আনন্দ বুঝতে পারে ঝিলিক ওর প্রশ্নের উত্তর দিবে না আর ও উত্তরের আশাও করেনা তাই মিষ্টির হাড়িটা ঝিলিকির হাতে ধরিয়ে বলল,
আনন্দ:- পুরোটা তোমার।একাই খাবে। বাড়ির জন্য মিষ্টির প্যাকেট নিচে রেখেছি যাওয়ার সময় নিয়ে যাবে।
কথক:- ঝিলিক চোখ বড় বড় করে আনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকে আনন্দ কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিচে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে হাটতে শুরু করে।যেতে যেতে বলে যায়,
আনন্দ:- মিষ্টি মাফ করেছি তাই বলে ট্রিট না।তাই রেডি থেকো সময় হলে আমি আমার ট্রিট চেয়ে নিবো।
পর্ব ০৫
কথক:- গার্মেন্টসের গেটের সামনের এক সাইডে দাড়িয়ে আছে ঝিলিক। হাতে ইয়া বড় একটা টিফিন বক্স। এক এক করে সবাই ভিতরে ঢুকছে কিন্তু ঝিলিক অপেক্ষা করছে তার ইনচার্জ সাহেবের জন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতে পেল সোহাগ আর মাজেদ কে। ওদের দিকে এগিয়ে যেতেই আনন্দকেও দেখতে পায়। কিছু একটা ভেবে আনন্দের দিকে না গিয়ে মাজেদের সামনে গিয়ে দাড়ায়,হাতের টিফিন বক্সটা মাজেদের হাতে ধরিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো,
ঝিলিক:- কাউকে বলবেন তার ট্রিটের জন্য।আর হ্যা আপনার আর সোহাগ ভাইয়ের জন্যও , সুতরাং সে যেন একলাই সাবার না করে।
কথক:- আনন্দ ঝিলিককে মাজেদ আর সোহাগের সাথে দেখে সেখানেই এসে মাজেদের পিছনে দাঁড়ায় তাই ঝিলিকের বলা পুরো কথাটাই শুনতে পায়। মুচকি হেসে মাজেদকে বলে,
আনন্দ:- এটাতো কথা ছিলো না ভাই! ট্রিট চাইলাম আমি,আর পাচ্ছে পুরো গুষ্টি! আবার কথাও শোনানো হচ্ছে আমাকে!!
কথক:- মাজেদ আনন্দের দিকে ফিরে বলে উঠলো,
মাজেদ:- এমন করো কেন মিয়া, তোমার উছিলায় যদি আমাদের মতো গরীবের কপালেও একটুআধটু জোটে, তাতেও তোমার জ্বলে!
সোহাগ:- বুঝলাম ঝিলিক কারো সাথে কথা বললে আপনার জ্বলে এখন আমাদের কিছু খাওয়াইলেও জ্বলে!
কথক:- সোহাগ দুষ্টুমি করে হাসি দিয়ে আনন্দের দিকে একবার ঝিলিকের দিকে একবার তাকিয়ে বললো কথাটি।
-----
At Lunch time..2 pm
কথক: ঝিলিক, আনন্দ, সোহাগ, মাজেদ, পারভীন, টুকটুকি,আরো দুজন মেয়ে একসাথে বসেছে খেতে। আনন্দ ট্রিট হিসেবে ঝিলিকের হাতের রান্না করা ভুনা খিচুড়ি আর কয়েক পদের ভর্তা খেতে চেয়েছিলো। ঝিলিক খিচুড়ি ভর্তাসহ গরুর গোশত ভুনা আর ইলিশ মাছ ভাজা এনেছে। সবাই খুব মজা করেই খাচ্ছে।যদিও এটা ঝিলিকের প্রথম রান্না তাই ও একটু বেশিই নার্ভাস ফিল করছিলো এই ভেবে যে আনন্দের কাছে কেমন লাগবে? তাই ও বারবার আনন্দের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো যেন আনন্দের তৃপ্তিই ওর কষ্টের সুমিষ্ট ফল হিসেবে প্রকাশ হবে। আনন্দ খুব খুশি মনেই খাচ্ছে আর সেটা তার মুখের হাসিই বলে দিচ্ছে, তবুও যেন একবার আনন্দ নিজের মুখে বলে এখন সেটারই অপেক্ষা করছে ঝিলিক। খেতে খেতে সবাই-ই ঝিলিকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কিন্তু একমাত্র আনন্দ-ই এখনো কিছু বলেনি। খাওয়া শেষে সবাই সবার কাজে চলে যায়। আনন্দ অফিসের বাইরে কোথায় যেন গেল। ঝিলিকের মুখটা কালো হয়ে গেল ,ও শুধু এটাই ভাবছে সবাই কত প্রশংসা করলো কিন্তু উনিই কিছু বললেন না, কিন্তু কেন? উনার কাছে কি ভালো লাগেনি? কিন্তু খাবারটা তো সত্যিই অনেক ভালো হয়েছিল । তাহলে? এইসব ভাবনার মাঝেই মন খারাপ করে ঝিলিক সারা বিকেল কাটিয়ে দিলো।
বিকেল ৪টার সময় আনন্দ অফিসে ফিরে আসে।এসে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কিছু জরুরী কাজ শেষ করে ফোন করে ঝিলিক কে ছাদে যেতে বলে। ঝিলিক ছাদে গিয়ে দেখে আনন্দ এখনো আসেনি তাই ও ক্যান্টিনের সামনে গিয়ে চায়ের কথা বলে। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। কিছু সময়ের মধ্যেই আনন্দ চলে আসে এর মধ্যে চা ও হয়ে যায়। দুজন দু কাপ চা হাতে নিয়ে ছাদের একপাশে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পান করতে থাকে। কেউ কোন কথা বলছে না।চা শেষ হলে কাপটা রেলিংয়ের ওপর রেখে ঝিলিক-ই আগে বলা শুরু করে,
ঝিলিক:-কেন ডেকেছিলেন?
কথক:- আনন্দ চা শেষ করে ক্যান্টিনের একটা ছেলেকে ডেকে কাপ দুটো নিয়ে যেতে বলে। একজন লোক এসে কাপ দুটো নিয়ে যায়। আনন্দ ঝিলিকের দিকে চেয়ে বললো,
আনন্দ:- কাল বাড়ি যাচ্ছি!
ঝিলিক:- হঠাৎ?
আনন্দ:- বাবা ইমার্জেন্সি যেতে বললো !
ঝিলিক:- হঠাৎ! ইমার্জেন্সি! কেন?
আনন্দ:- কেন তা বলেনি ,শুধু বলেছে জরুরী!
কথক:-ঝিলিক ছোট্ট করে শুধু বললো,
ঝিলিক:- ওহ্
কথক:- মুখটা ছোট করে সামনে ফিরে তাকিয়ে রইলো, হঠাৎ-ই টের পেলো ওর পায়ে কারো হাত,ও চমকে নিচে তাকিয়ে দেখে আনন্দ ওর পা ধরে নিজের পায়ের হাটুর উপর রাখছে।আর সেটা দেখে ও সরে আসতে চাইলেই আনন্দ চেপে ধরে। ঝিলিক সরানোর চেষ্টা করে বলে,
ঝিলিক:- কি করছেন? আপনি আমার পায়ে কেন হাত দিচ্ছেন?
কথক:- আনন্দ হালকা ধমকের সুরে বললো,
আনন্দ:- চুপ থাকো তো! এতো নড়ছো কেন?
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের এক পায়ে সুন্দর একটা রুপার পায়েল পড়িয়ে দেয়।পায়েলটা দেখতে অসাধারন। খুব সুন্দর নিখুঁত একটা ডিজাইন। কোনরকম ঝুনঝুনি ব্যবহার করা হয়নি কারন ও জানে ঝুনঝুনি ওয়ালা কোন অলংকার ঝিলিক ব্যবহার করবে না। তাই চিকন চেইনের মতো স্টোন বসানো নিখুঁত কাজ করা একটা পায়েল নিজে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছে। এটা ও অনেক আগেই গড়তে দিয়েছিল ঝিলিক কে ভালো রেজাল্টের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য।
--ঝিলিক নিচু হয়ে নিজের পায়ে রুপালি কালার জ্বলজ্বল করা পায়েলটা দেখে খুশি হলেও সেটা প্রকাশ না করে আনন্দের দিকে তাকিয়ে বললো,
ঝিলিক:- এটা কেন দিচ্ছেন? এটা আমি নিতে পারবোনা!
কথক:- এটা বলেই ঝিলিক পায়েলটা খুলতে গেলেই, আনন্দ ওর হাত ধরে বাঁধা দেয় আর বলে,
আনন্দ:- প্লিজ ঝিলিক!
কথক:- ( অনুরোধ করে)
ঝিলিক:- কিন্তু!
কথক:- (করুন সুরে)
আনন্দ:- কোন কিন্তু না, এটা সামান্য একটা জিনিস! প্লিজ খুলো না!
কথক: আনন্দের করুনভাবে বলা কথাটি ঝিলিকের খুব গভীরে গিয়ে লাগলো তাই ও আর পায়েলটা খুললো না।
---উঠে আনন্দের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো , পিনপতন নিরবতায় কেটে গেল কিছু মুহূর্ত। নীরবতার চাদর ভেদ করে আনন্দ-ই প্রথম বললো,
আনন্দ:- সাবধানে থাকবে। ছাদ, বাথরুম কিংবা গোডাউন কোথাও একা যাবে না। সবসময় কারো না কারো সাথে থাকবে।ওকে!!
কথক:-ঝিলিক আনন্দের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় দেয় আর মুখে বলে ,
ঝিলিক:- হুম।
কথক:- আনন্দ কিছুক্ষণ এক ধ্যানে ঝিলিকের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাকায় তারপর বলে,,
আনন্দ:- নিজের খেয়াল রাখবে! রাতে সবার আগে বের হওয়ার চেষ্টা করবে।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে তারপর বলে,
ঝিলিক:- কতদিন পর আসবেন?
আনন্দ:- তিন/চারদিন লাগবে হয়তো।
ঝিলিক:- ওহ্।
আনন্দ:- চলো নিচে যাই!
কথক:- ঝিলিক আগে আগে আর আনন্দ ঝিলিকের পিছনে পিছনে। আনন্দের দৃষ্টি ঝিলিকের পায়েল পড়া পায়ে। হাটার তালে তালে পায়েলের পাথরগুলো ঝিলিক দিয়ে উঠে। আর সেটা দেখে আনন্দ নিঃশব্দে হাসে।
সিড়ির সামনে গিয়ে আনন্দ ঝিলিককে পিছন থেকে ডাক দেয়,
আনন্দ:- ঝিলিক।
কথক:-ঝিলিক পিছনে ঘুরে আনন্দের দিকে তাকায়,
ঝিলিক:- হুম।
আনন্দ:- আমি আজকের রাঁধুনীর রান্না সারাজীবন খেতে চাই।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জা মিশ্রিত হেসে মাথা নুইয়ে নেয় ,আর তা দেখে আনন্দ নিজের উত্তর পেয়েছে মনে করেই মুচকি হাসি দেয়।
--- কথক:- দু'দিন পর ,,
আনন্দ গ্রামে গেছে আজ দুদিন হলো। এই দুদিন ঝিলিক সোহাগ ও মাজেদের নজরদারিতে ছিল। তবে এই দুদিনে যেই বিষয়টি ঝিলিকের নজরে প্রখর ভাবে ধরা পড়েছে সেটা হলো ওর বসের ওর প্রতি ব্যবহারের। যার কিছুটা ও আগের থেকেই বুঝলেও এই দুদিনে সেটা ওর ভিতরে খুব ভয়ের সৃষ্টি করেছে।ও ভেবে নিয়েছে ভার্সিটি ভর্তির ঝামেলাটা শেষ হলে এই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে যেকোন ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরির জন্য চেষ্টা করবে।
----------আমাদের জীবনের সবকিছুই উপরওয়ালার হাতে। যদিও মানব মুখে বলা , তিনটা বিষয়,'জন্ম, মৃত্যু,বিয়ে' এই তিন বিধাতা নিয়ে! আসলেই শুধুই তাই? নাহ্! যার ইশারা ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না তিনি-ই হচ্ছেন আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তা,বিশ্বভ্রমান্ডের মালিক,দিন ও দুনিয়ার বাদশা, আমাদের জীবনের ও ভাগ্যের মালিক মহান করুনাময় , শক্তিশালী, ক্ষমাশীল পরম দয়ালু ,আল্লাহতায়ালা। তিনি তার প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা নিতে পছন্দ করেন। কঠিন কঠিন বিপদে ফেলে ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেন। কখনো অর্থ কিংবা কখনো ইজ্জতের উপর দিয়ে কিংবা কখনো প্রিয়জনদের কেড়ে নিয়ে আল্লাহ আমাদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেন। তার প্রতি বিশ্বাস ভালোবাসা ভক্তির পরীক্ষা নেন। তাই আমাদের সাথে যাই হোক তার পুরোটাই আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার ইচ্ছায়-ই হয়। তবে তাই বলে এই নয় যে এখানে আমাদের কোন ভূমিকা নেই। আমাদের কিন্তু পদে পদে সতর্ক সংকেত দেখানো হয় । অনেক সময় আমরা দেখেও দেখি না। কিংবা গুরুত্ব দেই না আর সেটাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। কিন্তু আমরা কি করি সব দোষ ভাগ্য আর ভাগ্যের মালিকের উপর চাপিয়ে নিজেদের গা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। অথচ এই ক্ষেত্রে ভাগ্য কিংবা ভাগ্য মালিকের চেয়ে আমাদের দোষ-ই কিন্তু বেশি। কারন আমরা সতর্ক বার্তা পাওয়ার পরেও নাধানের মতো কাজ করি। হয় চুপ থেকে চোখ বন্ধ করে রাখি এই ভেবে যে চুপ থাকলেই কোন সমস্যা নেই অথবা মুখ খুললেই বিপদ অথচ আমরা এটাই ভুলে যাই যে যেটা আমাদের সাথে ঘটার সেটা মুখ বন্ধ রাখলেও ঘটবে আর মুখ খুললেও ঘটবে। সুতরাং মানতে হবে আমাদের সাথে ভালো মন্দ যাই হোক সেটা যতটা আমাদের কিসমতের জোরে হয় ঠিক ততটাই আমাদের কর্মের কারনে ঘটে।
--------হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের সামনে ফ্লোরে জবুথবু হয়ে বসে আছে আনন্দ। মাথার চুল উসকোখুসকো, সবসময় ইন করে রাখা শার্টটা আজ রক্ত আর ধুলাবালিতে মাখামাখি। স্তব্ধ চাহনি, যেন চোখের ভাষাই বন্ধ হয়ে গেছে, মুখটা মলিন। কান্নার ছাপটা যেন ভালো মতোই ফুটিয়ে উঠিয়েছে হারানোর ভয়, হেরে যাওয়ার আতংক, না পারার ব্যর্থতা, অপরাধবোধ , বুকের অসহ্য যন্ত্রণা,আগলে না রাখতে পারার কষ্ট! সব কিছু মিলিয়ে আনন্দের অবস্থা পুরোই পাগল পাগল! কিছুটা দুরে দাঁড়িয়ে থেকে মাজেদ আর সোহাগ এগুলোই দেখছিল। ওদের অবস্থাও খারাপ। কিন্তু ওরা জানে আজ আনন্দের অবস্থাটা কেমন তাই নিজেদের কষ্টটা লুকিয়ে রেখে আনন্দের কাছে গিয়ে একটু ঝুঁকে আনন্দের বা কাঁধে হাত দিয়ে ডাকে আনন্দের কোন হেলদোল না দেখে কাঁধ ধরেই ঝাঁকি দেয়। আনন্দ তাও নড়ে না। মাজেদ আবার কিছু বলতে যাবে তখন সোহাগ বাধা দিয়ে বলে,
সোহাগ:- ভাই ছাড়েন, থাকতে দেন কিছু সময় নিজের মতো।ঝিলিকের কোন খবর পেলে দেখবেন নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।
কথক:- মাজেদ সোহাগের কথার উত্তরে কিছু না বলে আনন্দের পাশেই হাটু মুড়ে বসে পড়ে। সোহাগ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে।
----আনন্দ ভাবছে সে সময়ের কথা যখন ঝিলিককে ও বিভৎস অবস্থায় দেখে। মৃত প্রায় একটা মুখশ্রী! নির্বাক চাহনি! ক্ষতবিক্ষত ছোট্ট শরীরে নূন্যতম কাপড়টুকুও ছিলো না। ভাবতেই চোখটা খিচে বন্ধ করে ফেলে। চোখ বন্ধ করেও যেন শান্তি পাচ্ছে না ওর মনে হচ্ছে ঝিলিকের এই অবস্থার জন্য ও নিজেই দায়ী। কেন ঐ সময় ও ঝিলিকের পাশে ছিল না। কেন? কেন?? ও ( ঝিলিক) তো নিশ্চয়ই ওকে (আনন্দ) খুজেছিলো, বারবার ইনচার্জ সাহেব বলেই চিৎকার করছিলো? তাহলে কেন ওর কান্না আমার অবধি পৌঁছালো না! আনন্দ আপনমনেই এসব ভেবে নিজেকে দোষারোপ করছিলো এর মধ্যেই একজন ডাক্তার যে কিনা ঝিলিকের চিকিৎসা করছেন তিনি বের হয়ে আসে কেবিন থেকে। তাই দেখে সোহাগ মাজেদ কে ডেকে ইশারায় ডাক্তারকে দেখায়। মাজেদ উঠে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলা শুরু করে।ডাক্তারের গলার ভয়েস শুনে আনন্দ উঠে দাঁড়ায় তারপর দুর্বল শরীরে হেটে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে যায়।
আনন্দ:- ডাক্তার আমার ঝিলিকের কি অবস্থা?
কথক:- কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো কথাটি।
---ডাক্তার আনন্দের অবস্থা দেখে, আনন্দের আগাগোড়া ভালো করে একবার দেখে মুখটা মলিন করে জিজ্ঞেস করে,
ডাক্তার:- আপনি ভিকটিমের কি হন?
কথক:- ডাক্তারের কথায় আনন্দের মুখটা চুপসে গেল, মনে মনে চিন্তা করে, এখন কি বলবে সে সবাইকে? ঝিলিককে সে ভালোবাসে? এইটা বলা কি এখন যথার্থ সময়? এমনিতেই পুলিশ এখন হাজারো কাহিনী খুঁজবে? পরে না দেখা যায় এই কেসটাই উল্টে দেয় টাকা খেয়ে! আনন্দের অবস্থা বুঝে মাজেদ-ই বললো ডাক্তারকে,
মাজেদ:- ওর হবু বউ। খুব শীঘ্রই ওদের বিয়ে।
কথক:- ডাক্তার আনন্দের কাঁধে হাত রেখে বললো,
ডাক্তার,:- দেখুন আমি মিথ্যা আশ্বাস দিবো না। ভিকটিম যতটা না শারীরিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানসিক ভাবে হয়েছে। উনি নিজের সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়টি কিছুতেই মানতে পারছে না আর তার জন্যই বারবার সেন্স হারাচ্ছে। শুধু এটাই নয়, প্রচুর পরিমান বিল্ডিং হয়েছে যার দরুন শরীরের কার্যক্ষমতাও ব্যাহত হচ্ছে তার সাথে যোগ হয়েছে ভয় সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা খুব-ই ক্রিটিক্যাল। হতে পারে উনি সাময়িক ভাবে কোমায় ও চলে যেতে পারে!
কথক:- আনন্দ একদম নিশ্চুপ! ডাক্তার কিছুক্ষণ থেমে আনন্দের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললো,
ডাক্তার :- শক্ত হোন। এইসময় আপনার আর পরিবারের সাপোর্ট খুব জরুরি। আশাকরি আল্লাহ তাড়াতাড়িই উনাকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিবে!
কথক:- ডাক্তারের কথার মাঝেই পুলিশ এসে দাড়ালো ওদের কেবিনের সামনে।
পর্ব ০৬
কথক :- পারি সোহার কথায় আর কিছু বললো না হালকা মৃদু হেসে মাথা কাত করে সম্মতি জানালো। পারি সায়েরার সাথে গল্প করছিল আর মিসেস মাহমুদ আর সোহা নিজেদের সাংসারিক কথাবার্তা বলছিলো এর মধ্যেই সোহার নাম্বারে সম্রাটের ফোন আসে এবং সে জানায় আজ আসতে দেরি হবে সুতরাং পারি যেন অপেক্ষা না করে চলে যায় তার সাথে সকালেই কথা বলবে। ইনশাআল্লাহ! এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে সোহা ড্রাইভারকে বলে নিজের গাড়ি দিয়েই পারিকে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
কথক :- পরের দিন সকাল ৮:৩৫ মিনিট , কলিং বেলের আওয়াজে আসমা খালা দরজা খুলে দিলে পারি ভিতরে ঢুকতেই সায়েরার গলার আওয়াজ শুনে একটু চিন্তিত হয়ে মনে মনে ভাবে আজ স্কুলে যায়নি? পারির ভাবনার মাঝেই কেউ মনি বলে দৌড়ে এসে পারির কোমর ছোট কোমল হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে,পারি ও মুচকি হেসে নিচু হয়ে হালকা জড়িয়ে ধরে কপালে একটা মমতার চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
পারি :- আজ স্কুলে যান নি আপনি?
সায়েরা :- উহুম ( মাথা দুদিকে দুলিয়ে বলে )
পারি :- কেন ( চিন্তিত হয়ে কপালে,গলায় হাত ছুঁইয়ে) শরীর ঠিক আছে দেখি?
সায়েরা :- আমি আজকে মামার সাথে খেলবো,তাইতো স্কুলে যাই নি। আর তুমি জানো মনি,আজকে তো অনেক মজা হবে, আজকে আমার পাপা ও আসবে!
পারি :- ওহ তাই! কিন্তু স্কুল কামাই করা তো ভালো কথা নয়,গুড বেবিরা কখনো স্কুল মিস করে না। ( একটু হতাশ ভাব ধরে বললো )
কথক:- পারির কথায় সায়েরা মুখটা ছোট করে ফেললো আর কাদোকাদো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
সায়েরা :- তাহলে কি আমি গুড গার্ল নই? কিন্তু মামনি তো বলে আমি গুড বাচ্চা ।
সায়েরার এমন ভাবভঙ্গি দেখে পারি মনে মনে অনেকটা কষ্ট পেল কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ না করে মুখটাকে স্বাভাবিক রেখে বললো,
পারি:- হ্যা তুমি তো গুড বাচ্চা কিন্তু কি বলো তো তুমি যদি স্কুলে নিয়মিত না যাও তাহলে তুমি আর গুড বাচ্চা থাকবে না, তোমাকে তোমার মিস ও আর আদর করবে না আর না তোমার কোন বন্ধু থাকবে। কারন সবাই বলবে সায়েরা ব্যাড বেবি তার সাথে আমরা মিশবো না তখন; তখন তুমি কার সাথে খেলবে বলো !
সোহা :- "আমিও তো তাই বলি কিন্তু কে শোনে কার কথা ",
কথক:- হঠাৎ কারো কন্ঠে সোজা হয়ে দাড়ায় পারি সামনে তাকিয়ে সোহাকে দেখে মুচকি হেসে সালাম দেয়,সোহা ও সালামের উত্তর দেয়।
সায়েরা :- "আমি আর কখনো স্কুলে মিস করবো না প্রমিজ, কিন্তু আমি bad baby না, I am good girl" তাই না মাম্মা!!
কথক:- সায়েরার এমন আবেগে আপ্লুত কথায় সোহা পারি দুজনেই তার দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকায় তারপর হঠাৎ ই হেসে দিয়ে পারি বলে,
পারি :- " তুমি গুড গার্ল, সবচেয়ে বেশি গুড আর তাই আজকের পর কখনো স্কুল মিস করবে না ,ওকে বেবী!!
কথক:- সায়েরা মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায়। তারপর সায়েরার হাত ধরে ভিতরে চলে যায়।
সম্রাট নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো, কলিং বেলের শব্দে বুঝতে পারে হয়তো সায়েরার গভর্নরই এসেছে কারন এতো সকালে উনি ছাড়া আর কে-ই বা আসতে পারে তাই নিজের হাতের কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করে। সোহা গিয়ে পারির কথা বললে, বলে আসছি! পারি সায়েরার রুমে গিয়ে ওর বই খাতা গুলো ঠিকঠাক করতে থাকে,আর সায়েরার পাকা পাকা কথার উত্তর আবিষ্কার করতে থাকে। সোহার গলার আওয়াজে দু'জনেই দরজার দিকে দৃষ্টি ফেলে, সোহা বললো ,
:- পারী চলুন নিচে বসে এক কাপ চা খাই!
কথক :- পারি সোহার কথায় সায় দিয়ে বললো ,জ্বী চলুন। যদিও পারী এখন চা খাবে না তবুও হ্যা বললো কারন পারি বুঝতে পেরেছে যে চা খাওয়ার কথাটা শুধু ফর্মালিটি কারন এখন নিশ্চয়ই সায়েরার মামার সাথে দেখা করতে হবে তাই এই চায়ের কথা বলা । সম্রাট আগেই ড্রয়িং রুমে বসেছিল,পারি নিচে নেমে ধীর পায়ে হেটে সেদিকেই যাচ্ছে ।এরা একে অপরকে এখনো দেখেনি কারন সম্রাট পারির বিপরীতে মুখ করে বসেছিলো ,সোহার কথায় সম্রাট পিছনে ঘুরে আর পারি ও সালাম দেয়, পারির সালামের উত্তরে, অলাইকুম আসসা*** বলতে গিয়ে থেমে যায়, হঠাৎ ই চোখের সামনে পারিকে দেখে যেন গলাতেই বাকী শব্দ গুলো আটকে যায় আর পারি ও সম্রাটকে দেখে থমকে যায়। এতগুলো বছর পর আবারও এই মুখটা দেখতে পাবে সেটা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না!!
পর্ব ০৭
কথক:-কথার মাঝেই একটু ধম নেয় তারপর আবারো বলা শুরু করলো,
আনন্দ:- আমি গ্রামে গিয়েছিলাম চারদিন আগে। আমি একদিন থেকেই আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু মায়ের আবদারের কাছে হার মেনে থেকে যাই।
কথক:- আনন্দের কথার মাঝেই ফোড়ন কেটে অফিসার প্রশ্ন করলেন,
পুলিশ অফিসার:- তো এই যে দুদিন গ্রামে ছিলেন এর মধ্যে ঝিলিক আর আপনার মাঝে কোনরকম যোগাযোগ হয়নি?
কথক :-মাজেদ আর সোহাগ অধৈর্য হয়ে পড়ে, পুলিশ অফিসারের এরকম অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে! তারেক সাহেব তো বুঝতেই পারছেন না অফিসার কেন এইসব জিজ্ঞেস করছে? আর তার চেয়ে ও তাকে যা বেশি ভাবাচ্ছে সেটা হলো আনন্দ ঝিলিকের সম্পর্কের কথা শুনে। ওনাদের আদরের মেয়ে, যাকে কিনা কোনদিন কোন ছেলের সাথে ভালো মতো দাঁড়িয়ে দুমিনিট কথা বলতে দেখেনি সে কিনা কারো সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে! এটাও তাকে শুনতে হচ্ছে! উনি কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকালো আনন্দের দিকে! সোহাগ এইবার আর সহ্য করতে না পেরে অফিসারের উদ্দেশ্যে বলে ফেললো,
সোহাগ:- স্যার ঝিলিকের রেপের সাথে এইসব কথার কি সম্পর্ক? ঘটনা ঘটছে আজ তাও আমাদের কোম্পানিতে, এতগুলো প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আছে তাহলে এত বয়ানের- ই কি আছে? আর কেনই বা এতদিনের এত ইতিহাস ঘাটার দরকার আছে?
কথক:- সোহাগের অধৈর্য হয়ে বলা কথাটি অফিসারের খুব একটা ভালো লাগেনি! তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সোহাগের দিকে তাকালেন তারপর উঠে দাড়িয়ে সোহাগের কাঁধে হাত দিয়ে খুব জোরে চেপে ধরে বললেন,
পুলিশ অফিসার:- দেখুন আমি বুঝতে পারছি আমার এরকম প্রশ্ন আপনার কাছে ভালো লাগেনি, কিন্তু কি করার আছে বলেন ? আমাদের কাজটাই যে একরকম,কেসের সাথে জড়িত সব কিছুই খুব নিখুঁতভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়। আর সেক্ষেত্রে যদি হয় ভিকটিমের আশেপাশের বিষয়াদি তাহলে তো বলতে হয় এক চুল পরিমানও ছাড় দেওয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। আর সেখানে ভিকটিমের আশেপাশের মানুষজন বিশেষ করে যারা তার কাছাকাছি সবসময় থাকে তারাতো থাকে সন্দেহের,জেরার তালিকায় মূখ্য। আর এই কেসের ক্ষেত্রে ভিকটিমের সাথে আপনাদের তিনজনের নাম তো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, বিশেষ করে মিস্টার আনন্দের নাম! তার নাম তো দেখি ঝিলিক উচ্চারণ করার সাথে সাথেই বেজে ওঠে।
কথক:- অফিসারের এমন কথায় মাজেদ, সোহাগ দুজনেই আতংক ভরা চোখে তাকিয়ে আছে অফিসারের মুখ পানে,নির্বাক শুধু আনন্দ।ও হয় তো জানতো এমন কিছুই হবে। অফিসার আনন্দের নির্বাক চাহনির তোয়াক্কা না করে মাজেদ ও সোহাগের দিকে তাকিয়ে বললো,
পুলিশ অফিসার:- তাই আমি বলছি আমাকে আমার কাজটা নিজের মতো করে করতে দিন আশাকরি এতে করে আপনাদের উপকার-ই হবে।
কথক:- পুলিশ অফিসার কথা শেষ করে আবার ও আগের জায়গায় গিয়ে বসে, তারপর হাবিলদারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি রেকর্ড করছেন? হাবিলদার মাথা নাড়িয়ে বোঝায় হ্যা রেকর্ড করা হচ্ছে! তারপর আনন্দের দিকে তাকিয়ে বলে, আচ্ছা তো বলেন, ঝিলিকের সাথে আপনার আর কোন যোগাযোগ হয়েছিলো কিনা?
আনন্দ বলতে শুরু করে,
আনন্দ:- হ্যা রোজ-ই কথা হয়েছে।প্রতি তিন বেলাই কথা হয়েছে। সকালে,লাঞ্চের আগে এমনকি রাতে ছুটির সময় ও। আমি গতকাল যে আসবো সেটা ঝিলিক জানতো না কারন ওকে বলেছিলাম আজকের কথা। মানে আমি ওকে কাল হঠাৎ করে এসে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কে জানতো আমি নিজেই এত বড় সারপ্রাইজের মুখোমুখি হবো যে আমার পুরো দুনিয়াই ওলটপালট হয়ে যাবে?
পুলিশ অফিসার:- বুঝলাম না,ক্লিয়ার করুন!
আনন্দ:- আমি ঢাকার বাসে উঠি দুপুরের শেষ সময়ে। ঢাকা পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাস ঢাকা পৌঁছানোর পর আমি ঝিলিককে ফোন করি,কথা বলে জানতে পারি আজ নাকি ওর যেতে দেরি হবে। কাজের চাপ বেশী। নতুন ডিলাররা প্রোডাক্ট দেখতে আসবে আর যেহেতু ও স্টোক হিসাব রাখে সেহেতু ওর থাকা জরুরি। তখন আমি মাজেদের কথা জিজ্ঞেস করলে জানতে পারি মাজেদ নাকি ওর কোন রিলেটিভের জন্য হাসপাতালে গিয়েছে। তারপর আমি সোহাগের কথা জানতে চাইলে বলে সোহাগ আছে তবে আজ ও সম্ভবত নিচের গোডাউনে কিছু একটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত আছে। আমি পুনরায় জানতে চাই ,ও ঠিক কখন যাবে? ও বলে ঠিক নাই,কখন বের হতে পারবে কারন ও নাকি বিকেল থেকে কয়েকবার জানার চেষ্টা করেছে নতুন ডিলারদের কথা,তারা ঠিক কখন আসবে কিন্তু কোনভাবেই জানতে পারেনি ।তবে ওকে নাকি বস নিশ্চিত করে বলেছে যত রাতই হোক ডিলাররা আসবে ইনশাআল্লাহ। তাই ও ঠিক বলতে পারছে না ঠিক কখন বের হতে পারবে। এইসব শোনার পর আমার আবারও ওর জন্য চিন্তা হতে লাগলো। আমি ওকে নিজের খেয়াল রাখতে বলে ফোন কেটে মাজেদকে কল দেই। মাজেদ ফোন তুললে ওর সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করে ওর রিলেটিভের কথা জেনে নেই তারপর ওকে জিজ্ঞেস করলাম ও এখন ঠিক কোথায়, আমার প্রশ্নের উত্তরে ও বললো,বাসার দিকে যাচ্ছে। তখনই আমি ওকে অনুরোধ করি ও যেন অফিসের সামনে আসে। অফিসের সামনে আসতে আসতে আমার প্রায় রাত ৯:৩০ বাজে।ঢাকার জ্যামের খবর তো জানেনই।
কথক:- অফিসার আনন্দের কথায় হালকা মাথা নাড়ে যার অর্থ হ্যা। আনন্দ কিছুক্ষণ থেমে শ্বাস ছেড়ে তারপর আবার ও বলতে লাগলো,
আনন্দ :- আমি ওকে যখন শেষবার ফোন দিয়েছিলাম তখন আমি প্রায় যাত্রা বাড়ির কাছাকাছি। অথচ এলিফ্যান্ট রোডে আসতে আসতে আমার প্রায় আড়াই থেকে 3 ঘন্টা লেগে গিয়েছিল। আমি এসে দেখি মাজেদ আগের থেকে চায়ের দোকানের সামনে বসে আছে। আমিও গিয়ে বেঞ্চে ওর পাশে বসে পড়ি। তারপর ওর সাথে কুশলাদির পর্ব শেষ করে আরো একবার ওর রিলেটিভের শারীরিক খবর ভালো মতো নিয়ে অন্যান্য বিষয়ে কথা বলতে থাকি। আমাদের কথার মধ্যেই ১০ টা বেজে যায়। আমি আমার হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে যখন কাটা ১০:৮ এ দেখি তখন ঝিলিকের নাম্বারে ফোন দেই। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয় ঝিলিকের ফোন বন্ধ যেটা আগে কোনদিন ঘটেনি।মানে আমি ঝিলিকের সাথে পরিচিত হওয়ার এই পাঁচ কিংবা সাড়ে পাঁচ মাসে কোনদিন ওর নাম্বার বন্ধ পাইনি। খাবার খেতে ভুলে যেত কিন্তু কোনদিন মোবাইল চার্জ দিতে ভুলে যেত না সুতরাং চার্জের অভাবে মোবাইল বন্ধ এটা ভাবা তো অসম্ভব বিষয় ছিল আমার কাছে । আমি বার কয়েক ফোন দেই , কিন্তু বারবার একই কথা, সুইচট অফ! আমার কেন জানি অস্থির লাগতে শুরু করলো! তুষার নামে একটি ছেলে আছে যে কিনা লন্ড্রী সেক্টরে কাজ করে। আমি ওকে সবসময় ঝিলিকের প্রতি নজর রাখতে বলেছিলাম যাতে কেউ ঝিলিককে বিরক্ত করতে না পারে। তখন ওর কথা মনে পড়তেই ওকে ফোন করলাম।ঝিলিকের কথা জিজ্ঞেস করলে জানায় আছে ,ও নাকি কিছু সময় আগেই দেখেছে তিন তলায়। আমি তখন কিছুটা রিল্যাক্স হলাম, ভাবলাম হয়তো কোন কারনে ফোন বন্ধ রেখেছে, কিন্তু কেন, এমন কি কারন থাকতে পারে? আমাকে অতিরিক্ত অস্থির হতে দেখে মাজেদ বোঝালো হয়তো ফোন ডিস্টার্ব,নয়তো ব্যস্ততার কারনে চার্জ দিতে ভুলে গেছে।আমিও তাই বিশ্বাস করে নিজের মনকে তাই বলেই শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম। আবারও কিছু সময় এভাবে দুজনে গল্প গুজব করে কাটিয়ে দিলাম তার মধ্যেই মাজেদের কাছে গ্রামে যাওয়ার কারন এবং সেখানে ঘটে যাওয়া সব কিছুই আলোচনা করলাম। অনেকটা সময় কেটে যায়। রাত তখন১০:৪৫ মিনিট,আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সময়টা । আমি আবারও ঝিলিকের নাম্বারে ফোন দেই, কিন্তু না সেই ফোন বন্ধ।আমি আবারও অস্থির হয়ে পড়লাম, চিন্তা হতে লাগলো । এইবার আমার সাথে মাজেদ ও অস্থির হয়ে পড়ছে। আমরা যে ভিতরে গিয়ে দেখবো তাও সম্ভব নয় কারণ অতো রাতে আমাদের ভিতরে ঢুকার অনুমতি দিবেনা। তাই ভিতরে গিয়ে খুঁজতে পারছি না। হঠাৎ করেই মনে পড়লো সোহাগের কথা। সোহাগ কে ফোন দিলাম। সোহাগ ফোন রিসিভ করলেই ওকে জিজ্ঞেস করি ঝিলিকের কথা। সোহাগ বললো অনেক আগে নাকি ও ঝিলিককে দেখেছে। আর ব্যস্ততার কারনে ঝিলিকের খোঁজ নেওয়া হয়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম ও কি চলে গেছে কিনা একটু দেখতো? ও বললো নাহ চলে গেলে অবশ্যই আমাকে বলে যেতো কারন আমি বারবার বলেছি আমি নিজেই ওকে দিয়ে আসবো কারন আজ ওর যেতে দেরি হবে তাই। কিন্তু ভাই কি হয়েছে, আপনি এত হাইপার হচ্ছেন কেন? আমাকে সোহাগ প্রশ্ন করলো। আমি উত্তরে বললাম ৯:৩০ থেকে অপেক্ষা করছি ওর বের হওয়ার জন্য কিন্তু সেই মেয়ে বের হচ্ছেই না উল্টো ফোনটা ও বন্ধ দেখাচ্ছে। আমার কথা শুনে সোহাগ বললো ভাই আপনি শান্ত হোন আমি দেখছি। আমাকে এই কথা বলেই ফোন কেটে দিলো। আমি আবারও ঘড়ির দিকে চোখ বুলালাম সময় রাত ১০:৫২ । ১১টা বাজতে কিছু মিনিট বাকী,বিল্ডিংয়ের তখন অধিকাংশ লাইট অফ হয়ে যাচ্ছিলো। এইবার মনটা আরো অস্থির হয়ে গেলো।কু-চিন্তা আস্তে লাগলো। সবসময় ডিলার/বায়ার আসলে সকালের দিকেই আসে নয়তো বা দুপুরে অথচ যখন ঝিলিকের সাথে কথা হয়েছিলো তখন অলরেডি সন্ধ্যা ৬:১৭ মিনিট। তখনও কোন বায়ার/ডিলার আসেনি। আর যদি এরপর এসেও থাকে তাহলে ঝিলিকের অনেক আগেই বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তুষারের বলা মতে কিছু সময় হয়তো ১-১:৩০ ঘন্টা হবে ও দেখার কথা বলছে। কিন্তু তার ও আগে আমি এখানে এসে অপেক্ষা করছি অথচ তারমধ্যে কাউকে বের হতে অথবা ঢুকতে দেখিনি। তার মানে ঝিলিক অফিসের ভেতরেই আছে। কিন্তু এই মেয়ে কি করছে এত সময় ধরে? এসব ভাবনার মাঝেই আমি অফিসের গেটের সামনে গিয়ে পকেট গেটে নক করি। আওয়াজ পেয়ে গেটের দায়িত্বরত দাড়োয়ান মাথা বের যখন আমাকে দেখে তখন হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
দাড়োয়ান:- আসসালামু আলাইকুম আনন্দ বাবা।এতো রাতে এখানে তুমি? তুমি না গ্রামে গিয়েছিলে,চলে আসছো?
কথক:- আগেই বলেছি আনন্দের ব্যবহারের কারণে কিংবা সহজাত বন্ধুসুলভ আচরণের কারনেই হোক সবাই ওকে খুব ভালোবাসে। সেই তালিকায় দাড়োয়ান চাচাও আছে। বলতে গেলে দাড়োয়ান চাচা আনন্দের বিশাল ভক্ত। অবশ্য এর কারন ও আছে ।আর সেটা হলো দাড়োয়ান চাচার মেয়ের বিয়ের সময় আনন্দ টাকা দিয়ে, শারীরিক মেহনত দিয়ে অনেক সাহায্য করেছিলো তাই উনি আনন্দের প্রতি খুবই দুর্বল। যাই হোক গল্পে ফিরি। আনন্দ চাচার আশ্চর্য হওয়ার কারন বুঝলেও তার কৌতুহলকে না দমিয়েই, সালামের উত্তর দিয়েই বললো,
আনন্দ:- চাচা ঝিলিক কি চলে গেছে?
কথক:- আনন্দ নিজেই ঝিলিক কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। এবং এটাও বলেছিলো যদি আনন্দের অনুপস্থিতিতে কখনো বাইরে থেকে কিছু আনার দরকার পরে তাহলে যেন চাচাকেই বলে। এবং চাচাকে ও বলে দিয়েছিলো ঝিলিকের প্রতি খেয়াল রাখতে।যেদিন গ্রামে গিয়েছিল সেদিনও বলে গিয়েছিলো ঝিলিকের খেয়াল রাখাটা কথা। তাই দাড়োয়ান চাচা খুব ভালো করেই ঝিলিককে চিনে।উনি ঝিলিক কে খুব ভালোবাসে, নিজের মেয়ে মনে করে মাঝেমধ্যেই এটা ওটা কিনে দিতো খাওয়ার জন্য, ঝিলিক নিতে না চাইলেও ওনার স্নেহের টানে নিতে বাধ্য হতো। আর ঝিলিকের প্রতি আনন্দের যত্নই বুঝিয়ে দিতো কতটা ভালোবাসে ছেলেটা মেয়েটাকে।তাই উনিও ঝিলিকের খুব খেয়াল রাখতো। যাই হোক গল্পে আসি।
পর্ব ০৮
কথক:- দাড়োয়ান চাচা কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বললেন নাহ।
(অনেকেই বলতে পারেন দাড়োয়ান এত রাত অবধি কি করে গার্মেন্টসে,উনি মানে দাড়োয়ান চাচা গার্মেন্টসে শিফটে চাকরি করেন।এক সপ্তাহ রাতে আর এক সপ্তাহ দিনে।আর উনি গার্মেন্টসের বিল্ডিং এর নিচে কার পার্কিং এর জায়গায় ছোট একটা রুম আছে সেখানেই থাকে। মোট চার জন চাকরি করেন দাড়োয়ানের পোস্টে। তো নিয়ম অনুযায়ী আজকে চাচার রাতে ডিউটি তাই চাচা আজও রাতের দায়িত্বে আছেন। আশাকরি সবাই বুঝছেন।)
দাড়োয়ান চাচা খুব ভালো করেই নিশ্চিত হয়ে তারপর আবারও জোর গলায় বললেন ,
দাড়োয়ান চাচা:- নাহ আজ ঝিলিক এখনো ভেতর থেকে বের হয়নি। কারন ও তো সবসময়ই বের হওয়ার সময় আমি থাকলে অবশ্যই ভালোমন্দ খবর নিয়ে তারপর আমাকে বিদায় জানিয়ে যায়। আজ তো আমি সন্ধ্যার পর থেকে দরজা থেকে নড়িনি। সুতরাং দেখা না হওয়ার কোন কারনই নেই। আমার তো মনে হয় ও ভিতরেই আছে। কিন্তু এত রাত অবধি ওর কাজটা কি ভিতরে?
কথক:- চাঁচা চিন্তিত হয়ে , আনন্দের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন।
আনন্দ:- হঠাৎ করেই একটা প্রশ্ন জেগে উঠলো আনন্দের মনে । আনন্দ চাচাকে জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- আচ্ছা চাচা আজকে কি কোন ডিলার এসেছিলো অফিসে। মানে কোন বায়ার অথবা ডিলার মানে আপনি তো গাড়ী অথবা মানুষ দেখলেই বুঝতে পারেন!
কথক:- দাড়োয়ান চাচা বললেন,
দাড়োয়ান চাচা:- নাহ! আজ তো কেউই আসেনি।
কথক:- আনন্দ এইবার নিশ্চিত কিছু একটা হচ্ছে বা হয়ে গেছে যেটা খুবই খারাপ। আনন্দ দাড়োয়ানের সাথে কথা শেষ করে, আবারও গেটের থেকে কিছুটা দুরে এসে মাজেদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।ও প্রচুর ঘামছে। হঠাৎ করেই হাত পা কাঁপছে, প্রচুর পরিমাণে কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা হাতেই পকেট থেকে ফোনটা বের করে ঝিলিকের নাম্বারে আবারও কল করে। অসম্ভব রকমের অসহায় একটা মুখশ্রী নিয়ে মাজেদের দিকে তাকিয়ে বলে,এখনো বন্ধ বলছে। মাজেদ এতসময় ধরে আনন্দের কার্যক্রম দেখছিল আর মনে মনে ভাবছে ,যদি কোনদিন ঝিলিকের কিছু হয় তাহলে আনন্দ পাগল হয়ে যাবে। ওদের কথার মাঝেই সোহাগের কল আসে আনন্দের ফোনে। আনন্দ কল রিসিভ করেই বললো,
আনন্দ:- ঝিলিক কি ঠিক আছে?
কথক:- সোহাগ আনন্দের কথার উত্তরে কি বলবে বুঝতে পারছে না কারন ও তো ঝিলিককে খুঁজেই পায়নি। তাহলে ঝিলিক ঠিক আছে কিনা কিভাবে বলবে। আনন্দ সোহাগের নিরবতা নিতে পারছে না তাই একটু রাগের সুরেই বললো,
আনন্দ:- একটা ছোট প্রশ্নের উত্তর দিতে এত সময় লাগে সোহাগ? ঝিলিক কই ? ওর কাছে তোমার ফোনটা দাও বাকীটা আমি ওর কাছ থেকেই শুনে নিবো।
সোহাগ:- ঝিলিককে কোথাও খুঁজে পাইনি ভাই।
কথক:- সোহাগের এই কথাটা আনন্দের
চিন্তা বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিলো। আনন্দ কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- মা--মমাআ --মানেএ?
কথক:- সোহাগ ও কন্দনরত গলায় বলতে লাগলো,
সোহাগ:- পুরো বিল্ডিং খুঁজেছি ভাই কোথাও নেই। ছাদ তো তালা মারা। আমি নিচের গোডাউনে ছিলাম,সেখানে থাকলে অবশ্যই আমরা চোখে পড়তো , তবুও আমি খুঁজেছি কিন্তু সেখানেও নেই। প্রতিটি ফ্লোরই খুঁজছি কোথাও নেই। ছয় তলা,সাত তলা সম্পূর্ণ অন্ধকার, সেখানেও খুঁজেছি, নাই! বাকী ফ্লোরগুলোতে যারা আছে তাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করেছি কেউ বলতে পারলো না। ভাই ঝিলিক তো একা যাওয়ার কথা না। ওকে বারবার বলেছি আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো, তারপরও ও একা কিভাবে চলে যেতে পারে? কিন্তু একা গেলেও তো বলে যাবে। ভাই আমার কিছু একটা ঘাপলা মনে হচ্ছে!
কথক:- আনন্দ নিজেকে সামলে বললো,
আনন্দ:- ও কোথাও যায়নি। ও এখনো অফিসের ভেতরেই আছে।
কথক:- সোহাগ আনন্দের কথায় কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বলে,
সোহাগ:- মানে?
আনন্দ:- মানেটা স্পষ্ট। ঝিলিক এখনো বিল্ডিংয়ের বাইরে আসেনি। ভেতরেই আছে সেটা যেখানেই থাকুক আর যেভাবেই থাকুক।আছে তো এখনো ভেতরেই।
সোহাগ:- কিন্তু ভাই আমি পুরো বিল্ডিং তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কোথাও পেলাম না তাহলে ও বিল্ডিংয়ের ভিতরে আছে এটা কিভাবে সম্ভব?
কথক:- আনন্দ পুরো আত্ন-বিশ্বাস নিয়ে বললো,
আনন্দ:- কিভাবে সম্ভব জানি না তবে আছে ও ভিতরেই কারন ওকে বের হতে দাড়োয়ান চাচা দেখেনি যেটা অসম্ভব বিষয়।কেউ অফিস থেকে বের হবে আর তাকে চেক করা ছাড়া বের হতে দেওয়া হবে এটাতো অসম্ভব তাই নাহ? আর সবচেয়ে বড় কথা আমি ৯:৩০ থেকে অফিসের মেইন গেইটের সামনে বসে আছি ,ও বের হলে সবার আগে আমাকেই দেখতে পেতো ।আর আমাকে দেখার পর কথা না বলেই চলে যাবে এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আমি কিভাবে ওকে বের হতে দেখবো না! কারন সেই কখন থেকে ওর জন্য অপেক্ষা করছি।
কথক:- সোহাগ ভাবতে লাগলো যে আনন্দের কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু তাহলে ঝিলিক? ঝিলিক কি সত্যিই ভিতরে আছে? কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? আমিতো পুরো বিল্ডিংই খুঁজলাম কোথাও তো পেলাম না? সোহাগ নিজের ভাবনার মাঝেই আনন্দের উদ্দেশ্যে বলল,
সোহাগ:- ভাই আমি আরো একবার ভালো করে খুঁজে দেখি।আপনি চিন্তা কইরেন না।
কথক:- আনন্দ ফোন কেটে নির্বাক চাহনি দিয়ে অফিসের বিল্ডিংয়ের দিকে চেয়ে রইলো। মাজেদ পিছন থেকে এসে আনন্দের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
মাজেদ:- ঝিলিককে পাওয়া যায় নাই?
কথক:- আনন্দ কোন কথা বললো না।হেটে আবারও গেইটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো তাই দেখে মাজেদও পিছন পিছন যেতে থাকে আর প্রশ্ন করলো ,
মাজেদ:- কি বলছে সোহাগ? ঝিলিক কই?
কথক:- আনন্দ গেইটে গিয়ে জোড়ে নক করতে লাগলো, ভিতর থেকে দাড়োয়ান পকেট গেট দিয়ে মাথা বের করে আবারও আনন্দ ও মাজেদ কে দেখে জানতে চাইলো ঝিলিককে এখনো পায়নি? আনন্দ তুমুল গতিতে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বোঝায় না। তারপর তাড়া দিয়ে দাড়োয়ান চাচাকে গেইট খুলতে বলে, ও ভেতরে যাবে বলে জানায়।দাড়োয়ান প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারপর বলে না। ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) এত রাতে সে কিছুতেই দরজা খুলে কাউকে ভেতরে ঢুকার অনুমতি দিতে পারবে না সে যেই হোক। আনন্দ কিছু বলার আগেই মাজেদ বললো,
মাজেদ:- চাচা ঝিলিক ভিতরে আছে।আমরা গিয়ে ওকে খুজে নিয়েই চলে আসবো।
দাড়োয়ান চাচা:- দেখো তোমাদের কথা আমি বুঝতে পারলাম কিন্তু আমি কি করবো বলো? আমার তো এত রাতে কাউকে অফিসের ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার অনুমতি নেই। যদি তোমাদের ঢুকতে দেই আর ক্ষুনাক্ষরেও এই কথা বসের কানে যায় তাহলে আমার চাকরিটা তো যাবেই তার সাথে না জানি কতটা বেহুদা সমস্যায় পড়তে হয়?
আনন্দ:- একটা মেয়ের জীবনের প্রশ্ন আর এখন আপনি আপনার চাকরি নিয়ে পড়ে আছেন? সিরিয়াসলি চাচা! এই না আপনি ঝিলিক কে নিজের মেয়ে মনে করেন? আর এখন?
কথক:- চাচা আনন্দের অবস্থা আর প্রতিক্রিয়া দেখে নিশ্চুপ হয়ে যায় । এরকম কিছুক্ষণ দাড়োয়ান চাচার সাথে জোরাজোরি ও তর্ক করে আনন্দ ও মাজেদ ভিতরে চলে যায়।এর মধ্যেই সোহাগ পুরো বিল্ডিং আরো একবার ঘুরে আসে কিন্তু কোথাও ঝিলিকের "ঝ" ও খুঁজে পায় না। আনন্দ গেইট দিয়ে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে ঝিলিকের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে। আনন্দের গলার আওয়াজ আর চিৎকার শুনে যেই অল্প সংখ্যক কর্মীরা ছিলো তারা সবাই আনন্দের দিকে তাকায় আর বোঝার চেষ্টা করে আনন্দ এত রাতে এখানে কি করছে? আর এভাবেই কেন চিৎকার করছে। খুঁজতে খুঁজতে তৃতীয় তলায় পৌঁছালে সোহাগের সাথে দেখা হয়ে যায়। সোহাগ জানায় সে অলরেডি দুইবার পুরো বিল্ডিং খুঁজে দেখেছে কোথাও ঝিলিক নেই। আনন্দ সোহাগের কথায় পাত্তা না দিয়ে নিজেই উপরে গিয়ে একদম ছাদ অবধি খুঁজে এসেছে। আনন্দের কাছে ছাদের ডুপ্লিকেট চাবি ছিল। বিল্ডিংয়ের চিফ ইনচার্জ হওয়ার কারনে সব ফ্লোরের সব ধরনের তালার একটা করে চাবি ওর কাছে থাকে যেটা ও নিজের লকারেই রাখে। তাই ও ছাদ খুলে পুরো ছাদসহ আশেপাশের সবকিছুই দেখে হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই দৌড়ে ছয় তালায় যায়। সেখানে স্টোর রুমের পাশে ঝিলিকের জন্য কেবিনের মতো অল্প একটা জায়গা আছে যেখানে বসে ঝিলিক কাজ করে। সেখানে গিয়ে দেখে ঝিলিকের বসার টেবিলের নিচে কাঁধের ব্যাগটা পড়ে আছে যা দেখে আরো নিশ্চিত হয় ওদের সন্দেহ। ব্যাগ যেহেতু আছে সেহেতু অবশ্যই ঝিলিক বিল্ডিং এর ভিতরেই কোথাও আছে,আর এমনিতে নয় কেউ আটকে রেখেছে। কিন্তু কোথায়? আনন্দ যখন নিচে চিৎকার করছিলো তখন ওর সাথে আরো দু-তিনজন ছেলে মিলিত হয় ঝিলিককে খোঁজার জন্য তাদের মধ্যে একজন বললো, "ভাই আমরা কি কোন জায়গা মিস করেছি ,এমন কোন জায়গা যেখানে সন্দেহ করা যায় না বা ভাবনায় আসে না?" আনন্দ ও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ভেবে তারপর বলে,
#গল্প দিতে দেরি হচ্ছে অনেক বুঝতে পেরেছি তার জন্য দুঃখিত আসলেই দৈনন্দিন জীবনে অনেক বেশিই ব্যস্ত তবে ইনশাআল্লাহ এখন থেকে নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করবো কারন এটা আমার ভালো থাকার অন্যতম উপাদান 🥰🥰
আনন্দ:- উপরে সব অফিসারের কেবিন!
কথক:- আনন্দের কথায় সবাই প্রথমে কিছুটা চমকে উঠে, মাজেদ বলে,
মাজেদ:- মানে!
আনন্দ:- হতেও তো পারে সেখানেই কোন কেবিনে আটকে আছে!
সোহাগ:- কিন্তু ভাই সেইটা কিভাবে সম্ভব?
আনন্দ:- অসম্ভব কি?
পর্ব ০৯
কথক:- বাকী ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বলে,
আমি শুনেছিলাম এই কোম্পানিতে আগে ও নাকি তিনটা মেয়ে নিখোঁজ ছিলো! যাদের কোন খবর পাওয়া যায়নি! ছেলেটার কথায় মাজেদ আনন্দের দিকে ভীতি দৃষ্টিতে তাকায় ।আনন্দ এই কথার উপর কোন প্রতিক্রিয়া না দিয়ে একাই হাটা শুরু করে, মাজেদ পিছন থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছো। আনন্দ পিছু না ফিরেই বলে,
আনন্দ:- উপরে। প্রতিটি কেবিন সার্চ করবো।
মাজেদ:- কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে?
কথক:- আনন্দ কোন উত্তর না দিয়ে চলে যায়।ওর কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সোহাগ মাজেদের উদ্দেশ্যে বলে,
সোহাগ:- ভাই চলেন,একা ছাড়া ঠিক হবে না। যা হবে পরে দেখা যাবে।
কথক:- সোহাগ, মাজেদদের পিছু পিছু ঐ ছেলেরাও হাটা শুরু করে। ছয় তলার সিড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পিছনে মানুষের পায়ের (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) শব্দ পেয়ে আনন্দ পিছু ঘুরে মাজেদদের দেখে দাঁড়িয়ে পরে। জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- তোমরা কোথায় যাচ্ছো?
মাজেদ:- আমরাও সাথে আসি।
আনন্দ:- না। এত রাতে সিনিয়রদের কেবিন সার্চ করার জন্য আমার উপর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। সুতরাং আমি চাই না আপনারা আমার সাথে এই ঝামেলায় জড়ান।
মাজেদ:- মানে কি আনন্দ? ঝিলিক কি শুধু তোমার জন্যই আপনজন? আমাদের কিছুই না?
আনন্দ:- মাজেদ ভাই এখন কে আপন কে পর সেটা নিয়ে তর্ক করার সময় না। আমি যা বলছি তা শোনেন প্লিজ?
মাজেদ:- না। ঝিলিক কেমন আছে তা জানিনা তবে বিপদ নিশ্চিত জেনে তোমাকে একা ছাড়তে পারবো না।আর তাছাড়া ঝিলিক আমাদের সবারই বোনের মতো। সুতরাং ওর প্রতি আমাদের ও কিছু দায়িত্ব আছে।
আনন্দ:- কিন্তু?
সোহাগ:- ভাই প্লিজ,এখন কিন্তু পারন্তু করে সময় নষ্ট কইরেন না।
কথক:- আনন্দ আর কোন কথা না বলে উপরে উঠতে লাগল, কিছু একটা ভেবে পিছনে ঘুরে সবার উদ্দেশ্যে বলে,
আনন্দ:- হিশ্ ! আসতে ,যেন পায়ের শব্দ না আসে।
কথক: আনন্দের কথায় সবাই পায়ের গতি কমিয়ে আস্তে করে হাঁটতে শুরু করে যাতে চলার সময় জুতার শব্দ না আসে। সাত তলায় উঠে ম্যানেজারের কেবিন থেকে শুরু করে বাকী সব কর্মকর্তাদের কেবিন খুঁজতে লাগে কিন্তু কোথাও না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে নিলেই আনন্দের মনে পড়ে বসের কেবিনের কথা। ও সবাইকে দাড়াতে বলে, নিজেই বসের কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে ওর কেন জানি মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ আছে।ও খুব মনোযোগ দিয়ে কান পেতে থাকে দরজায়, হঠাৎ চোখ দুটো নিচের দিকে নামাতেই মনে হলো দরজার হাল্কা ফাঁকা জায়গা দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে যার অর্থ ভেতরে লাইট জ্বলছে। মাজেদ পিছন থেকে আনন্দের কাধে হাত রাখতেই আনন্দ ইশারায় চুপ থাকতে বলে, চোখের ইশারায় নিচের দিকে তাকাতে বলে, মাজেদ আনন্দের কথা অনুযায়ী নিচে তাকাতেই ওর চোখ ও বড় হয়ে যায়।কারন বস সবসময় পাঁচটার মধ্যেই বের হয়ে যায় আর কাজের চাপ বেশী থাকলে বড়জোর আটটা অবধি অথচ আজ সেখানে প্রায় বারোটা বাজে অথচ এখনো বসের কেবিনের লাইট জ্বলে ।তার মানে অবশ্যই ভেতরে কেউ আছে কিন্তু এত রাতে বসের কেবিনে কে থাকতে পারে? এইসব ভাবনার মাঝেই আনন্দ কারো কথা শুনতে পায় ভেতর থেকে। ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) মেয়েলি কন্ঠ! আনন্দ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কন্ঠস্বর নিচু করে খুব ধীরে বলে,
আনন্দ:- ভেতরে কেউ আছে।
মাজেদ:- তুমি নিশ্চিত?
আনন্দ:- হুম।
মাজেদ:- তাহলে দরজায় নক করো
কথক:- আনন্দ খুব জোরে দরজায় আঘাত করতে লাগে । কিন্তু ভেতর থেকে কারো কোন শব্দ আসছে না। আনন্দ খুব মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে কিন্তু ভেতর থেকে কোন শব্দই আসছে না। মাজেদ বললো,
মাজেদ:- হয়তো ভেতরে কেউ নেই। পিয়ন মনের ভুলে লাইট অফ করতে ভুলে গেছে।
আনন্দ:- না । ভেতরে লোক আছে আর মেয়েও আছে।
কথক:- আনন্দের এহেন কথায় সবাই চমকে আনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবার মুখ থেকেই অজান্তেই বের হয়ে আসে, 'কিহ"! আনন্দ চোখ গরম করে ঠোঁটে আঙুল চেপে বোঝায় 'চুপ" । সবাই চুপ হয়ে যায়। আনন্দ আবারও দরজায় নক করে কিন্তু এবার ও নো রেসপন্স। তাই আনন্দ এবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে সবাই কে বলে চলো চলে যাই ভেতরে কেউ নাই। সবাই আনন্দের কথায় কপালে ভাঁজ ফেলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ।কেউ কিছু বলার আগেই আনন্দ চোখের ইশারায় কিছু একটা বুঝিয়ে মাথা দুলিয়ে বলে হ্যা চলো। সবাই পুরোপুরি না বুঝলেও আনন্দ কোন একটি বুদ্ধি যে এটেছে সেটা আন্দাজ করতে পেরেই চলে যায়। আনন্দ ও ওদের পিছু পিছু গিয়ে সিড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে, এখানেই দাঁড়াতে তবে কিছুটা আড়াল হয়ে থাকতে।এটা বলে নিজেও আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে পরে। অনেকটা সময় এভাবেই কেটে গেলো কিন্তু না কেউ দরজা খুললো আর না ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ আসলো। এবার সবাই নিশ্চিত হলো যে বসের কেবিনে কেউ নেই। কিন্তু আনন্দ হলো না।ও এখনো আত্ন-বিশ্বাস নিয়ে বললো,
আনন্দ:- ভেতরে লোক আছে।
পর্ব ১০
কথক:- এই কথা বলেই আনন্দ খুব দ্রুত গতিতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দেয়, এবারও দরজার ভেতর থেকে না কোন সাড়াশব্দ আসছে আর না দরজা কেউ খুলছে। আনন্দ এইবার দরজা ভেঙে ফেলার নিয়ত করে শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে দরজায় লাথি দিতে থাকে।ওর এমন পরিস্থিতি দেখে মাজেদ ও সোহাগও ছুটে আসে। আর কোনরকম কথা না বলে ওরাও আনন্দের সাথে সমান তালে সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় আঘাত করে এবং এক পর্যায়ে দরজা খুলে যায়। দরজা খুলতেই তিনজন দরজার সামনে রুমের ভেতর মুখ থুবড়ে নিচে পড়ে যায়। নিজেদের সামলে উঠে দাড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখে কেউ নাই। ওদের দরজা ভেঙে ফেলার পর বাইরে থাকা ছেলেগুলো ও রুমের সামনে এসে দাড়ায়। আনন্দ খুব ভালো করে চারদিকে তাকায়, কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু তারপরও কেন জানি মনে হচ্ছে কেউ তো আছে ভেতরে। মাজেদ বলে,
মাজেদ:- কেউ- ই তো নেই। শুধু শুধু এত বড় একটা রিস্ক নিলাম আমরা।
সোহাগ:- নাহ ভাই । শুধু শুধু রিস্ক না!
কথক:- সোহাগের কথায় আনন্দ ও মাজেদ ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, সোহাগ বলে,
সোহাগ:- ঐদিকে দেখেন,ওটা কি?
কথক :- সোহাগ আশ্চর্য হয়ে একটু জোরেই বললো কথাটি। ওর দেখানো দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে যায় সবাই,সেখানে লাগানো দেয়ালের পর্দাটা একটু সড়ে আছে যেখান দিয়ে একটা দরজার মতো কিছু দেখা যাচ্ছে । আনন্দ হেঁটে গিয়ে চেয়ারের পিছনের পর্দাটা পুরো সরাতেই সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। এখানে একটা দরজা। বোঝাই যাচ্ছে এটার ভেতরে কোন রুম আছে। সোহাগ এগিয়ে এসে আনন্দের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
সোহাগ:- ভাই এটা তো মনে হচ্ছে কোন রুমে যাওয়ার দরজা। মানে এটা কিভাবে সম্ভব?
কথক:- আনন্দ কোন রুপ উত্তর না দিয়ে দরজায় জোরে করাঘাত করতে লাগলো আর বলতে থাকলো,
আনন্দ:- দরজা খোলো,না হলে আমি ভেঙে ফেলবো! যেই আছো দরজা খোলো।
কথক:- নাহ এবার ও কেউ দরজা খুললো না,ভেতর থেকে কোনরকম সাড়াশব্দ নেই।তাই আনন্দ সোহাগ কে বললো,
আনন্দ:- সবাই মিলে এই জিনিস গুলো সড়াও তো! প্লিজ!
কথক:- তারপর সবাই মিলে টেবিল সহ দরজার পাশে মুলত দরজাটাকে কভার দেওয়ার জন্যই বেশকিছু আসবাবপত্র রেখে দেওয়া হয়েছে।যার কিছুটা সরানো হয়েছে ভেতরে যারা ঢুকেছে তাদের ভেতরে ঢোকার সুবিধার্থে। আনন্দ সেগুলোকেই সড়ানোর জন্য অনুরোধ করে।কারন দরজাটা ভাঙ্গার জন্য কিছুটা জায়গা দরকার তাই । (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) তারপর কিছু জিনিস দরজার সামনে থেকে সরিয়ে আনন্দ আর সোহাগ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বারবার দরজায় আঘাত করে কিন্তু দরজাটা ভাঙ্গে না কারন দরজার মাঝের অংশ কাঠের শৈল্পিক কৌশল দিয়ে তৈরি হলেও পাশের স্টাক্চার লোহা দিয়ে তৈরি তাই এত ধাক্কা দেওয়ার পরেও ভাঙ্গছেনা। এটা দেখে মাজেদ আরো দুজন ছেলেকে সাথে নিয়ে,মোট পাঁচজন মিলে ননস্টপ দরজায় শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করতে থাকে আর এক পর্যায়ে দরজার নবটা দেওয়াল থেকে খসে যায় এতে দরজাও খুলে যায়। দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে আনন্দ ভেতরে ঢুকে আর ভেতরে ঢুকতেই আনন্দের পা থমকে যায়। ভিতরে বিশাল রুম, একদম গোছানো পরিপাটি করে রাখা। মনে হচ্ছে এখানে নিয়মিত কেউ থাকে। কিন্তু পরক্ষনেই আনন্দের মুখ থমথমে হয়ে যায়। বেডে বসের সহকারীর সাথে একটি মেয়েকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে। আনন্দ নাক মুখ খিচে চোখ বন্ধ করে ফেলে। মেয়েটি হুড়মুড়িয়ে উঠে নিজেকে চাদরে আবৃত করে নেয় ,আর সহকারী লোকটা নিজের কাপড় পড়তে থাকে।আর আনন্দের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগে,
(সহকারী) তামীম :- আ.আ আপনি এখানে?
আনন্দ:- কি হচ্ছে এইসব?
(সহকারী) তামীম:- না মানে ঐ আসলে একটু, আধটু।আসলে বুঝো না? তুমি তো এডাল্ট ,সবই বুঝো!
আনন্দ:- আনন্দ কথাটি অনেকটা ক্ষোভ আর ঘৃনা নিয়ে বললেও তামীম বেহায়া নির্লজ্জের মতো করেই কথাটি বলে। আনন্দ চোখ মুখ শক্ত করে বললো,
আনন্দ:- আমি কিছু বুঝি না আর বুঝতেও চাই না শুধু জানতে চাই ঝিলিক কোথায়?
কথক:- আনন্দের কথায় তামীম অনেকটা ভরকে যায়, আমতা আমতা করে বলে,
তামীম:- ঝি ঝিলিক মানে? ঝিলিক কোথায় তা আমি কি করে বলবো? আশ্চর্য তো এ --এই কথা তুমি আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো?
কথক:- আনন্দ কিছু বলার আগেই মাজেদ সোহাগকে ঠেলে রুমের ভেতরে ঢুকে পুরো রুমটা ভালো করে দেখতে লাগে,তামীমের সাথে থাকা মেয়েটি তখন চাদর পেঁচিয়ে নিজেকে আগাগোড়া আবৃত করে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। মাজেদ সেদিকে একবার তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। বাকী তিনটা ছেলের মধ্যে থেকে একজন এসে সোহাগ কে উদ্দেশ্য করে (লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) বলে,"ভাই যেই মেয়েটা ছিল ঐটাকে বের করে আনেন তারপর দুইটাকে একসাথে ধরেন আমার মনে হইতেছে এরাই জানে ঝিলিক আপুর কথা।" ওর কথায় আনন্দ চোয়াল শক্ত করে তামীমের কলার ধরে আর সোহাগ ছেলেটাকে ইশারায় বলে দরজায় গিয়ে নক করতে আর মেয়েটাকে বলতে পোশাক পরে বের হয়ে আসতে। ছেলেটা সেদিকে এগিয়ে যেতেই মাজেদ জোরে চিৎকার করে বলে উঠে ,
মাজেদ:- আনন্দ!
কথক:- আনন্দ মাজেদ হঠাৎ এমন করে ডাকায় ওর দিকে তাকাতেই মাজেদ একটি নুপুর তুলে দেখায়। আনন্দ হাতে নিয়ে দেখে এটা ঐ নুপুরের একটা যেটা ও ঝিলিককে যাওয়ার আগে দিয়েছিলো। যেহেতু নুপুরের একটা অংশ এখানে সেহেতু ঝিলিক ও এখানে তারমানে ঝিলিক কোথায় আছে তা ওরা জানে।এই কথা মনে পড়তেই আনন্দ তামীমের কাছে গিয়ে ওর কলার শক্ত করে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- ঝিলিক কোথায়,কি করেছিস ওর সাথে?
কথক:- বাকী দুটো ছেলেও ওর দিকে এগিয়ে এসে তামীম কে ঘিরে ধরে, আর একটি ছেলে বাথরুমের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকে আর মেয়েটাকে বের হয়ে আসতে বলে। কিন্ত মেয়েটা দরজা খুলে না । এদিকে আনন্দ বারবার তামীমের কাছে জানতে চাইছে ঝিলিক কোথায়,সে বলছে না তাই পরপর তিনটা ঘুষি মারে তামীমের মুখে,মেয়েটাও দরজা না খোলায় যখনই ছেলেটা দরজায় লাথি মারতে যায় , তখনই মেয়েটা সেই চাদর পেঁচানো অবস্থায় বের হয়ে আসে আর তা দেখে ছেলেটা লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে।যদিও মেয়েটাকে দেখে সবারই ঘৃনা হচ্ছে তবুও নিজেদের বিবেকের তাড়নায় আর লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল। তামীমের অবস্থা তিন ঘুষিতেই খারাপ তবুও মুখ খুলছে না দেখে আনন্দ ওকে নিচে ফেলে মেয়েটার দিকে তাকাতেই ওর চোখ বড় বড় হয়ে যায় ,মুখ দিয়ে আপনাআপনিই বের হয়ে আসে,
আনন্দ:- আয়েশা!
কথক:- "আয়েশা" শব্দ শুনতেই সবাই মেয়েটার দিকে তাকায়, এবার অনেক গুলো কন্ঠেই বেজে উঠলো "আয়েশা" নামক ধ্বনিটি! আয়েশা এবার চাদর দিয়ে নিজেকে আরো গভীর ভাবে মুড়িয়ে নেয়। সোহাগ বলে,
সোহাগ:- ছিহ আয়েশা আপা শেষ অবধি আপনি!
আমার তো ভাবতেই খারাপ লাগছে যে কোনদিন আপনাকে এই অবস্থায় দেখতে পাবো।
কথক:- সোহাগের কথায় স্পষ্ট অবিশ্বাস প্রকাশ পাচ্ছে। শুধু সোহাগই না, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেউই এই মাত্র দেখা বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারছে না কারন সবাই আয়েশাকে ভালো, নরম ভদ্র আর শালীন মেয়ে বলেই জানে। সবসময় নামাজ ঠিকঠাক মতো পড়তো। হিজাবের সহিত সারাদিন কাজ করতো, সবাইকে ভালো হাদীস দ্বারা উপদেশ দিতো সুতরাং এইরকম চরিত্রের পিছনে যে একটা জঘন্য মানুষ আছে সেটা কারো না বিশ্বাস করারই কথা। কিছুক্ষণের জন্য সবাই যেন ঝিলিকের কথা ভুলে গিয়ে আয়েশার সাথে তামীমের মুহূর্ত আগে ঘটে যাওয়া বিষয়ে ভাবতে লাগলো। এরমধ্যেই তামীম নেকা কান্না শুরু করে সবাইকে অনুরোধ করে যাতে ওদের এই অবস্থার কথা কাউকে না বলে। তামীমের গলার স্বরে আনন্দের হুশ আসে।ও আবারও তামীমের দিকে তেড়ে গিয়ে গলা টিপে ধরে বলে,
আনন্দ:- কাকে কি বলবো সেটা পরের কথা । আগে তুই বল ঝিলিক কোথায়?
কথক:- আনন্দ এতই জোরে ধরছে যে তামীম শ্বাস নিতে পারে না।তাই হাত দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগে। মাজেদ গিয়ে ছাড়িয়ে দিয়ে আনন্দ কে শান্ত হতে বলে। এরমধ্যেই একটি ছেলে আয়েশার কাছে গিয়ে ধমকের সুরে বলে, "এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন,যান গিয়ে কাপড় পড়ে আসেন।নাকি এখনো বাকি আছে?" আয়েশা কোন কথা না বলে মাথা নুইয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে আর তা দেখে সোহাগ ক্ষেপে গিয়ে বলে,
সোহাগ:- কি সমস্যা? এখন লজ্জা করছে, আগে করেনি?
কথক:- আয়েশা এবার ও চুপ! মাজেদ গিয়ে একটি ছেলেকে বলে,
মাজেদ:- নিচে গিয়ে কিছু ছেলেমেয়ে ডেকে নিয়ে আসো আর হ্যা অবশ্যই আসার সময় পুলিশকে ফোন দিয়ে আসবে। এবার যা করার পুলিশ এসেই করবে।
পর্ব ১১
কথক:- মাজেদের কথা শুনে ছেলেটি চলে যায় নিচে, পুলিশের কথা শুনে তামীম আমতা আমতা করে আনন্দের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে যায় এর মধ্যেই মাজেদ আবারও ধমকে আয়েশাকে কাপড় পড়ে নিতে বলে। হঠাৎ কিছু একটার শব্দে সবাই চমকে যায়। এদিক ওদিক তাকিতুকি করতে থাকে। রুমের একপাশে মিনি বারের মতো একটা জায়গা করা,বেশ কিছু জিনিস পড়ে আছে যা দেখলে বোঝা যায় এখানে কেউ মাদক সেবন করেছে। ( নোট: আমি মাদক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানিনা তাই লিখতে পারলাম না সুতরাং Sorry সবাই নিজ দায়িত্বে বুঝে নিবেন যার যেটা ইচ্ছা করে সেটার নাম) আরও কিছু জিনিস দেখলো যেটা দেখে ওরা আরো আশ্চর্য হয় কারন এখানে তামীম আর আয়েশা বাদে আরো কেউ আছে অথবা ছিলো। তাহলে সে বা তারা এখন কোথায়? হঠাৎই শব্দটা আবারও শুনতে পায়। শব্দের কারনে তামীম আর আয়েশা একে অপরের দিকে ভয়ার্ত ভাবে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারায় বলে। ওদের ইশারায় কথা বলতে দেখে আনন্দ আবারও ক্ষেপে গিয়ে উড়াধুরা মারতে লাগে আর জিজ্ঞেস করে, ঝিলিক কোথায়? কিন্তু এই তামীম এতটাই ঘাড়ত্যাড়া যে কিছুতেই মুখ খুলে না। এদিকে মাজেদ আয়েশাকে জিজ্ঞেস করছে সেও সেইম। বারবার বলছে, "জানি না" । সোহাগ আর দুটো ছেলে শব্দের স্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ মাজেদের মনে হলো বাথরুমে কেউ আছে। ও দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকতে যাবে এর মধ্যেই শব্দটি আবারও শুনতে পায়। সোহাগ কিছু একটা মনে পড়তেই খাটের নিচে উঁকি দিয়ে চমকে যায়।ও মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে একটা চাদর দিয়ে প্যাঁচানো কিছু একটা দেখতে পায়। মাজেদ বাথরুমের ভেতরে গিয়েই স্যার বলেই মৃদু চিৎকার করে উঠে। মাজেদের গলায় স্যার শব্দ শুনতেই আনন্দ তামীম কে মারা বাদ দিয়ে বাথরুমের দিকে এগিয়ে যায়। এই সুযোগে তামীম পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু অতিরিক্ত মার খাওয়ায় আর শরীরে জোর না পাওয়ায় হাঁটতে কষ্ট হয় তবুও কষ্ট করে দরজার সামনে যেতেই প্রায় দশ বারো জন ছেলেরা এসে আটকে দেয়। মাজেদকে দেখে( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) মেহতাব মজুমদারের যেন আত্না উড়ে যাওয়ার উপক্রম। এদিকে খাটের নিচ থেকে প্যাচানো চাদরটি বের করে সোহাগ যেই না বাধা মুখটি খুলতে যাবে ওমনি আনন্দ এসে সামনে বসে পড়ে, আনন্দকে দেখে সোহাগ অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে একটাই দোয়া করছে,যে আল্লাহ যা ভাবছি তা যেন কিছুতেই না হয়! আনন্দ কাঁপা কাঁপা হাতে চাদরের বাঁধা মুখটা খুলে ফেলে আর তখনই যেন ওর হৃদস্পন্দন থেমে গেলো! ওর গলার শব্দ যেন কোথাও মিশে গেছে। সোহাগ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে চাদরের মাঝে চুপ হয়ে শুয়ে থাকা অসহায় মায়াবী মুখটার দিকে। আনন্দ একদম শান্ত হয়ে গেছে। দরজার সামনে এতক্ষণ যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পরে। তামীম আর আয়েশা এক কোনায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। মাজেদ স্যারকে বাথরুমে বন্দি করে যেই না বাইরে এসেছে ওমনি সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে আনন্দ উচ্চারন করতেই থমকে যায় ।ও যেন এই মুহূর্তে দেখা জিনিসটা একদমই আশা করেনি। ধীর পায়ে হেঁটে আনন্দের পাশে এসে হাটু মুড়ে বসে পড়ে শুধু একবারই উচ্চারণ করে,
মাজেদ:- ঝিলিক!
কথক:- একটা ছেলে এসে আনন্দের কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বলে,ভাই ঝিলিক কি মারা গেছে কি-না আগে দেখেন! ছেলেটার কথায় আনন্দ যেন নিজের হুশে আসে । ওর হাতগুলো অস্বাভাবিক কাপছে। অনেক কষ্টে ঝিলিকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।ঝিলিকের হুশ থাকা অবস্থায় ও কোনদিন ঝিলিকের অমতে ঝিলিককে স্পর্শ করেনি আর মতে ধরলেও দু একবার শুধু হাত দুটোই ধরেছে। কাঁপা কাঁপা হাত দুটো ঝিলিকের দু-গালে রাখে। গালে চড় মারার দাগ। স্পষ্ট আঙ্গুলের ছাপ। ঠোঁটটা কেমন বিধ্বংস্ত লাগছে। এখনো ঠোঁটের কোনায় রক্ত লেগে আছে। পুরো ঠোঁট কেটে একাকার হয়ে গেছে। আনন্দ ঝিলিকের গালে হাত দিয়েই কেঁদে দেয়। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। ও ঝিলিকের এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করতে লাগলো। মাজেদ,সোহাগও থম মেরে আছে। আনন্দ চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ঝিলিককে জাপটে ধরে বুকে নিয়ে নেয়। বারবার গালে আলতো থাপ্পড়ে ঝিলিকের নাম ধরে ডাকছে। ঝিলিক বেঁচে আছে, হুশে আছে কিন্তু কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ওর শ্বাস প্রশ্বাস খুব ধীর গতিতে চলছে।দুর থেকে দেখলে মনে হয় মরে গেছে। কিন্তু আনন্দ যখন বুকে তুলে নেয় তখন বুঝতে পারলো ঝিলিক এখনো বেঁচে আছে কিন্তু না থাকার মতো।হয়তো এখনই চিরতরে চুপ হয়ে যাবে। বারবার ঝাকুনির কারনে ঝিলিক এবার কেঁপে উঠলো, পিটপিট করে চোখ খুলে একবার আনন্দ কে দেখলো,হালকা মৃদু হাসি দিয়ে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলে। আনন্দ খুশি হতে যেয়েও ঝিলিককে চোখ বন্ধ করতে দেখে আর খুশি হতে পারলো না। ও উত্তেজিত হয়ে ঝিলিককে বলতে লাগলো,
আনন্দ:- এই ঝিলিক! ঝিলিক! এ..এ.এইএইই ঝিলিক!! চোচোওখ খোলো! চোখ খোলো প্লিজ ! দেখো--দেএএখো আমি চলে এসেছি কিছু হবে না তোমার!
কথক:-কেউ একজন বলে উঠলো, ভাই ঝিলিক কে হাসপাতালে নিয়ে যান তাড়াতাড়ি! আনন্দের যেন হুশ ফিরলো, ও তাড়াতাড়ি চাদর পেঁচানো অবস্থায়ই ঝিলিককে কোলে তুলে নেয়।ডান বাম কোনদিকে না তাকিয়ে ঝিলিককে নিয়ে দৌড়ে নিচে নামতে যায়। সোহাগ পিছন থেকে বলে ,
সোহাগ:- ভাই থামেন,আমি লিফট চালু করে দেই।
কথক:- লিফ্ট চালু করার সাথে সাথেই আনন্দ ঝিলিককে সাথে নিয়ে ভিতরে ঢুকে যায়। ওর পিছু পিছু আরো কয়েকজন ছেলে ও সোহাগ যায়। রাত তখন প্রায় দেড়টা।এত রাত দেখে কোথাও কোন গাড়ীর দেখা নেই। সোহাগ গাড়ীর জন্য এদিকে ওদিকে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। আনন্দ ড্রাইভিং জানে চাইলে ও অফিসের যেকোন একটা গাড়ী ব্যবহার করতে পারে কিন্তু ওর বর্তমান মানসিক অবস্থা দেখে কেউ কিছু বলে না। আর আনন্দ ও ঝিলিক কে কারো কাছে দিতে নারাজ। ও এখনো ঝিলিক কে কোলে নিয়ে বুকের সাথে শক্ত করে ধরে রেখেছে। কেউ একজন বললো, এম্বুলেন্স ডাকতে। আনন্দ ঝিলিককে বুকে জড়িয়ে নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ঝিলিকের নির্জীব ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে। ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)ঝিলিকের শ্বাস-প্রশ্বাস খুবই ধীরগতিতে চলছে। ঝিলিকের শরীরের এখনো সেই চাদর পেঁচানো অবস্থায় আছে,কারন আনন্দ বুঝতে পারছে ঝিলিকের শরীরে নূন্যতম সুতো ও নেই। ওর হাত-পা বাঁধা,মুখেও কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। সোহাগ খুলেছিল মুখের কাপড়টা।মুখের কাপড়ের জন্যই ও কোন রকম শব্দ করতে পারেনি। গায়ে কোনরকম কাপড় নেই বলেই ও চেয়েও ঝিলিকের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিতে পারছে না। একটি ছেলে এম্বুলেন্সকে ফোন দিয়েছে। এর মধ্যেই পুলিশ চলে আসে। পুলিশ এসেই প্রথমে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানে, তারপর আনন্দের সামনে দাঁড়িয়ে ঝিলিকের অবস্থা দেখে এম্বুলেন্সকে ফোন দিয়ে তাড়া দেয়। তাঁরপর কয়েকজন ছেলেকে সাথে নিয়ে উপরে চলে যায়। এম্বুলেন্স পৌঁছালে আনন্দ ও সোহাগ এম্বুলেন্সে উঠে ঝিলিকের সাথে চলে যায়। যেহেতু পুলিশ কেস তাই সাথে দুজন কনস্টেবল ও গেল। এদিকে বাকী অফিসাররা মেহতাব মজুমদার, তামীম আর আয়েশাকে ধরে নিয়ে গেল।সাথে করে নিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ পাওয়া কিছু জিনিস যা প্রমান হিসেবে কাজে লাগবে এবং উক্ত গোপন কক্ষসহ মেহতাব মজুমদারের অফিসরুম ও পুরো বিল্ডিংএ তালা মেরে যায়। হাসপাতালে নিয়েই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঝিলিকের চিকিৎসা শুরু হয়।আর এদিকে এই খবর বাতাসের বেগে কোম্পানির সমস্ত কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
পর্ব ১২
বর্তমানে ফেরা যাক।
কথক:- পুলিশ অফিসার আনন্দের কথা এখানেই থামালেন কারন এর পরের খবর তিনি নিজেই জানেন। উনি আনন্দের সমস্ত কথা রেকর্ড করে,ডাক্তারদের সাথে আবারও কথা বলে অনেক কিছু বুঝিয়ে, তারপর ঝিলিকের জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই যেন তাঁদেরকে ইনফর্ম করা হয় সেই বিষয়ে সতর্ক বার্তা দিয়ে গেলেন। মাজেদ ও সোহাগকেও সাথে করে নিয়ে গেলেন কারন ওদের ও বয়ান রেকর্ড করা বাকি আছে। চলে গেল একরাত একদিন। আবারও রাতের অন্ধকারে ডুবে গেছে পৃথিবী। আনন্দ হাসপাতালের বাইরে একটি বেঞ্চে বসে আছে ।ওর পাশেই বসে আছে ওর এক কাজিন। সারাদিন ফোন দিয়ে যখন ওর বাবা-মা ওর সাথে কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিল না তখন উনারা চিন্তায় পড়ে যায় আর গার্মেন্টসের এই খবর তারাও জানতে পারে ফেসবুকের কল্যাণে। আনন্দের ছোট বোন ফেসবুক ইউজ করে। এই খবরটি ফেসবুকে পড়ার সাথে সাথেই ওর বাবা মাকে জানায় এবং তখনই উনারা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ আনন্দকে ফোন করে কিন্তু আনন্দের ফোন বন্ধ দেখায়। কারন আনন্দের ফোনের চার্জ শেষ আর সেদিকে তো আনন্দের কোন খবরই নেই। আর এই খবর অলরেডি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। যখন ঝিলিককে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হচ্ছিলো তখনই কেউ একজন সেই মূহূর্তের ছবি তুলে বিস্তারিত লিখে ফেসবুকে পোস্ট করে দেয়। এবং সময়ের ব্যবধানেই তা অজস্র শেয়ার আর লাইক কমেন্টের ছড়াছড়িতে ভাইরাল হয়ে যায়। সবারই এক কথা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ফাঁসি চাই। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অবশ্যই ভিকটিমকে সুবিচার পাইয়ে দিতে হবে। আনন্দের বাবা মা যখন আনন্দের সাথে কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারছিল না তখন উনারা আনন্দের এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করেন যিনি কিনা ঢাকায়ই একটা কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং বিস্তারিত বলে আনন্দের খবর নিয়ে তাদের জানাতে বলেন। সেই সুবাদেই উনি মানে আনন্দের চাচাতো ভাই মাসুম এখন আনন্দের পাশে বসে আছে আর আনন্দ ওর বাবা মায়ের সাথে কথা বলছে। উনারা আনন্দের শারীরিক খবর জেনে ঝিলিকের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে আনন্দ সব খুলে বলে। উনারা আনন্দকে শান্ত হতে বলে ঝিলিকের পরিবারের পাশে থাকতে বলে কথা শেষ করে। ঝিলিকের কেবিনের বাইরে ওর খালু আর মামা বসে আছে।ঝিলিকের মা এখন শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। উনি চুপ করে বসে আছে ঝিলিকের বেডের পাশে। ঝিলিকের বাবা এখনো ইমারজেন্সিতে ভর্তি আছেন যদিও এখন কিছুটা সুস্থ তবুও আশংকা রয়েছে আবারও গুরুত্বপূর্ণ কিছু হওয়ার তাই উনাকে সেখানেই রাখা হয়েছে।
"গার্মেন্টসের মালিক এবং তার ব্যক্তিগত সহকারীর দ্বারা শ্রমিক নির্যাতন" এটাই যেন এখন"টক অফ দা কান্ট্রি" হয়ে গেছে। সবার মুখেই এখন এই কথা চর্চা হচ্ছে। এদিকে আনন্দদের গার্মেন্টসের সামনে প্রচুর আন্দোলন হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল করছে। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এবং নানান সামাজিক সংগঠনগুলোও এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করছে। বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন আন্দোলন ও বিক্ষোভ মিছিলের মধ্যে দিয়ে এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নানানভাবে বিচার চেয়ে পোস্ট করে যাচ্ছে। সবার একটাই কথা অপরাধীরা যেন কোনভাবেই শাস্তির হাত থেকে রক্ষা না পায়। কোনভাবেই টাকার জোরে আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম না হয়। তিনরাত দুইদিন পর আজ ঝিলিকের হুঁশ ফিরেছে। ফিরেই নিজের পাশে মায়ের অসহায় মুখটা দেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।ওর কান্না দেখে ওর মা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদে আর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত হতে বলে। একে একে হাসপাতালে উপস্থিত সব আপনজন এসে দেখে যায়। সবার শেষে আসে মাজেদ ও সোহাগ। মাজেদ ও সোহাগকে দেখে ঝিলিক আবারও কাঁদতে শুরু করে। ওরা নানাভাবে ঝিলিককে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে হঠাৎই ঝিলিক একদমই চুপ হয়ে যায়। ওর হঠাৎ এমন চুপ হয়ে যাওয়া দেখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি অনুসরণ করে কেবিনের দরজার দিকে তাকাতেই আনন্দকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওরা ঝিলিকের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। আনন্দ ধীর পায়ে ঝিলিকের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। ঝিলিকের মা এখনো ঝিলিকের মাথার পাশে বসে আছে। ঝিলিক আনন্দের এগিয়ে আসা দেখে ওর মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে নেয়।আর তা দেখে আনন্দ কপাল কুঁচকে ফেলে। ঝিলিক যে লজ্জায় আনন্দের থেকে মুখ লুকানোর চেষ্টা করছে। ঝিলিকের মা সেটা বুঝতে পেরে অসহায় চাহনিতে আনন্দের দিকে তাকায়, চোখের ইশারায় এখন ওর কাছে আসতে বারণ করে। আনন্দ বুঝতে পেরে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে চলে যায়। এর মধ্যেই পুলিশ অফিসার চলে আসে খবর পাওয়ার সাথে সাথেই। উনি এসে প্রথমে ঝিলিকের শারীরিক অবস্থার বর্তমান খবর নিয়ে তারপর ঝিলিক কে জিজ্ঞেস করে এখন ও সব খুলে বলতে পারবে কিনা। ঝিলিক এই কথা শুনে প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পুলিশ অফিসার আর ওর মায়ের কথায় শান্ত হয়। আনন্দ তখন ও দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ঝিলিকের দিকে একমনে চেয়ে আছে। ঝিলিক দরজার দিকে তাকাতেই আনন্দ ইশারায় বলে সব কিছু বলতে।কোন ভয় নেই। অপরাধীরা অবশ্যই শাস্তি পাবে। ঝিলিক প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে বলা শুরু করে।
-----ফ্লাশব্যাক----
আনন্দ গ্রামে গেছে আজ দুদিন হলো। এই দুদিন ঝিলিক সোহাগ ও মাজেদের নজরদারিতে ছিল। তবে এই দুদিনে যেই বিষয়টি ঝিলিকের নজরে প্রখর ভাবে ধরা পড়েছে সেটা হলো ওর বসের ওর প্রতি ব্যবহারের। যার কিছুটা ও আগের থেকেই বুঝলেও এই দুদিনে সেটা ওর ভিতরে খুব ভয়ের সৃষ্টি করেছে।ও ভেবে নিয়েছে ভার্সিটি ভর্তির ঝামেলাটা শেষ হলে এই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে যেকোন ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরির জন্য চেষ্টা করবে। ঝিলিক সারাদিনের হিসেবের ফাইল নিয়ে বসের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুমের সামনে গিয়ে দেখে পিয়ন নেই। কিছু সময় অপেক্ষা করে, দরজায় নক করলো।ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করে দেখলো ভেতরে কেউ নেই। ও কি করবে? কিছুক্ষণ ভেবে তারপর ভাবলো ফাইলটা রেখে এখন চলে যাই।যদি দরকার হয় তবে পরে নিশ্চয়ই বস ডাক পাঠাবে। এই ভেবেই দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে যায়,বসের টেবিলের উপর ফাইলটা রেখে যেই না ঘুরে দাঁড়ালো যাওয়ার উদ্দেশ্যে ওমনি কিছু একটার শব্দে পেছনে ফিরলো। খেয়াল করে দেখলো বসের চেয়ারের পিছনের দিকের অংশটার দেয়ালের পর্দা উঠানো এবং সেখান দিয়ে একটা দরজা। আর কেন জানি মনে হচ্ছে শব্দটা ওখান থেকেই আসছে। ও কৌতুহল নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়েই চমকে যায়। দরজায় হাত দেওয়ার সময়ই দেখলো,দরজা অলরেডি কিছুটা ফাঁক আছে।সেই ফাঁকে একটুখানি ঝুঁকতেই,ওর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। লজ্জায় আর ঘৃনায় মাথা নুইয়ে ফেলে। ভেতরে বস এবং একটি মেয়ে খুবই অন্তরঙ্গ অবস্থায় আছে।আর ঐ নোংরা শব্দটাও ওরাই করছে। মেয়েটিকেও ও চিনে। এই গার্মেন্টসেরই , ওদের সহকর্মী। মেয়েটি কোয়ালিটি সুপারভাইজার হিসেবে আছে। দেখতে তো একদম নিষ্পাপ, মনে হয় কত পবিত্র আর পূন্যবান একজন নারী অথচ ভেতরে ভেতরে এত নোংরা! ছিহ্! এসব ভাবনার মাঝেই ও তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেল,দরজার সামনে আসতেই পিয়নের সামনে পড়ে।ও আঁতকে উঠে, পিয়ন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে, ঝিলিকের পুরো শরীর কাঁপছে ভয় আর ঘৃনায়। পিয়ন হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই কপাল কুঁচকে এক চামড়া জায়গায় করে জিজ্ঞেস করে এখানে কি করছেন? ঝিলিক পিয়নের গলায় স্বজ্ঞানে ফিরে আসে। হুঁশ আসতেই দৌড় দেয় আর তা দেখে পিয়ন ভ্যাবলাকান্তের মতো কিছুক্ষণ ঝিলিকের যাওয়ার পানে চেয়ে রয়, তারপর দরজার সামনে গিয়ে দরজাটা একটু ফাঁক দেখে বুঝতে পারে কি হয়েছে একটু আগে।তাই সে একটু শুকনো ঢোক গিললো কারন বস যদি কোনরকম ভাবে জানতে পারে যে তার এই কুকীর্তি কেউ দেখেছে তাহলে তার অবস্থা বেহাল করে ছাড়বে কিন্তু হয়তো তার ভাগ্য বড়-ই ভালো ছিল তাই ভেতরের রাসলীলা রচায়নকারীরা তাদের কর্ম সম্পাদন করায় এত-ই ব্যস্ত ছিল যে এত সময়ে ঘটে যাওয়া কোন বিষয়ে-ই তারা জ্ঞাত হলো না।
ঝিলিক এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে রেলিং ঘেঁষে বসে পড়ে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে,ওর শরীর এখনো খুব কাঁপছে ভয় আতঙ্ক লজ্জায়! চোখ বন্ধ করলেই ঐ দৃশ্যটি চোখের পাতায় ভেসে উঠে,ঘৃনায় শরীর রি রি করছে।ও জানতো বসের চরিত্র সমস্যা আছে কিন্তু এতটা জঘন্য সেটা ভাবতেই পারেনি অথচ প্রথম প্রথম এই মানুষটিকে ও নিজের বাবার মতো সম্মান করতো। আর মেয়েটা,ছিহ্! দেখতে কত ভদ্র ,নম্র।মনে হয় ভাঁজা মাছটাও উল্টিয়ে খেতে জানে না, সবসময় কত নীতি বাক্য শোনায় অথচ ভেতরটা কত নোংরা! কিভাবে, কিভাবে পারলো একজন বয়স্ক বিবাহিত পুরুষের সাথে এরকম একটা নোংরা! উফ আর পারছে না ভাবতে ঝিলিক! মানুষ এতটা নিকৃষ্ট কি করে হয়? ঝিলিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো ও আর এখানে কাজ করবে না। অনার্স ভর্তি হওয়ার পরপরই অন্য কোথাও চাকরি খুঁজবে। অনার্স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কারন কোন ভালো চাকরি ইন্টার পাশের সার্টিফিকেটে পাবে না , তবুও যদি অনার্স পড়ুয়া হয় তবে একটা সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা হলেও কোথাও না কোথাও পাবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ততদিন যতটা সম্ভব এদের থেকে নিজেকে দুরে রাখতে হবে,এই ধরনের মানুষ নিজেদের স্বার্থে যে কোন কাজ করতে পারে।বলা তো যায় না আমি তাদের এই রাসলীলা দেখে ফেলার অন্যায়ের কারনে আমাকেই কিছু করে বসে। তাই আপাতত চুপ থাকাই বেটার। নিজের মনের মাঝে এইরুপ হাজার জল্পনাকল্পনার জাল বুনে সেই দিনটা যথা সম্ভব বস আর ঐ মেয়েটাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে কাজ করে গেছে।তবে ঝিলিক কি জানতো তার অজান্তেই তার জন্য ভয়াবহ জাল বোনা হচ্ছে?
পরের দিন ঝিলিক সকাল সকাল কাজে চলে আসে কারন নতুন বায়াররা আজ আসবে তাদের প্রথম অর্ডার দেওয়া মালের প্রডাকশন দেখতে ।আর তার সাথে কি পরিমান মাল প্রস্তুত হয়েছে তার হিসেব ও জমা দিতে হবে। সারাদিন কাজের মাঝেই নিজেকে ব্যস্ত রাখা আর দিনে কয়েকবার আনন্দের ফোন রিসিভ করা,তার আদেশমূলক বানী শোনা আর কারনে অকারণে ফোনের মাধ্যমেই ধমক খাওয়া । এই নিয়েই কেটে গেছে পুরো দিন। সন্ধ্যার কিছুটা পর ও যখন কোন বায়ার বা ডিলার আসলো না তখন ও কয়েকবার জিজ্ঞেস করতে গিয়েও ভয়ে আর ঘৃনায় বসের রুমে যাওয়ার সাহস করে উঠেনি। তার মধ্যে আজ আবার পিয়ন ব্যাটা আসেনি। কিন্তু যখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ৭টার বেশি তখন অনেকটা সাহস নিয়েই বসের কেবিনে যায়। কিন্তু কেবিনে ঢুকার সময়ই দেখা হয় বসের এসিস্ট্যান্ট তামীমের সাথে। এই এসিস্ট্যান্ট তামীমকে ঝিলিকের একদম পছন্দ নয়। লোকটার চাহনি দেখলেই ঝিলিকের মেজাজ গরম হয়ে যায়। আনন্দ ও বলেছে এই তামীমের কাছে থেকে সাবধানে থাকতে,ওর চাহনি ভালো ঠেকায় না। তামীম ঝিলিক কে দেখেই, বত্রিশটি হলদে কপাটি দাত বের করে জিজ্ঞেস করে,
তামীম:- আরে ঝিলিমিলি!
কথক :- তামীমের এই ঝিলিমিলি ডাক শুনলেই রাগে ঝিলিকের শরীর রিরি করে, যথেষ্ট বিরক্তিকর একটা লোক এই তামীম। কথা বলার ইচ্ছে না থাকলেও হালকা একটা হাসির সহিত বলে,
ঝিলিক:- জ্বী!
তামীম:- তুমি এখানে কি করছো? কাজ কি শেষ?
কথক :- ঝিলিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের প্রয়োজনে হালকা মৃদু হাসি মুখে বজায় রেখেই বলে,
ঝিলিক:- আসলে আমি জানতে আসছিলাম বায়াররা কখন আসবেন? না মানে আসলে অফিস তো প্রায়ই ছুটি হয়ে গেছে তাই আর কি!
(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
তামিম:- তোমার পোস্ট আর সবার পোস্ট কি এক?
কথক:- কথাটি তামীম অনেকটা শক্ত গলায় বলে । ঝিলিক আমতা আমতা মাথা নিচে নামিয়ে বলতে চাইলো,
ঝিলিক:- না আসলে আমি..
কথক:- তামীম ঝিলিকের কথার মাঝেই বলে উঠলো ,
তামীম :- বায়াররা এখনো আসে নি তবে আসবে অবশ্যই।আমি বুঝতে পারছি তুমি মেয়ে মানুষ তাই সমস্যা কিন্তু কি করবা বলো চাকরি তো করতেই হবে। অবশ্য মাজেদ থাকলে তোমার আর থাকতে হতো না ।আর আনন্দ থাকলে তো কথাই নাই । তুমি সারারাত থাকলেও কোন অসুবিধা হতো না,কি তাই না বলো?
কথক:- শেষের কথাটা তামীম যে নোংরা একটা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে সেটা ঝিলিক ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, কিন্তু ও কোন রুপ উত্তর না দিয়ে রাগান্বিত চাহনিতে একবার তামীমের দিকে তাকিয়ে চলে যায় নিচে।
সময় দেখতে দেখতে প্রায় রাত ৮টার কাটা ছুঁই ছুঁই।তখন ঝিলিক কোন একটা কাজে ৬ তালার সিঁড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো, তখনই আয়েশার সাথে দেখা হয়। আয়েশাকে দেখতেই ওর শরীর জ্বলে উঠে রাগে। আয়েশা দন্তকপাটি বের করে ওর সামনে এসে বলে,
আয়েশা:- আরে ঝিলমিল, থুক্কু আনন্দ ভাইয়ের ঝিলিক! কই যাইতেছো?
কথক:- ঝিলিক আয়েশার ঠেস মারা কথার কোন উত্তর না দিয়ে ওর দিকে প্রশ্নাত্নক চাহনিতে তাকিয়ে রয়েছে,আয়েশা বুঝতে পেরে বলে,
আয়েশাকে:- যেখানেই যাও আপাতত বসের রুমে যাও,বস তোমাকে ডাকছে!
কথক :- আয়েশার বস ডাকছে কথাটা ঝিলিকের ভালো লাগলো না কিছু একটা আছে আয়েশার কথা বলার ধরনে যেটা ঝিলিককে ভাবাচ্ছে। কিন্তু কিছু করার ও নেই ডেকেছে যেহেতু যেতে তো হবেই। এদিকে পুরো অফিস মোটামুটি খালি,হাতে গোনা কয়েকজন স্ট্যাফ আছে, মাজেদ গেছে হাসপাতালে কাকে যেন রক্ত দিতে। সোহাগ গোডাউনে কি যেন একটা নিয়ে পড়ে আছে। ঝিলিক এসব কথাই ভাবছিলো তার মধ্যেই আয়েশার তাড়া। ঝিলিক মাথা দুলিয়ে সায় জানিয়ে হাটা ধরলো আর ওর পিছু পিছু আয়েশা। হঠাৎ আবারও ঝিলিকের ভয়ে কলিজা কাঁপা শুরু করলো। ও নিজেকে শান্ত করে,ধীরে ধীরে বসের কেবিনের সামনে গিয়ে দরজায় নক করে অনুমতি নিতে চাইলে পিয়ন বারন করে বলে ভেতরে যেতে অনুমতি লাগবে না। ঝিলিক কোন প্রতুত্তর না দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখে বস নেই। সোফায় তামীম বসে আছে। তামীম কে দেখেই ওর ভয় আরো বেড়ে গেলো, হঠাৎ এত ভয় কেন লাগছে সেটাই ঝিলিক বুঝতে পারছে না। তামীম একবার ঝিলিকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কুৎসিত দৃষ্টিতে নজর বুলিয়ে নিয়ে নোংরা একটা হাসি দিয়ে বলে ভেতরে যাও। ওর ভেতরে যাও কথা শুনে ঝিলিক প্রশ্নাত্নক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর তা দেখে তামীম আবারো জঘন্য ভাবে হেসে তারপর ইশারায় দেখায় বসের কেবিনের পিছনের দরজার দিকে।দরজাটা আজ পুরো খোলা। ঝিলিক ঐদিকে একবার দেখে আবারও তামীমের দিকে তাকালে তামীম এগিয়ে এসে ঝিলিক কে বলে,
পর্ব ১৩
তামিম:- যাও যাও ভেতরে যাও! বস সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে!
কথক:- ঠোঁটে শয়তানি হাসি রেখে কথাটি বলে, ঝিলিক জিজ্ঞেস করলো,
কথক :- আমার জন্য অপেক্ষা করছে কেন!
তামীম:- ভেতরে যাও গেলেই বুঝবে!
ঝিলিক:- কিন্তু!..
তামীম :- আহ্ এত কথা কেন বলো,যা বলছি তাই করো।
কথক:- তামীম কথাটি জোরেই বলে উঠলো এর মধ্যেই বস তামীমের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করে,
বস:- তামীম ঝিলিক আসছে?
তামীম:- জ্বী বস! এইতো এসেছে
বস( মেহতাব মজুমদার):- ভেতরে আসতে বলো।
কথক:- তামীম চোখের ইশারায় ঝিলিক কে ভেতরে যেতে বলে, ঝিলিক ভীতু চাহনিতে তামীমের দিকে তাকিয়ে থাকে। তামীম চোখের চাহনি কঠোর করে ঝিলিক কে ভেতরে যেতে বললে ঝিলিক বুঝে যায় ওর আর কোন উপায় নেই।ও ফেঁসে গেছে। এর মধ্যেই আয়েশা রুমে প্রবেশ করে , ওকে দেখে ঝিলিক কপাল কুঁচকে ফেলে। কিন্তু আয়েশার মাঝে( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) কোন হেলদোল দেখা গেলো না। অগত্যা ও ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। রুমের ভেতরে ঢুকতেই বাইরে দিয়ে দরজা আটকে দেয় । ঝিলিক চমকে পিছনে তাকায়। বস বলে উঠে,
বস ( মেহতাব মজুমদার) :- ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই,ওটা বন্ধ হয়ে গেছে।আজ রাতে আর খুলবে না।
কথক:- বসের কথায় ঝিলিক ভয়ে আঁতকে উঠে পিছনে ঘুরে তার দিকে তাকালে দেখতে পায় বস তার নিজের গায়ের শার্ট খুলে ফেলেছে তার চেয়েও বড় কথা বসের ল্যাপটপে এডাল্ট ভিডিও চলছে।যার থেকে বাজে শব্দ আসছে। ঝিলিক চোখ বন্ধ করে ফেলে।এর মধ্যেই অনুভব করে ওর হাতটা কারো হাতের মাঝে। চোখ খুলে দেখে বস একদম ওর সামনে।ও আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করে,
ঝিলিক:- স্যার কি ক্কককিই করছেন?
মেহতাব মজুমদার:- আরেহ এত ভয় পাও কিসের জন্য আসো তোমার সাথে কিছু জরুরী কথা বলি! বসো এখানে। কথা গুলো অনেক দিনের।
কথক:- মেহতাব মজুমদার ঝিলিককে নিজের পাশে বসিয়ে একদম গা ঘেঁষে বসে কথাগুলো বলতে থাকে আর ঝিলিক তো ভয়ে শেষ।ও বুঝে গেছে আজ ওর রেহাই নেই। কিসের জন্য ওকে আজ এত রাত অবধি রাখা হয়েছে!
ঝিলিক কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলো,
ঝিলিক:- স্যাস্যার আমাকে ছেড়ে দিন,যেতে দিন আমাকে। প্লিজ!
মেহতাব মজুমদার:- আরে এমন করছো কেন।তোমাকে কি আমি আটকে রাখবো। আমার কাজ শেষ হলে অবশ্যই ছেড়ে দিবো। যদি তুমি আমার সাথে কম্প্রোমাইজ করো তবে।
ঝিলিক :- মানে?
কথক :-ঝিলিক মেহতাব মজুমদারের কথায় তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠলো ! মেহতাব মজুমদার বলতে শুরু করলেন,
মেহতাব মজুমদার:- দেখো তোমাকে যেদিন প্রথম দেখি সেদিন-ই তুমি আমার মনে ধরেছো। কিন্তু পরে আর কিছু বললাম না কারন টা হচ্ছে ঐ আনন্দ। সারাদিন চিপকে থাকতো তোমার সাথে।যা আমার বিরক্ত লাগতো।যাই হোক কথা হলো,দেখো তুমি গরীব ঘরের মেয়ে।তার মধ্যে এই বয়স। এই বয়সে কত চাহিদা থাকে। কিন্তু বাপের টাকার অভাবে পুরন করতে পারোনা।এর মধ্যে কত কষ্ট করে কাজ করে টাকা রোজগার করে নিজের পরিবারের দায়িত্ব বহন করছো আবার পড়াশোনাও করছো।
কথক:- ঝিলিক ভয়ে থম মেরে বসে আছে। মেহতাব মজুমদার কিছুক্ষণ থেমে তারপর ঝিলিকের কাঁধ হাত রেখে তারপর আবারও বলা শুরু করে,
মেহতাব মজুমদার:- কিন্তু আমার কথা এত কষ্ট করার দরকার কি।না গায়ে শক্তি আছে ঠিক আছে কিন্তু সেই শক্তি তো ঠিক জায়গায় কাজে লাগাতে পারো। এই যে দেখো আমাকে,আমাকে খুশি করতে পারলেই তোমার সব অভাব দুর করে দিবো।
কথক:- মেহতাব মজুমদারের কথায় ঝিলিক তার দিকে ভীতি দৃষ্টিতে তাকায়, মেহতাব মজুমদার এবার একটা গ্লাস ঝিলিকের দিকে ধরে বলে খেতে, কিন্তু ঝিলিক খেতে অস্বীকার জানায়,এরপর অনেকটা জোর করেই ঝিলিকের মুখে ঢালতে গেলে ঝিলিক দু ঠোঁট চেপে ধরে রাখে এতে করে সবটুকু ঝিলিকের গাল বেয়ে গলা দিয়ে নেমে নিচে পড়ে যায়। মেহতাব মজুমদার এবার অনেক বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ঝিলিক আসার আগের থেকেই এডাল্ট ভিডিও দেখছিলো আর মদ খাচ্ছিল তাতে তো উত্তেজিত ছিলোই এখন আবার ঝিলিকের শরীরের সাথে শরীর ঘেঁষে বসায় উত্তেজনা আরো তীব্র হয়ে উঠে মেহতাব মজুমদার হঠাৎ ই ঝিলিককে শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরে, ঝিলিক ছোটার জন্য চেষ্টা করতে থাকে আর বলতে থাকে ,
ঝিলিক:- স্যার আমাকে ছাড়ুন প্লিজ আপনি আমার বাবার মতো।
কথক:- কিন্তু না! কে শোনে কার কথা। ঝিলিকের দুই হাত নিজের দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে পা দিয়ে পা পেঁচিয়ে ধরে। ঝিলিক তাও ছোটার জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু পারছে না। এরকম সুঠামদেহী পুরুষের সাথে কি করে পারবে ৫০ কেজি ওজনের বাচ্চা বয়সী একটা মেয়ে।যতই হোক সে পুরুষ মানুষ। বুড়ো হলেও পুরুষ পুরুষই। পুরুষের শারীরিক সক্ষমতার কাছে মেয়েরা হারতে বাধ্য।আর ঝিলিক তো ভয়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এক পর্যায়ে মেহতাব মজুমদার ঝিলিকের গলার ওড়না দিয়ে ঝিলিকের গলা পেঁচিয়ে ধরে। ঝিলিক সইতে না পেরে নিজের গলা থেকে ওড়না সরানো চেষ্টা করতে থাকে।তাও পারে না।যখন দেখে ঝিলিকের চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে।তখন ছেড়ে দেয়। ঝিলিক জোরে জোরে শ্বাস নিতে চেষ্টা করে আর মধ্যেই মেহতাব মজুমদার নিজের কুৎসিত চাহিদা পূরণ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের মেয়ের বয়সী ঝিলিকের উপর।ওর কামিজটাকে গলা থেকে একটানে ছিড়ে ফেলে। প্লাজোটা খুলে ছুঁড়ে মারে মেঝেতে। ঝিলিক এত সময়ের ধস্তাধস্তিতে অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তারপরও নিজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে চেষ্টা চালিয়ে যায় কিন্তু কিছু করতে পারে না উল্টো কাজে বাঁধা পড়ায় বার কয়েক থাপ্পর খেতে হয় যার দরুন ঠোঁট কেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়।এক পর্যায়ে ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে তারপর লাগাতার তিন ঘণ্টা একনাগাড়ে অমানবিক নির্যাতন চালায় জানোয়ার মেহতাব মজুমদার। এরপর ঝিলিক কে ছেড়ে দরজায় নক করলে, তামীম দরজা খুলে বিচ্ছিরি ভাবে হেসে তারপর জিজ্ঞেস করে,
তামিম:- বস,মন ভরছে?
মেহতাব মজুমদার:- তুমি কি একবার চেক করতে চাও ?
কথক:-তৃপ্তির সাথে সহাস্যে বলে কথাটি মেহতাব মজুমদার, তামীম নিজের দু হাত কচলাতে কচলাতে তোষামোদের সহিত বলে,
তামীম:- বসের যদি সদয় হয়,আসলে এইরকম আইটেম কে না একবার চেষ্টা করত চায়।
কথক:- মেহতাব মজুমদার নিজের কাপড় কোনরকম ঠিক করে তারপর বাইরে বের হয়ে তামীম কে তাগাদা দিয়ে ভেতরে যেতে বলে,আয়েশার দিকে তাকিয়ে দেখে আয়েশা মুখটা বাংলার পেঁচা বানিয়ে রেখেছে।তা দেখে আয়েশার কাছে গিয়ে গা ঘেঁষে দাড়ালে,আয়েশা আহ্লাদী সুরে ন্যাকা কান্নার ভান করে বলে,
আয়েশা:- আজকে আর আমাকে দরকার নেই, নতুন মাল পেয়ে আমাকে ভুলে গেছেন!
পর্ব ১৪
কথক:- মেহতাব মজুমদার আয়েশার কথায় হালকা হেসে আয়েশাকে জড়িয়ে ধরলো, আবারও শুরু করলো নিজেদের নোংরা কার্যক্রম। ওদিকে সিক্রেট রুমে বেডের উপর নিস্তেজ ,অসাড়, জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে রয়েছে ঝিলিক। তবুও একটু মায়া হলো না তামীমের।সে নিজের কাজে লেগে পড়ে। ঝিলিকের হুশ নেই।ও জ্ঞান হারিয়েছে অনেক আগেই। মেহতাব মজুমদারের অমানবিক নির্যাতন ও সহ্য করতে পারেনি। শুধু কি যৌন নির্যাতন করেছে,নাহ! যতবার সিগারেট খেয়েছে ঠিক ততবারই সিগারেট দিয়ে ঝিলিকের প্রাইভেট স্থানে, শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে ছেকা দিয়েছে,খুব বাজেভাবে মেয়েটিকে আঘাত করেছে ,দেহটা যেন ছিন্নভিন্ন করার এক আপ্রান চেষ্টা করেছে। আর এতটা যন্ত্রনা ঝিলিকের শরীর মন কেউই নিতে পারেনি তাইতো সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু তাতে এদের কি এরা তো মানুষ রুপি জানোয়ার তাই অজ্ঞান একটি মেয়ের উপরেও নির্যাতন করতে খারাপ লাগছে না। প্রায় ৩০-৪৫ মিনিট পর তামীম রুম থেকে বের হয়ে আসে। এসেই দেখে আয়েশা আর বসের অন্তরঙ্গতা। মনে মনে একটা বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে বলে,
তামীম:- শালা! বুইড়া বয়সে এত এনার্জি আসে কই থেইকা। আমি এই আধা ঘন্টায় হাপিয়ে উঠেছি,আর এরে দেখো তিনঘন্টা ঝিলিককে ই করে এখন আবার আয়েশার সাথে।আর এই মাগীর ও খায়েশ কমে না। আজকে তো আমিও দেখমু এই মাগীর কত লাগে?
কথক:- মনে মনে এইসব ভেবে একটু জোরেই ডাকে,
তামীম:-বস!
কথক:- মেহতাব মজুমদার তামীমে ডাকে আয়েশাকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাড়ায়, তামীম নিজের কাজ শেষ হয়েছে ইশারায় বোঝায় এরপর জানতে চায়,কি করবে। মেহতাব মজুমদার কিছু না বলে চুপ করে থাকে কিছু একটা ভাবছে।তামীম বুঝতে পারে, মেহতাব মজুমদার আজ আর ঝিলিক কে ছাড়বে না।তাই ও পৌচাশিকভাবে হেসে উঠে তারপর মেহতাব মজুমদারের উদ্দেশ্য বলে,
তামীম:- বস আপনি পারেন ও।এত এনার্জি আসে কই থেইকা। ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার)
মেহতাব মজুমদার:- কিছু না বলে হাসতে হাসতে আবারও চলে যায় ভিতরের রুমে। আর তামীম এসে দাঁড়ায় আয়েশার সামনে। তামীম কে দেখে আয়েশা নিজের কাপড় ঠিক করতে নিলে তামীম আয়েশার হাত সরিয়ে সরাসরি আয়েশার বক্ষে স্পর্শ করে,আয়েশা চোখ তুলে তামীমের দিকে তাকালে তামীম বলে,
তামীম:- বুঝলাম না আয়েশা খালি বসকে খুশি করলেই হবে? মাঝেমধ্যে যে আমাদের ও ইচ্ছে হয় সেটা কি তুমি বুঝোনা।
কথক:- তামীমের আর কিছু বলার দরকার পড়েনি।এর আগেই আয়েশা নিজেকে তুলে ধরে তামীমের কাছে। আসলে আয়েশা নিজেও উত্তেজিত ছিল কারন মেহতাব মজুমদার মাত্র- ই শুরু করেছিলেন এর মধ্যেই চলে গেল।তাই সে তামীমকে নিজের কাছে টেনে নেয়।আর এই সময়েই বাইরে থেকে মানুষের আনাগোনার শব্দ শুনতে পায়। ভালো করে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে এবং সফল ও হয়।তাই তাড়াতাড়ি নিজেদের শান্ত করে ভেতরের রুমে চলে যায়।এর কিছু সময়ের মধ্যেই আনন্দ আর বাকী সবাই ভেতরে চলে আসে। তামীম,আয়েশা তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢোকার কারনেই দরজার দিকটা কিছুটা এলোমেলো ছিল আর যেহেতু ভেতর দিয়ে আটকিয়েছে তাই বাইরের দিকে সম্পুর্ণ পর্দা দিয়ে ঢাকা সম্ভব হয় নি যার সুবিধার্থে আনন্দ ওরা ঝিলিক কে খুঁজে বের করতে পেরেছে। তামীম, আয়েশা ভেতরে গিয়ে দেখে বস তার মতো নিজের কাজেই ব্যস্ত । তাই ওরা তাড়াতাড়ি বসকে ঝিলিকের থেকে সরিয়ে বাইরের বিষয় খুলে বললে সে নিজের কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করে নেয়। এরপর আয়েশা আর তামীম, অজ্ঞান ঝিলিকের মুখ, হাত-পা ভালো করে বেঁধে ,ঝিলিকের ছেঁড়া কাপড়গুলো সহ বিছানায় থাকা চাদর দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে খাটের নিচে রাখে। আর বসকে বাথরুমে লুকিয়ে থাকতে বলে,নিজেরা ইচ্ছা করে ওরকম অন্তরঙ্গ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকে। ধারনা ছিলো আনন্দ ওরা এতদূর পৌঁছাতে পারবে না কারন ওদের ধারনা ওরা সব কিছু ঠিক ভাবেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।আর যদি কোনভাবে এই অবধি চলে আসে তাহলেও ওদের এই অবস্থায় দেখে বুঝতে পারবে যে এখানে শুধু ওরাই আছে। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু আসলেই কি এমন হওয়ার কোন সুযোগ ছিল।নাহ। কিন্তু আয়েশা, তামীম কিংবা মেহতাব মজুমদার তাই ভেবেছিলো। বলে না "বিনাশ কালে বুদ্ধি ভ্রম।" এদের ও তাই হয়েছে। নিজেদের কুকর্মের সীমানা ছাড়িয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। আর উপরওয়ালাও অনেক ছাড় দিয়েছেন। কিন্তু ছাড় ই দিয়েছেন,ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেনি।তাই তো আজ একদম টুটি চেপে ধরার মতো অবস্থায় পড়েছে।
বর্তমানে আসি!
কথক:- ঝিলিকের মুখে এই ভয়াবহ বর্ননা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। পুলিশ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ঝিলিকের মায়ের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করে বলে,
পুলিশ অফিসার:- আমার বয়ান নেওয়া শেষ।আপনারা বিচার পাওয়ার জন্য সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত!?
কথক:- ঝিলিকের মা অফিসারের কথা বুঝতে না পেরে তার দিকে তাকিয়ে রইল, অফিসার ঝিলিকের মায়ের তাকানো দেখে বুঝতে পারলে উনি কথার মানে বুঝতে পারেনি। তাই উনি খোলাসা করেই বলা শুরু করলেন,
অফিসার:- দেখুন, আপনার মেয়ের সাথে যা হয়েছে তা খুবই জঘন্য একটা বিষয়। আমরা চাই এর যথাযোগ্য বিচার ও পাক। কিন্তু পরে যদি আপনারা কোন কারনে কেস ফিরিয়ে নেন বা এই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না চান তাহলে বুঝতে পারছেন?
কথক:- এইবার ঝিলিকের মা অফিসারের কথা বুঝতে পেরে কঠোরভাবে বললেন,
ঝিলিকের মা:- আমি অবশ্যই বিচার চাই।আমি ফাসি চাই। আমার বাচ্চা মেয়েটাকে কত কষ্ট দিয়েছে আমি অবশ্যই এদের সবার ফাঁসি চাই।
কথক:-ঝিলিকের খালু,মামা সহ ওখানে যারা ছিলেন সবাই বিচারের দাবিতে অনড় রইলো। কোনরকম হুমকি ধামকির কাছে তারা মাথা নত করবে না এটা স্পষ্ট জানিয়ে দিলো। অফিসার হাসপাতালের বাকী ফর্মালিটিজ শেষ করে যাওয়ার সময় আনন্দের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে গেলো।
কথক :- দেখতে দেখতে কেটে গেলো একটি সপ্তাহ! ঝিলিক কে বাসায় নিয়ে যাবে আজ।ওর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। একেবারেই চুপচাপ থাকে। ঝিলিককে নিতে ওর ,মা আর খালু আসবে আর আনন্দ তো আছেই। এতদিনে ঝিলিকের পরিবারের সবাই আনন্দ ঝিলিকের বিষয়টি বুঝে গেছে।আর তাতে তাদের ও কোন সমস্যা নেই। থাকবেই বা কেন? তারা তো নিজের চোখেই দেখেছে তাদের মেয়ের জন্য করা আনন্দের পাগলামী গুলো। এরকম পরিস্থিতিতেও তাদের মেয়েকে একদিনের জন্য একা ছাড়েনি। আর এরকম ছেলেই তো প্রতিটি পরিবার তাদের মেয়ের জন্য চায়। আনন্দের পরিবার তো আগে থেকেই জানে।এর মধ্যেই অবশ্য একবার তারা এসে ঝিলিককে দেখে গেছে। আনন্দের মা ঝিলিকের মায়ের সাথে কথা বলে তাকে অনেকবার শান্তনা দিয়েছেন।তাদের পাশে থাকার ও ওয়াদা করেছেন। আজকে যেহেতু ঝিলিক কে বাসায় নিয়ে যাবে তাই পুলিশ অফিসারও আসবে। অফিসার আসার পর হাসপাতালের সব কাজ শেষ করে ঝিলিককে নিয়ে বাসায় চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হসপিটালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিএনজি ভাড়া করার জন্য। পুলিশ অফিসার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে,ঝিলিকরা কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে যেন তৎক্ষণাৎ তাকে জ্ঞাত করানো হয় সেই বিষয়ে স্পষ্ট কথা বলে চলে যায়।
পর্ব ১৫
সময় আর স্রোত কখনো কারো জন্য বসে থাকে না। সে তার আপন নিয়মে চলে। আর যে নিয়মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু সময় স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি আদায় করে নিতে পারে জীবনে সেই হয় প্রকৃত সফল। আর যারা সময়ের বাহানা দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাদের জীবন স্রোতেই ভেসে যায়। আর তাই সময়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত তবে সময়ের তালে গা ভাসিয়ে তার দোষ দিয়ে নিরুত্তাপ হয়ে থাকলে জীবন হেলায় ফেলায় নষ্ট বই অন্য কিছু হবে না! ঠিক তেমনি আনন্দ সময় আর স্রোত রুপি মানুষের কথার বানকে পিছনে ঠেলে এগিয়ে চলছে ঝিলিকের হাত ধরে। আজ আনন্দ ঝিলিকের বিয়ের মতো পবিত্র কাজটি সম্পন্ন হলো। ঝিলিক এখন বসে আছে ফুলে ফুলে সজ্জ্বিত এক শুভ্র পৃথিবীতে! পুরো ঘরময় যেন জোৎস্নার ঝলকানি দিয়ে উঠছে ছোট্ট ছোট্ট প্রদীপের আলোয়, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে শুভ্র আর মোহময় সাদা গোলাপ আর বেলীর সুগন্ধ! এর মাঝেই টুকটুকে লাল জামদানি শাড়ি পরে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে আমাদের ঝিলিক। আর ভাবছে বিগত কয়েক মাসে ওর সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা। সেই বিভৎস ঘটনার পর কেটে গেছে কয়েকটি মাস! সেই রাত, সেই সময় যতটা যন্ত্রনার ছিল তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি কষ্টের,যন্ত্রনার ছিলো তার পরের সময়গুলো। শুধু ছিলো কেন বলছি,এখনো আছে হয়তো সারাজীবন থাকবে! কিন্তু এত কিছুর মাঝেও কিছু ভালোবাসা ছিল,পরম পাওয়া ছিলো। যেমন ছিলো আনন্দের দিক থেকে। একটা দিন একা ছাড়েনি। প্রতিটা মুহূর্ত মনে করিয়েছে পুরো পৃথিবী ছেড়ে গেলে ও সে কখনো ছাড়বে না। আজ থেকে ঠিক তিনমাস আগের কথা। ঝিলিক ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা তারা দেখছিলো আর নিজের মনের মাঝেই হাজার জল্পনাকল্পনার জাল বুনছিলো, হঠাৎ আনন্দ পিছনে থেকে কাঁধে হাত রাখলো। ঝিলিক চমকালো না কারন এই ছোয়া এখন তার অনেকটাই পরিচিত। কারন যখনই ঝিলিক ঐ রাতের কথা মনে করে অস্হির হয়ে পড়তো তখন তাকে শান্ত করার জন্য আনন্দকেই দরকার পরে। আনন্দ ঝিলিকের বরাবর হয়ে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঝিলিকের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- কি ভাবছো?
ঝিলিক:- আজ চার্জশিট দাখিল হয়েছে কোর্টে?
আনন্দ:- হুম।
ঝিলিক:- তাতে কি হবে?
কথক :- আনন্দ কপাল কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছে ঝিলিকেল কথার মানে, কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেই বললো,
আনন্দ:- কি হবে মানে? যা ওদের প্রাপ্য ঠিক তাই হবে।তবে তোমাকে শক্ত থাকতে হবে। তুমি শক্ত থাকলে তবেই লড়াইয়ে আমরা জিতবো।
কথক:- ঝিলিকের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তারপর বললো,
আনন্দ:- মনে রাখবে এটা এখন শুধু তোমার একার লড়াই না। এর সাথে এখন অনেক মেয়ের জীবন জড়িয়ে আছে। তুমি প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছো বলেই ওরাও সাহস করে এগিয়ে এসেছে। সুতরাং কোনোভাবেই হতাশ হওয়া অথবা ভয় পেয়ে দূরে সরে যাওয়া যাবেনা।
কথক:- আনন্দের কথায় ঝিলিক সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো। কিছুক্ষণ সময় নিরবতার পর আনন্দ বললো চলো নিচে যাই। বাবা মা এসেছে। আনন্দের কথায় ঝিলিক প্রশ্নাত্নক চাহনিতে তাকালে আনন্দ রহস্যময় হাসি দিয়ে ঝিলিকের হাত ধরে নিচে নেমে চলে গেলো। ঘরে গিয়ে আনন্দের মা বাবাকে সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করে ঘরের বারান্দার এক কোনায় বসে রইল। আনন্দের বাবা মা টুকটাক কথা বলতে লাগলো, এক পর্যায়ে তারা জানালো তারা আজ আনন্দের সাথে ঝিলিকের বিয়ের বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন। এই কথা শুনে ঝিলিকের মা বাবা খুশি হলেও ঝিলিক খুশি হয়নি। ও কিছুতেই নিজেকে আনন্দের জীবনের সাথে জড়াতে চায় না তাই ও বারান্দা থেকে ঘরে এসে সবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো,
ঝিলিক:- কিন্তু আমি এই বিয়ে করতে চাই না!
কথক:- ঝিলিকের কথায় ওর মা বাবা অসহায় ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, আনন্দের মা বাবা হতবাক হয়ে গেল, ওনারা আনন্দের দিকে তাকিয়ে আছে আনন্দও বুঝতে পারছেনা ঝিলিক এই কথা কেন বললো।
ঝিলিক:- আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা, কোনভাবেই না।
আনন্দ:- কিন্তু কেন?
ঝিলিক:- কেন, এই কথার কোন উত্তর হয় না!
কথক :-ঝিলিকের কন্ঠ কাঁপছে,যাকে নিয়ে হাজার স্বপ্ন মনের গহীনে লুকানো আজ তাকেই বিয়ের জন্য না করতে হচ্ছে, আনন্দ চিৎকার করে বলে উঠে,
আনন্দ:- অবশ্যই আছে! যেখানে আমরা একে অপরকে পছন্দ করি, আমাদের উভয় ফ্যামিলি রাজী সেখানে তুমি হঠাৎ না কেন বলছো!! তার উত্তর নিশ্চয়ই তোমার কাছে আছে!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় কোন উত্তর না দিয়ে অসহায় চাহনিতে তাকিয়ে আছে,ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আনন্দের কলিজা কেঁপে উঠলো,যেন ঝিলিকের ভেতরটা পড়তে পারছে। ঝিলিক চোখ নামিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে চলে গেল ছাদে, আনন্দ ওর পিছনে দৌড়ে যেতে যেতে বললো,
আনন্দ:- কোথায় যাচ্ছো তুমি,আমার উত্তর না দিয়ে? দাঁড়াও ঝিলিক, ঝিলিক আমি বলছি দাঁড়াও!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের ডাকে সাড়া না দিয়ে চলে গেল, আনন্দ দরজার সামনে আসতেই ওর মা ওকে ডাক দিলে ও মায়ের কাছে এসে নিজের মায়ের হাত দুটো ধরে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো,
আনন্দ:- মা প্লিজ!
কথক :- আনন্দের মায়ের জন্য এতটুকু কথাই যথেষ্ট ছিলো, উনি ঝিলিকের মায়ের দিকে তাকালেন, ঝিলিকের মায়ের অবস্থা শোচনীয়।উনি মেয়ের মনের অবস্থাও বুঝতে পারছে। কিন্তু উনিও তো মা।উনিও চান বাকী পাঁচটি মেয়ের মতো তার মেয়ের ও বিয়ে হোক,সংসার হোক।তাই উনি আনন্দের মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগেই আনন্দের মা বললেন,
আনন্দের মা:- দেখেন ,আমি বুঝতে পারছি ঝিলিকের মনের অবস্থা।তাই বলছিলাম এই বিষয়ে আমরা বড়রাই কথা বলি।
কথক:- আনন্দ ওর মায়ের কথায় মায়ের হাতে একটা চুমু খেয়ে তারপর জড়িয়ে ধরে বললো,
আনন্দ:- আম্মু তুমি বিয়ের ডেট ফিক্সড করো আমি আসছি।
কথক:- উনি আনন্দের গালে হাত রেখে আশ্বস্ত করেন, আনন্দের বাবা ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত হতে বলে ঝিলিকের কাছে যাওয়ার জন্য বলেন। আনন্দ দ্রুত পায়ে ছাদে গিয়ে থমকে যায়। ঝিলিক রেলিং এর উপরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে আছে। আনন্দ ওর মতলব বুঝতে পেরে দৌড়ে গিয়ে ঝিলিকের কোমর জড়িয়ে নিচে নামিয়ে এনে কষিয়ে একটা চড় মারে। এতটুকু সময়ের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেল ঝিলিকের বুঝতে সময় লাগলো।যখন বুঝলো ,তখন হাত দিয়ে আনন্দের দিকে তাকিয়ে ভয়ে চোখ নামিয়ে ফেলে। আনন্দের চোখ দিয়ে যেন রক্ত ঝড়ছে,রাগে চোখ দুটো রক্তবর্ন ধারন করেছে। চিৎকার করে বলে উঠলো,
আনন্দ:- কি ,কি করছিলে তুমি? এখন এইমাত্র কি করতে যাচ্ছিলে?
কথক:- ঝিলিকের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
আনন্দ:- সুইসাইড করতে গিয়েছিলে, এতটা স্বার্থপর কি করে হতে পারলে তুমি? তোমার একবার আমাদের কথা মনে পড়লো না? কিভাবে পারলে এরকম একটা কাজ করার কথা ভাবতে? বলো চুপ করে আছো কেন, কিসের জন্য? আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই তাই? এতটাই অযোগ্য আমি তোমার? যে আমাকে বিয়ে করা থেকে বাচার জন্য নিজেকেই শেষ করে দিতে চাইছো?
কথক:-একদমে কথাগুলো বলে থম মেরে ঝিলিকের দিকে তাকিয়েই রইল । আনন্দের চাহনি নির্জীব,কথা বলার সময় গলা কাঁপছে,ও যে মাত্র ঘটে যাওয়া ঘটনায় প্রচন্ড ভয় পেয়েছে তা ওর কন্ঠ থেকেই বোঝা যাচ্ছে! আনন্দ ঝিলিকের হাত এতটাই শক্ত করে ধরেছে যে ব্যথায় ঝিলিকের হাত অবশ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, ঝিলিক এতসময় ফুঁপিয়ে কাঁদলেও আনন্দের এরকম অবস্থা দেখে আরো জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।ওর কান্না দেখে আনন্দ ও কে ছেড়ে দিয়ে দুরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই চিৎকার করে কান্না শুরু করলো।ওর কান্না দেখে ঝিলিক ও আরো জোরে কাদতে শুরু করে। ঝিলিকের এখন নিজেকে বড্ড বেশি অসহায়, অপরাধী মনে হচ্ছে। আনন্দ ঝিলিকের কান্নার আওয়াজে ওর দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যায়।ধীর পায়ে ঝিলিকের সামনে গিয়ে হাটু মুড়ে বসে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- ভালোবাসো আমায়?
আনন্দকে নিজের সামনে দেখে ঝিলিক নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, আনন্দের এই প্রশ্নের উত্তরে ঝিলিকের পৃথিবী যেন আবারো থমকে যায়।কি বলবে, অন্য সময় হলে এর উত্তর নিঃসন্দেহে হ্যা হতো কিন্তু এখন কি বলবে? কিন্তু আনন্দের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলার সাহস ওর নেই। তাই চুপ করেই রইলো। আনন্দ ঝিলিকের নিরবতায় সম্মতি খুজে নিলো।ঝিলিকের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আদরমাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- তাহলে বিয়ে কেন করতে চাইছো না? কেন সুইসাইড করতে চাইলে বলো?
কথক:- ঝিলিক নিরুত্তাপ হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল।
আনন্দ:- কি হলো বলো? আমি কোন ভুল করেছি?
কথক:- আনন্দের এই কথার উত্তরে ঝিলিক শুধু দু দিকে নাড়ালো,যার অর্থ না। আনন্দ আবারও জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- তাহলে কি কারন?
কথক:-ঝিলিক এবার নিজেকে শক্ত করে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
ঝিলিক:- আপনি কেন আমাকে বিয়ে করতে চাইছেন?
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের এহেন প্রশ্নে কপাল কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু সময় চুপ থেকে বললো,
আনন্দ:- কেন করছি জানোনা? আমি তোমাকে ভালোবাসি! ইভেন আমরা একে অপরকে ভালোবাসি তাই না!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের উত্তর জানতো, আবার শুনে খুশি ও হলো কিন্তু নিজের খুশি নিজের মনের মধ্যে রেখেই শক্ত গলায় বললো,
ঝিলিক:- নাহ।
আনন্দ:- না মানে?
কথক:- আশ্চর্যিত হয়ে প্রশ্ন করলো,
ঝিলিক:- মানে পরিষ্কার।এইসব ভালোবাসা টালোবাসা আগে থাকলেও এখন সেটা শুধু করুনা বই কিছুই না। আর আমি আর যাই হোক করুনার পাত্রী হতে চাই না ।তাই আমি যেমন আছি তেমনই থাকতে চাই।
কথক:- আনন্দ যেন ঝিলিকের কথায় স্তব্দ হয়ে গেল।যাকে ও ভালোবেসে নিজের সবচেয়ে আপন বানাতে চায় সে কিনা ওর ভালোবাসাকে করুনা ভেবে দুরে সরিয়ে দিচ্ছে। মনের মধ্যে প্রচুর অভিমান জমা হলো আনন্দের পরক্ষনেই ঝিলিকের মুখের তাকিয়ে সব অভিমান দুরে রেখে জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- তোমার আমার ভালোবাসাকে করুনা মনে হচ্ছে?.
ঝিলিক:- কেন হওয়া উচিত নয়?
আমি একটা ধর্ষিতা মেয়ে, আমার মাঝে এমন কি আছে যার জন্য আমাকে বিয়ে করা লাগবে?
আনন্দ:- আমি তোমাকে ভালোবাসি সেখানে তুমি ধর্ষিতা কেন যদি একটা অঙ্গ বিকলাঙ্গ হয়ে যেত তাহলেও বিয়ে করতাম।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে,আর তাতেই চোখের মাঝে আটকে রাখা পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তারপর আবারও নিজেকে সামলে আনন্দের দিকে তাকিয়ে বললো,
ঝিলিক:- এসব ভালোবাসা শুধু একটা শব্দ।যখন আমাকে নিয়ে সমাজে চলতে অসুবিধা হবে তখন সব ভালোবাসা ফুরিয়ে যাবে।
কথক:- আনন্দ এবার বুঝতে পেরেছে সমস্যার গোড়া কোথায়।ও ঝিলিকের মুখোমুখি হয়ে দু হাতের আজলায় ঝিলিকের মুখটা তুলে অতীব্র ভালোবাসায়,আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- কি হয়েছে,কেউ কিছু বলেছে? বলো আমায় কে কি বলেছে?
কথক:- আনন্দের এরুপ আদুরে কথায় ঝিলিক আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না।ও আনন্দের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করলো, আনন্দ ও নিজের বাহুডোরে শক্ত করে চেপে ধরলো। ঝিলিক কিছু সময় কাদার পর থামলো । নিজেকে আনন্দের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তারপর শান্ত হয়ে বলতে শুরু করে,
ঝিলিক:- দেখেন আপনি আমার চেয়ে ভালো মেয়ে পাবেন, আপনি ডিজার্ভ করেন।
আনন্দ:- আমার তোমাকেই চাই।
ঝিলিক:- আপনি শুধু শুধু জিদ করছেন!
আনন্দ:- জেদ আমি দেখাচ্ছি না তুমি?
ঝিলিক:- আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না,আপনি আমাকে নিয়ে ভালো থাকবেন না। আপনাকে ভালো থাকতে দিবে না।
আনন্দ:- আর এই কথা তোমাকে কে বলেছে?
ঝিলিক:- কে বলবে,আমি নিজেই জানি এগুলো!
আনন্দ:- ওহ তার জন্যই সুইসাইড করতে গিয়েছিলে?
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় দমে গিয়ে মাথা নুইয়ে ফেলে, আনন্দ ওর থুতনি ধরে মুখটা উপরে তুলে চোখে চোখ রেখে বলে ,
আনন্দ:-তুমি সত্যিই মনে করো আমি তোমাকে করুনা করছি?
ঝিলিক:- এই সমাজ আপনাকে ভালো থাকতে দিবে না, প্রতি দিন,প্রতি মুহুর্তে মনে করিয়ে দিবে যে আপনি একজন ধর্ষিতা মেয়ে নিয়ে সংসার করছেন! আপনার পরিবার এক সময় এইসব দেখে বিরক্ত হয়ে আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। আমার জীবনের জন্য কেন আপনি নিজেকে ভোগাবেন বলেন? আমি চাই না আমার জীবনের এই কাটা যুক্ত পথে আপনি আমার সাথী হোন।আমি চাই আপনি ভালো থাকুন। তাই বলছি আপনি আপনার জেদ ছেড়ে বাবা মাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
আনন্দ:- আর তুমি? সুইসাইড করবে? তাহলে চলো এক কাজ করা যাক,আমরা একসাথে লাফ দেই! তাহলেই তোমার সব সমস্যার সমাধান হবে।না মানে তুমিও সমাজের কথিত যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবে আর আমিও তোমাকে হারানোর যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবো।
কথক:- ঝিলিক আঁতকে উঠে আনন্দের কথায় আর তা দেখে আনন্দ তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
আনন্দ:- কি হলো ভয় পাচ্ছো কেন? এই না তুমি আত্নহত্যা করতে গিয়েছিলে তাহলে এখন চমকাচ্ছো কেন? ওহ সমাজের কথা ভেবে নাকি আমার কথা শুনে! এক মিনিট,এক মিনিট তুমি আমার আত্নহত্যার কথা শুনে ভয় পাচ্ছো ? সত্যিই! নাহ এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না কারন আমার কথা যদি ভাবতেই তাহলে এত সময় যে কথাগুলো বলছিলে তা বলতে না। অন্ততপক্ষে একবার ভাবতে যে তুমি যা বলছো আর করছো তাতে আমার মনের ভেতর কি বয়ে যাচ্ছে! কিন্তু তুমি এমন কিছুই করোনি। বরং তুমি শুধু নিজের দিকটা দেখেছো আর স্বার্থপরের মতো মুষ্ঠিমেয় মানুষের কথার জবাবে নিজেকে শেষ করে আমাকে শেষ করার পরিকল্পনা করেছো!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় নির্বাক চাহনিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
ঝিলিক:- আমি স্বার্থপর?
আনন্দ:- হ্যা তুমি স্বার্থপর! স্বার্থপর না হলে কিভাবে তুমি সুইসাইড করতে গিয়েছিলে? আমার কথা বাদই দিলাম একবার ভেবেছো তোমার মা বাবার কথা? তোমার কাছে সমাজের কিছু মানুষের কটু কথা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল যে তুমি তোমাকে ভালোবেসে আগলে রাখা প্রতিটি মানুষের কথাই ভুলে গেছো? শুধু মাত্র নিজেকে সব যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে! আচ্ছা তুমি কি সত্যিই মুক্তি পেতে?
ঝিলিক:- চুপ।
আনন্দ:- উত্তর নেই না! থাকবে কি করে! করেছো তো স্বার্থপরতা! তারপরও বলবে তুমি স্বার্থপর নও?
ঝিলিক:- চুপ!
পর্ব ১৬
ঝিলিক:- চুপ!
কথক:- অনেকটা সময় চলে যায় নিরবতায় । কেউ কারো সাথে কোন কথা বলছে না ।আনন্দ ঝিলিক দুইজন ছাদের দুই দিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ঝিলিকের ছোটবোন ছাদে এসে বলে সবাই ওদের নিচে ডাকছে। আনন্দ আসছে বলে ওকে চলে যেতে বলে। ঝিলিকের সামনে গিয়ে বলে,
আনন্দ:- চলো নিচে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আশাকরি সেখানে গিয়ে কোন উল্টাপাল্টা কথা বলবেনা। মনে হচ্ছে আমাদের বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়ে গেছে।
কথক:- ঝিলিক আনন্দের মুখে বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়ে গেছে এটা শুনে আনন্দের দিকে তাকালে আনন্দ বিদ্রুপের সুরে বলে,
আনন্দ:- তুমি কি ভেবেছিলে তোমার কথায় আমি ফিরে যাবো? উহুহ্, এতটাও সাধু না আমি! আমি তোমাকে ভালোবাসি আমার নিজের জন্য, সুতরাং তোমাকে কিভাবে আমার কাছে রাখতে হবে সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। তাই কোন কথা না বলে চুপচাপ নিচে গিয়ে একটু আগে সবার সামনে যেই ব্যবহার করেছো তার জন্য ক্ষমা চাইবে,আর অবশ্যই এই বিয়েতে যে তোমার মতামত আছে তাও জানিয়ে দিবে।ওকে!
কথক:- আনন্দের এহেন আচরণে ঝিলিক পুরোই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে মনে খুব রাগ হচ্ছে আনন্দের ওপর। ওর বিয়ে অথচ ওর মতামতেরই কোন দাম নেই। শুধু নিজের জন্যই নাকি বিয়ে করছে, আবার ওকে বলে স্বার্থপর। এক গুচ্ছ গালি ছুড়তে ইচ্ছা করছে কিন্তু কি আজব এখন কোন গালিও মনে পড়ছে না। ঝিলিকের ভাবনার মাঝেই আনন্দ( লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) ওর হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে ঘরের উদ্দেশ্যে এর মধ্যেই ঝিলিকের কথায় থমকে যায় পায়ের গতি কিন্তু পিছু ফিরে না কারন এর উত্তর দেওয়ার মতো কোন সদুত্তর নেই। ঝিলিক জিজ্ঞেস করল,
ঝিলিক:- আপনার মা বাবা স্বেচ্ছায় এই বিয়েতে রাজী হয়েছে নাকি আপনি তাদের জোর করেছেন বলেই রাজী হয়েছে?
কথক:- আনন্দের নিরবতা আবারও ঝিলিক কে হতাশ করতে চাইলেও হঠাৎ ই আনন্দের উত্তরে ঝিলিক খুশি হয়ে গেলো।
আনন্দ:- তোমার কাছে কি গুরুত্বপূর্ণ আমি না আমার আশেপাশের মানুষজন? জানিনা তবে আমার কাছে তুমি সুতরাং এতটুকু বিশ্বাস রাখতে পারো পুরো পৃথিবী তোমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি তোমার পাশে আছি থাকবো,শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে না যাওয়া অবধি।
কথক:- এর চেয়ে বড় আশ্বাস আর কি হতে পারে এটা ভেবেই ঝিলিকের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে আর তা দেখে আনন্দ বুঝতে পারে ঝিলিকের সম্মতি।
কথক:- হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ঝিলিকের ভাবনায় ছেদ পড়ে। এত সময় অনেক যুদ্ধ করে পুরো দশ হাজার টাকা গচ্ছা দিয়ে তারপর বেচারা নিজের ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু সব ক্লান্তি আর বিরক্ত মুহূর্তে গায়েব হয়ে গেছে খাটে বসে থাকা লাল টুকটুকে বউ দেখে। মনের অজান্তেই ঠোঁট প্রসন্ন হয়ে যায় যা প্রমান দেয় এক বিশাল প্রাপ্তির।হ্যা সে পেয়েছে প্রথম দেখায় ভালোলাগার সেই মায়াবতী কে,ধীরে ধীরে মনের গহীনে জায়গা দেওয়া প্রেয়সীকে। আজ সে তার বউ! "বউ" কথাটা ভাবতেই আনন্দের ভেতরে এক শীতল হাওয়া বয়ে গেল।আজ থেকে এই মেয়েটি শুধু তার। শুধুই তার। ভাবতেই হাসিটা আর চওড়া হলো।ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিছানার সামনে। আনন্দের আগমন বুঝতে পেরে ঝিলিক নিজেকে আরো গুটিয়ে নিলো,আর তা দেখে আনন্দের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি চাপলো,ও নিজের গলার স্বর মোটা করে মুখটা গম্ভীর করে বলে উঠলো,
আনন্দ:- কি ব্যাপার বসে আছো কেন? তোমাকে কি তোমার বাড়ির লোক কিছু শিখিয়ে দেয়নি!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের কথায় হকচকিয়ে গেল।ও বুঝতে পারল না আনন্দ কিসের কথা বলছে,আর আনন্দের গলাই বা এমন কেন শোনাচ্ছে! কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎই কিছু একটা ভেবেই মনে পড়লো বিয়ের পর বাসর ঘরে স্বামী আসলে প্রথমেই সালাম করতে হয়। কিন্তু আনন্দও(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) যে এমন কিছু আশা করবে সেটা ঝিলিকের আশা ছিল না।যাই হোক নিয়ম যেহেতু করতে তো হবেই। তাই ও ধীর পায়ে নিচে নেমে যেইনা আনন্দের পা ছোয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ে অমনি আনন্দ ওকে বাহু ধরে সোজা করিয়ে দেয়।
আনন্দ:- কি করছিলে তুমি?
ঝিলিক:- সালাম করছিলাম!
কথক:- লজ্জায় মাথা ও তুলতে পারছে না আর তা দেখে আনন্দ নিঃশব্দে হাসে,ঝিলিক কে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় আলতো চুমু দিয়ে তারপর বলে,
আনন্দ:- আর কখনো পায়ে হাত দিয়ে সালাম করবে না।তুমি জানোনা এটা ঠিক না!
ঝিলিক:- কিন্তু মুরব্বিরা তো বললো করতে হয়।
আনন্দ:- মুরব্বিরা বললেই কি ভুল ঠিক হয়ে যাবে! হবে না। আমাদের মাথা একমাত্র আল্লাহর কাছেই নত হবে আর কারো কাছে না। আর তাছাড়া তোমার জায়গা আমার বুকে পায়ে নয়। কি বলছি বুঝছো।
কথক:- ঝিলিক লজ্জ্বামিশ্রিত হাসি দিয়ে মাথা উপর নিচ করে। আনন্দ বুক থেকে সরিয়ে সোজা করিয়ে দাড় করিয়ে তারপর আরো একবার ঝিলিকের পা থেকে মাথা অবধি দেখে।ঝিলিকের কপালে একটা ভালোবাসার স্পর্শ দিয়ে তারপর বলে,
আনন্দ:- মাশাআল্লাহ! অনেক সুন্দর লাগছে।যাও ওযু করে আসো। একসাথে নামাজ আদায় করে নিজেদের জীবনের একটি নতুন শুরু করতে চাই।
কথক:- ঝিলিক ওযু করে আসার পর একসাথে দুজন নামাজ আদায় করে। তারপর কিছু সময় কিছু আমল করে। তারপর উঠে গিয়ে আনন্দ নিজের আর ঝিলিকের জন্য খাবার নিয়ে আসে।এই নিয়েও বাইরে অনেক হাসি তামাশা করে সবাই কিন্তু সেদিকে আনন্দ কোন কর্নপাত করেনি। বরং ঘরে এসে ঝিলিককে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছে। তারপর আবার নিজে গিয়েই সব কিছু রেখে আসে।এইসব দেখে আনন্দের মা পুরো হতভম্ব। যে ছেলে নিজে এক গ্লাস পানি ঢেলে খায় না সে এখন বৌ সেবা করছে। যদিও এতে উনি খুশি হয়েছেন এই ভেবে যে উনি নিজের ছেলেকে সঠিক শিক্ষায় মানুষ করতে পেরেছেন। আর এটাও খুব ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে তার ছেলে ঠিক কতটা ভালোবাসে ঝিলিক নামের এই মেয়েটিকে।এতে উনার অবশ্য কোন অসুবিধা নেই কারন যাতে ছেলে খুশি উনি তাতেই খুশি। তাই তো মানুষের কোন কথায়ই উনি কোন রকম শব্দ করছেন না। উনিও বুঝেন মানুষ যা খুশি বলুক সংসার উনার সুতরাং তার সংসারে সুখ কিভাবে স্থায়ী হবে সেটা সিদ্ধান্ত উনার উপরই নির্ভর করবে। অন্যের কথায় কান দিয়ে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে চান না। এমনিতেও একটি মাত্র ছেলে সেই ছেলে যদি কোন মেয়েকে ভালোবেসে সুখী হয় তাহলে তার চেয়ে খুশি আর কে হবে। ছেলে মেয়েদের সুখেই তো মা বাবার সুখ। আর ঝিলিক ও যথেষ্ট ভালো একটি মেয়ে। মেয়েটির জীবনে যা ঘটেছে তাতে নিতান্তই মেয়েটির কোন দোষ নেই সুতরাং তাহলে কেন মেয়েটি মানুষরুপী কিছু অমানুষের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করবে।
পর্ব ১৭
নতুন ভোরের মিষ্টি আলোয় আর পাখির কিচিরমিচির মিষ্টি ছন্দে চোখ মেলে তাকালো আনন্দ। নিজের ডান পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা তার বা পাঁজরের হাড়টাকে দেখে মুখে পরম প্রাপ্তির হাসিটা ফুটে উঠলো।আর একটু এগিয়ে কপালে আলতো ছোঁয়া দিতেই ঝিলিক একটু নড়েচড়ে আবারও আনন্দের বুকের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে নিলো। আনন্দ ও মুচকি হেসে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কিছু সময় পর ঝিলিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আর ভাবতে লাগলো এই মুহুর্তের জন্য কত কসরত করতে হয়েছে তাকে। ভেসে এলো ঝিলিকের সেই দিনের ঘটনা থেকে শুরু করে বিয়ে ঠিক হওয়া এমনকি ঐ নরকের কীটদের শাস্তি হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঝিলিকের ঐ ঘটনার পর কেটে যায় দুই মাস। আনন্দের চাকরি চলে যায়। কোম্পানির মালিকের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে কেস ফাইল করায় চাকরি চলে যায় । শুধু আনন্দের একার নয়। মাজেদ, সোহাগ সহ আরো কয়েকজনের,এমনকি স্বয়ং ম্যানেজার সাহেবেরও কারন উনি স্বেচ্ছায় সাক্ষী দিয়েছিলেন। মেহতাব মজুমদার এর সাথে সমান অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হন তার সহযোগী তামীম, আয়েশা, মেহতাব মজুমদারের পিয়ন, এবং আরো একজন সিকিউরিটি গার্ড। যে কিনা পিছনের দরজার ডিউটিতে থাকেন। আর তখন কোম্পানির এমডির দায়িত্ব নেন মেহতাব মজুমদারের বড় ছেলে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। এমনিতেই ঝিলিকের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সব কর্মীরা ক্ষেপে ছিলো তার মধ্যে আবার এক সাথে কোম্পানির এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের কর্মকর্তাদের বের করে দেওয়ায় শ্রমিকরা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে।এক পর্যায়ে সব রকমের কাজ বন্ধ করে অনশন করা শুরু করে দেয়। একটাই দাবি মেহতাব মজুমদার সহ সকল অপরাধীকে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। এক পর্যায়ে প্রশাসন বাধ্য হয়ে গার্মেন্টসে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং এতে করে বায়াররাও তাদের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। আর আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে মেহতাব মজুমদারের এবং তামীমের ল্যাপটপ। যেখানে তারা তাদের কুকর্ম রেকর্ড করে রেখেছিল গর্বের সহিত। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর সব তথ্য। তামীমের জন্য তদন্ত করতে গেলে বেরিয়ে আসে তামীমের জীবনের কালো একটি অধ্যায়। আয়েশার ও সমান ঘটনা। পিয়ন ও সিকিউরিটি গার্ড শুধু টাকার জন্যই নিরব ছিল।টাকা পেয়ে সব অন্যায় মুখ বুঝে দেখে গেছে। তদন্ত অফিসার যথেষ্ট সৎ আর ভালো মানুষ ছিল বলে ঝিলিকের পরিবারের সবাই এবং আনন্দ নিশ্চিত ছিলো যে ওরা সঠিক বিচার পাবে। এদিকে ঝিলিকের পিছনে সময় দিতে গিয়ে আনন্দের চাকরি চলে গেছে শুধু চাকরিই না ক্যারিয়ারের ক্ষতিও হচ্ছে, ভবিষ্যতে ভালো কোন চাকরি পাবে না বলেও আনন্দের পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়েন। আর যত যাই হোক একটা ধর্ষিতা মেয়েকে নিজের ছেলের বউ করতেও তারা নারাজ। যেভাবেই হোক,যেমনেই হোক,মেয়েটি ধর্ষিতা। আবার এখন তো ভাইরাল হয়ে গেছে। সুতরাং তারা জেনে-বুঝে এমন একটি মেয়েকে নিজেদের ঘরের বউ করতে চান না।আর তাই উনারা চান না আনন্দ ঝিলিকের পিছনে আর সময় নষ্ট করুক।সমাজ বলেও তো কথা আছে। যদি কোনভাবেই ছেলের সাথে ঝিলিকের জীবন জড়িয়ে যায় তাহলে তাদের একমাত্র ছেলে সারাজীবন তার মাশুল দিবে(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) কিন্তু তারা বাবা মা হয়ে কেন সেসব মেনে নিবেন? যদি টাকা দিয়ে সাহায্য করতে হয় তাহলে উনারা চেষ্টা করবেন সাহায্য করতে কিন্তু কোনভাবেই ছেলের জীবনের সাথে জড়াতে দিবেন না। এইসব ভেবেই উনারা আনন্দকে ঝিলিক থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। নানান সময় নানান রকম ইমোশনাল কথা বলে ব্ল্যাকমেইলিং করে । প্রথমে আনন্দ না বুঝতে পারলে ও পরে ঠিক ই বুঝতে পারে। এরপরে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। নিজের পরিবারের সাথে। নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিজের করার যুদ্ধ।পুরো পৃথিবীর মানুষের সাথে যেন অনিচ্ছুক এক নিরব যুদ্ধ। হ্যা আনন্দ যেদিন প্রথম ঝিলিকের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায় সেদিনের আগের দিনও ওর মা বাবা এই বিয়েতে রাজী ছিলো না। আনন্দের অনুরোধ আর অধম ইচ্ছার কাছে হার মেনেই এসেছিলো। ঝিলিক কিছুটা অনুধাবন করতে পেরেই বিয়েতে রাজী হচ্ছিলো না। কিন্তু আনন্দ এখানেও জিতে যায়। আনন্দ যখন বুঝতে পারলো যে ওর পরিবার ঝিলিক কে মেনে নিতে চাইছেনা আর তার জন্যই ওকে নিজেদের কাছে আটকে রাখার চেষ্টা করছে তখনই ও সবার অগোচরে বাড়ি ছেড়ে ঢাকা চলে আসে। এবং এখানে এসে জানায় যদি উনারা কোনদিন ঝিলিককে নিজের ছেলের বউ বানাতে রাজী হয় তবেই ও বাড়ি ফিরবে।না হলে কোনও দিন ও বাড়ি ফিরবে না।এই কথা শোনার পর আনন্দের মা খাওয়া-দাওয়া সব বাদ দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আনন্দকে বাধ্য করে বাড়ি ফিরে আসতে। আনন্দ মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে এবং বাবা-মার সার্বিক কথা চিন্তা করে বাড়িতে ফিরে তো আসে কিন্তু এখানে এসেও ও ওর সিদ্ধান্তে অটল থাকে। ও স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয় যদি বিয়ে করতে হয়, এই বাড়িতে কোন বউ আসে তাহলে অবশ্যই সে ঝিলিক হবে।তা না হলে ও সারাজীবন একাই কাটিয়ে দিবে। তবুও ও অন্য কাউকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে পারবে না। এতেও আনন্দের বাবা-মার টনক নড়েনা তারাও তাদের সিদ্ধান্তে অটল। আনন্দ বাবা মায়ের সাথে অভিমান করে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দরজা লাগিয়ে দেয়। অনেকেই বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু কারো কথাই ও কানে নেয় না। দরজাও খোলে না। খাওয়া দাওয়া একেবারেই বন্ধ করে ফেলে।এভাবেই কেটে যাচ্ছিল কয়েকটি দিন। আনন্দের মা বাবা ভেবেছিলো হয়তো দুএক দিন এমন অভিমান করে সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে রাখবে এক সময় ক্লান্ত হয়ে গেলে নিজেই নিজের জিদ থেকে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু না! টানা চারদিন যখন আনন্দ একদম নিজেকে গৃহবন্দি করে রাখলো তখন তাদের মনের মধ্যে ভয় ঢুকে গেল। তৃতীয় দিন অবধি ঘরের ভেতর আনন্দের চলাফেরার শব্দ পাওয়া গেলেও চতুর্থ দিন একদম চুপ হয়ে গেছে। উনারা আতংকগ্রস্ত হয়ে আনন্দের বড় চাচাতো ভাইদের ডেকে আনে।তারা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার পর দেখতে পেল আনন্দ বিছানায় পড়ে রয়েছে। সবাই ভয় পেয়ে যায়। আনন্দের মা কান্না শুরু করে দেয়। আনন্দের ভাইয়েরা কাছে গিয়ে বুঝতে পারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।উনারা তাড়াহুড়ো করে পরিচিত একজন ডাক্তারকে ফোন করে আসতে বলে। ডাক্তার এসে জানায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর না খেয়ে থাকার কারনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। ডাক্তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে হাতে স্যালাইন লাগিয়ে রেখে,সব কিছু বুঝিয়ে চলে যায়। আনন্দের মা আনন্দের মাথার সামনে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,
আনন্দের মা:- তোমার কাছে ঐ মেয়েটাই সব? আমাদের কোন গুরুত্ব নেই তোমার কাছে?
কথক:- আনন্দ কোন কথা না বলে মুখ অপরদিকে ঘুরিয়ে নেয়।এটা দেখে আনন্দের মা আরো জোরে কেঁদে দেয়। আনন্দ মুখটা অপরদিকে থাকা অবস্থাতেই বলে,
আনন্দ:- তোমাদের কাছেও তো নিজের সন্তানের খুশির চেয়ে সমাজের চিন্তা বেশি । একবার ভেবেছো যেই কারনে তোমরা ঝিলিক কে নিজের পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ সেই কারনটাই যদি কোনদিন আমাদের নিজের মেয়ের সাথে ঘটতো তাহলে কি হতো?
কথক:- আনন্দের এহেন কথায় মুহূর্তেই ঘরটা নিরবতায় ছেয়ে যায়। আনন্দ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- তখন যদি ওর ভালোবাসার মানুষটা ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে কি করতো ও? তখন ও কি তুমি এই একই ব্যবহার করতে,পারতে ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে? থাকতো সমাজের ভয়?
কথক:- সবাই চুপ।
আনন্দ:- তখন নিশ্চয়ই চাইতে তোমার মেয়ের জীবনের ও কোন গতি হোক। কেউ আসুক যে ওকে শক্ত করে আগলে রাখবে বাকীটা জীবন! তাহলে ঝিলিকের বেলায় সেটা কেন চাইতে পারছো না? কেন পারছো না ওর জীবনের এ বিষয়টিকে তুচ্ছ করে ওকে আপন অরে করে নিতে। পরের মেয়ে বলে?
কথক:- আনন্দের প্রশ্নে আনন্দের বাবা মায়ের মুখটা চুপসে যায়। আনন্দের বড় চাচাতো ভাই মাসুম, ও সবাইকে ইশারায় ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলে। আনন্দ কে শান্ত হতে বলে ওর মা বাবাকে নিয়ে বাইরে চলে যায়। আনন্দ ও আর কোনরকম কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। এমনিতেও এখন ঘুমের দরকার! শরীরে মনে দুটোই বড্ড ক্লান্ত। আনন্দের বড় চাচাতো ভাই মাসুম বাইরে এসে আনন্দের মা বাবাকে বোঝায় যাতে ওনারা ঝিলিক কে মেনে নেয়।এতে ছেলেও খুশি থাকবে আর সমাজেও তাদের মর্যাদা বাড়বে। তাছাড়া ধর্ষনের মতো জঘন্য বিষয়ে তো কোন মেয়ের হাত থাকে না তাহলে কেন একটি মেয়ে সারাজীবন এই বোঝা বয়ে বেড়াবে। আনন্দের মা-বাবাও ছেলের অবস্থা দেখে ঝিলিককেই নিজের ছেলের জন্য আনবেন বলে মনস্থির করে। অবশ্য উনারা এত তাড়াতাড়ি চাননি। কিন্তু আনন্দ আর একটু ও দেরি করতে চায়নি পাছে ওর মা বাবার মন আবার পাল্টে যায়।এই কারনেই পরের দিনই ঝিলিকদের বাসায় উপস্থিত হয়।এর পরে বিয়ে ঠিক হয় সেই দিনের থেকে ঠিক তিনমাস পরে। এর ও কারন ছিলো,এক ঝিলিকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তখনও খুব একটা ভালো নয় আর দুই আনন্দ তখন বেকার ছিলো, অন্তত কোনরকম চলার মতো করে হলেও একটা চাকরির দরকার তাই।আর তাছাড়া ঝিলিকের কেসের জন্য ও বিয়ের বিষয়টি একটু পরে করতে উপদেশ দেয় তদন্ত অফিসার কারন তখন মেহতাব মজুমদার সহ বাকী আসামীদের সম্পর্কে ভয়াবহ তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছিলো যাতে ঝিলিকের কেসটি দ্রুত সমাধান হয় আর এতে সাহায্য করেছিলো স্বয়ং আনন্দ নিজে। আর এমনিতেও ঝিলিকদের প্রস্তুতির সুবিধার্থে আনন্দ ইচ্ছে করেই বিয়ের তারিখ টা একটু পিছিয়ে দিয়েছে। অতিতের ভাবনার জগতে যখন আনন্দের বসবাস ঠিক তখনই ঝিলিকের মৃদু আওয়াজে বর্তমানে ফিরে এসে। ঝিলিক কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু আনন্দ বুঝতে না পেরে হালকা হেসে ঝিলিককে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে জানতে চাইলো ঝিলিক কি বলেছিলো? ঝিলিক ও আনন্দের বুকের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বললো,
ঝিলিক:- কয়টা বাজে?
আনন্দ:- বেশি না মাত্র সাড়ে আটটা মেবি!
কথক:-ঝিলিক চমকে উঠে বলে,
ঝিলিক:- কিহ্! এত বেলা হয়ে গেছে?
কথক:- আনন্দ ভ্রু কুঁচকে ফেলে,
আনন্দ:- হ্যা তো কি হয়েছে?
ঝিলিক:- কি হয়েছে মানে? আমি নতুন বউ! আর নতুন বউ এত ঘুমায় নাকি, মানুষ কি বলবে!?
কথক:- ঝিলিক কাঁদো কাঁদো হয়ে, আনন্দের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে কথাগুলো বলে, আনন্দ ঝিলিক কে আরো শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে নিতে বলে ,
আনন্দ:- ডোন্ট প্যানিক! কুল! কেউ কিছু বলবে না! তুমি নতুন বউ সুতরাং তোমার এখন রুমেই বেশি কাজ!
কথক:- আনন্দ শেষের কথাটি দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বললো,ঝিলিক বুঝতে পেরে আনন্দের পেটে চিমটি কাটলেই আনন্দ ছেড়ে দেয়। নিজের পেটে হাত বুলাতে বুলাতে ঝিলিকের দিকে চোখ ছোট করে তাকায়, ঝিলিক একটা ভেংচি কেটে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে আনন্দ ঝিলিকের সংসার জীবনের আরো পাঁচটি মাস! ভালোবাসা, অভিমান, খুনসুটি করতে করতেই পাঁচটি মাস কিভাবে অতিক্রম হয়ে গেছে তা যেন ওদের অনুধাবনেরই সময় দিলো না।তবে ঝিলিক বুঝে গেছে আনন্দ নামক পুরুষটি ওকে অসম্ভব ভালোবাসে। আর আনন্দের পরিবার তাদের ভালোবাসা,স্নেহ মায়া দিয়ে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ঝিলিকের জীবনের কুৎসিত ঘটনাটাকে। আজ ঝিলিক স্বপরিবারে কোর্টে যাবে কারন আজ ওর কেসের রায় ঘোষণা করা হবে।
পর্ব ১৮
কোর্ট চত্বরে সাংবাদিকদের ভীড় তার সাথে রয়েছে অজস্র সাধারণ মানুষ। দেশের চলমান ঘটনার মাঝেই যেটা প্রায় বছর ধরেই "টক অফ দা কান্ট্রি" আজ তার রায় ঘোষণা।এমন একটি ঘটনার রায় যে এত তাড়াতাড়ি দেয়া হচ্ছে সেটা নিয়েও জনগনের মাঝে রয়েছে খুশি ও উচ্ছ্বাসের ঢেউ। আর তার সাথে রয়েছে প্রশাসনিকভাবে কড়া পাহারার ব্যবস্থা যাতে করে জনগণের মাঝে কোনরকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়। ঝিলিক ও আনন্দ নিজেদের উকিলের সাথেই আছে। আর বাইরে অপেক্ষায় আছে ওদের পরিবার সহ মাজেদ,সোহাগ সহ গার্মেন্টসের অধিকাংশ কর্মচারী। জজ সাহেব বিচারকের আসনে বসার সাথে সাথেই পুরো রুমে নিরবতা পালনের মাঝেই তাকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে শুরু হলো বিচার কার্যক্রম।
আমরা মানুষ! সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি! "আশরাফুল মাখলুকাত" উপরওয়ালা আমাদের জ্ঞানের কারনেই সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষনা করেছেন। বুদ্ধি বিবেচনা দিয়েই পৃথিবীতে বিচরনের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। নিজেদের বুদ্ধি কে কাজে লাগিয়ে ঠিক বেঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু হায় আফসোস! আমরা মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হলেও আমাদের কাজকর্ম আজকাল চারপেয়ে পশুর চেয়েও নিম্নমানের। আমাদের হিংস্রতার কাছে বনের ভয়ংকর পশুও হয়তো ভয় পায়। যেখানে আমাদের একে অপরের প্রয়োজনের জন্য সৃষ্টি করেছেন,একে অপরের পাশে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সেখানে আমার একজন আরেকজনের জন্য ক্ষতি কারন হয়ে দাড়িয়েছি। আর সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট কিংবা দুর্বলেরা ।আমরা যারা সবল আর সক্ষম তারা আজকাল সহজ ও নিরীহ মানুষের কাছে আতংকের কারন হয়ে দাড়িয়েছি! যেটা মহান রাব্বুল আলামীন একদমই পছন্দ করেন না। কিন্তু ঐ যে উপরওয়ালা ছাড় দিয়েছেন তবে ছেড়ে দেননি। তার সময় মতো ঠিক তিনি চেপে ধরেন টুটি। প্রতিটি কাজের জন্য একদিন সমস্ত কর্মের হিসাব দিতে হবে। বুঝিয়ে দেওয়া হবে পাপ পূণ্যের ফলাফল! সেটা হোক দুদিন আগে কিংবা পরে। হোক ইহকালে কিংবা পরকালে! আসলে ইহকাল পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহি করতে হয়,পেতেই হয় প্রাপ্য কৃতকর্মের ফল! হয়তো কোনটা দৃষ্টির অগোচরে,কোনটা দৃষ্টির গোচরেই। তবে বিচার ঠিকই হয়। শুধু তার জন্য একটু ধৈর্য্য ধারণ করতে হয় ক্ষতিগ্রস্তকে!
ঝিলিকের উকিলের অতি দক্ষতা, তদন্ত অফিসারের একনিষ্ঠ ভাবে কাজ করা এবং সততার কারনে এবং সব রকমের চাক্ষুস প্রমানের ভিত্তিই যথেষ্ট ছিলো অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য কিন্তু এর চেয়ে বেশি ভয়ংকর কিছু তথ্য মিলেছে মেহতাব মজুমদার, তামীম এবং আয়েশার বিরুদ্ধে যেটার কারন এখন এই কেসটা শুধু ঝিলিকের একার নয় এর সাথে আরো অনেক মানুষের হয়ে গেছে।বলা যায় এটা এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।এই কেসের জন্য সরকারিভাবে আইনি সহায়তা পাচ্ছে ঝিলিকসহ একাধিক ভুক্তভোগী।
মেহতাব মজুমদার একজন ভয়ংকর মানুষ।তার অত্যাধিক এবং ভয়াবহ রকম যৌন চাহিদা।যার দরুন তার কাছে তার স্ত্রীও একরকম জোর জবরদস্তির শিকার হতো এক সময়ে। যখন থেকে সে তার স্ত্রীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত খুশি হতে পারতো না তখন থেকেই বাইরে নিজের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতো।প্রথমে প্রথমে বিভিন্ন এসকর্ট,যৌন কর্মীকে নিয়ে নানান ভিআইপি হোটেলে সময় কাটালেও,এক সময় সোজা নিজেই চলে যেতো পতিতালয় গুলোতে।কারন ততদিনে তার মনটা আরো বিকৃতি আকার ধারন করেছিলো যার দরুন এক নারীতে সে সন্তষ্ট হতে পারতো না।রোজ নতুন কাউকে চাইতো।তাই পতিতালয় চলে যেতো যাতে করে নিজের মতো একেক দিন একেক জনকে নিজের বেড পার্টনার হিসেবে বেছে নিতে পারে। এরকমই চলছিলো তার দিনকাল। হঠাৎ করেই সে একদিন গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়।তখন থেকেই সে নিজের রেপুটেশনের চিন্তায় পতিতালয় যাওয়া বন্ধ করলেও প্রায়ই বিদেশে গিয়ে নিজের মতো করে সময় কাটাতো। আর তখনই মেহতাব মজুমদার কিছু নারী ও শিশু পাচারকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীর সাথে জড়িয়ে যায়।কিন্তু এর মধ্যেই বিপদ ঘটে অন্যত্র। তার দৈনন্দিন জীবনের প্রভাব পড়তে শুরু করে ব্যবসায়িক জীবনে তার সাথে প্রশ্ন উঠে নিজের সভাপতিত্বে! তবে উনি ব্যবসা আর নিজের পজিশন নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ছিলো আর তাইতো নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এই নোংরা অন্ধকার দিকটা কখনো কারো চোখে পড়তেই দেয় নাই। বিশেষ করে নিজের কোম্পানিতে। যেখানে কয়েকশো মেয়ে কাজ করতো। তার এই চরিত্রের কথা শুধু তার স্ত্রীই জানে। কিন্তু বিপত্তি তখন থেকেই শুরু যখন থেকে নিজের পজিশনের চিন্তায় পতিতালয় কিংবা অন্যান্য উপায়ে অনৈতিক কাজে নারীদের সাথে মেলামেশা বন্ধ করে।এমন করেই কিছুদিন চলে যাওয়ার পর একদিন বিকেলের সময় সে নিজের চেয়ারে বসে ল্যাপটপে অশ্লীল ভিডিও দেখছিলো।ঠিক সেই সময়ই দরজায় নক করে পিয়ন জানায় একজন স্টাফ দেখা করতে চায়। প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে যখন শুনতে পায় একটি মেয়ে জরুরী কোন কথা বলবে তখন কি মনে করেই যেন মেয়েটিকে ভেতরে ঢুকার অনুমতি দেয়। মেয়েটি সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা ইতস্ততভাবে মেহতাব মজুমদারের সামনে দাড়ায়। তখনও ল্যাপটপে অশ্লীল ভিডিও চলছিলো আর তা থেকে অদ্ভুত বাজে শব্দ আসছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মেহতাব মজুমদার সেদিকে কোনরকম ধ্যান না দিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো ,তার চাহনি দেখেই মেয়েটার অসস্থি লাগতে শুরু করে। মেহতাব মজুমদার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নিজেই বলতে শুরু করে,
মেহতাব মজুমদার:- কি নাম!
মেয়েটি নিজের নাম বললে, মেহতাব মজুমদার তার প্রয়োজন জানতে চায়,মেয়েটি জানায় তার বাবা অসুস্থ তার প্রায় ৫০,০০০ হাজার টাকা লোন লাগবে। এই কথা শোনার পরই মেহতাব মজুমদারের ঠোঁটের কোনে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠে।সে মেয়েটির দুর্বলতা বুঝতে পেরে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা জঘন্য দিকটা প্রকাশ করলো । মেয়েটির কাছে প্রস্তাব রাখলো সে টাকা দিবে কিন্তু তার পরিবর্তে তাকেও তার জন্য কিছু করতে হবে।মেয়েটি কিছু না বুঝেই রাজী হয়ে যায়। মেহতাব মজুমদারও খুশি হয়ে যায়। সে মেয়েটিকে বলে তার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে সেখানে গেলেই টাকা দিয়ে দিবে। মেয়েটিও হিতাহিত জ্ঞান ভুলে মেহতাব মজুমদারের সাথে চলে যায়। সেখানে যাওয়ার পর লোন দেওয়ার নাম করে একটি কাগজে মেয়েটির টিপ সই রেখে দেয় যেহেতু মেয়েটি পড়াশোনা জানতো না সেহেতু সরল মনেই সই দিয়ে দেয়। এরপর মেয়েটার সাথে জোরজবরদস্তি করে এবং সেটার ভিডিও করে রাখে। নিজের কাজ শেষে মেয়েটাকে হুমকি দেয়,যদি এই কথা কোনভাবেই বাইরের কেউ জানে তাহলে মেয়েটার এবং তার পরিবারের ক্ষতি করে দিবে। এবং সেই টিপ ছাপ দেওয়া কাগজটি বের করে পড়ে শোনায় যাতে স্পষ্ট লেখা ছিলো,"মেয়েটি একটি যৌনকর্মী। টাকার বিনিময়ে পুরুষের সাথে সময় কাটানোই তার পেশা। সে প্রথমে বড়লোক পুরুষ মানুষ ধরে তাদের নিজের প্রতি আকর্ষিত করে তারপর টাকার বিনিময়ে সময় কাটিয়ে গোপন মূহূর্তের ভিডিও ও ছবি নিয়ে পরে সেই সকল পুরুষদের ব্লাকমেইল করে অঢেল অর্থ হাতিয়ে নেয়।" এই কথা শোনার পর মেয়েটি বারবার আকুতি মিনতি করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার বলে সেতো এমন কিছু করেনি,আর তার সাথে যা ঘটেছে তাও কাউকে বলবে না তবুও তাকে যেন ছেড়ে দেয় কিন্তু মেহতাব মজুমদারের মনে মেয়েটার জন্য দয়া হয়নি।এর পরেও পুরো তিনদিন মেয়েটিকে নিজের গোপন রুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে। তারপর মেয়েটিকে ছেড়ে দিলে সেই মেয়েটি আত্মহত্যা করে কারণ ততদিনে মেয়েটির তিন দিন তিন রাত ঘরের বাইরে থাকার জন্য সামাজিক এবং পারিবারিক ভাবে হেনস্থা হতে হয়। তার সাথে নিজের সাথে ঘটা ঘটনাটিকে মেনে নিতে না পেরেই আত্নহত্যা করে।আর এদিকে মেহতাব মজুমদারের সাহসও বেড়ে যায় এবং তার মনে আরো একটি কুৎসিত ভাবনা আসে আর তা হলো স্বেচ্ছায় শারীরিক মিলনের চেয়ে জোর জবরদস্তিতে শারীরিক মিলন বেশি উপভোগ করা যায়।এতে করে নিজেকে সবল আর ভুক্তভোগীকে দুর্বল প্রমান করা যায়। এরপরেই সে নিজের ক্ষুধা মেটাতে বেছে নেয় নিজের কোম্পানীর অসহায় মেয়েদের।যার দিকে তার দৃষ্টি পড়তো তাকেই সে নিজের কাছে রেখে কাজ শেখানোর আগ্রহ দেখাতো। আর সেই সুযোগেই মেয়েদের ক্ষতি করতো।এর মধ্যে কয়েকজন ছিল যারা স্বেচ্ছায় নিজেকে বিলিয়ে দিতো টাকার বিনিময়ে। যারা টাকার বিনিময়ে রাজী হতো তাদের কোন ক্ষতি করতো না তবে ভিডিও রেখে দিতো গোপনে যাতে ভবিষ্যতে তার ক্ষতি না করতে পারে। আর যাদের সাথে জোর করতো তাদের নিজের ইচ্ছে মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করতো।কয়েকদিন রাখার পর ভিডিও ও ছবি রেখে মেয়েটিকে ছেড়ে দিতো তার সাথে মেরে ফেলার, সামাজিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার,এমনকি পরিবারের ক্ষতি করার ভয়ও দেখাতো যার কারনে কোন মেয়ে প্রতিবাদ করার সাহস করতো না। এর মধ্যেই মেহতাব মজুমদারের পার্সোনাল সেক্রেটারী হিসেবে চাকরি হয় তামীমের । মেহতাব মজুমদার যত কুকর্ম করতো পুরোটাই অফিসের বাইরে। কিন্তু তামীম বুঝতো তার বসের চরিত্রে সমস্যা আছে। শুধু আছে বললে ভুল হবে বড় রকমের সমস্যা আছে। অবশ্য একজন খারাপই আরেকজন খারাপকে চেনে।ঠিক তেমনি তামীমও। এবার চলুন তামীম সম্পর্কে জেনে আসা যাক।
পর্ব ১৯
তামীম প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে উঠা মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। গ্রামেই এসএসসি এবং এইচএসসি পাশ করেছে এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকা শহরে আসে। তামীম ছোট বেলা থেকেই প্রচন্ড জ্বালাতো গ্রামের মানুষকে। ছোট বেলা থেকেই নেশা করতো, মারামারিতে লিপ্ত থাকতো, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতো। শহরে আসার পর বন্ধুত্ব হয় ভার্সিটির কিছু নেশাগ্রস্ত ছেলেদের সাথে যার দরুন পুরো দমে বখে যায়। এভাবেই ধীরে ধীরে পরিচয় হয় মাদক ডিলারদের সাথে। প্রায়ই এদিকে সেদিকে মাদক বিক্রি করে।এমনি একবার ছুটিতে গ্রামে যায় বেড়াতে। ঘটনাক্রমে বেড়াতে যায় নিজের ছোট খালার বাসায়, সেখানে গিয়ে দেখে তার খালা বাসায় নাই। পাশেই খালার ছোট মেয়ের রুম। মেয়েটির বয়স হয়তো পনেরো হবে। হঠাৎই মনে কুবুদ্ধির উপস্থিত হয়।উঁকি দিয়ে দেখে রুমটা ফাঁকা।ভেতরে গিয়ে এদিক সেদিক দেখতে লাগলো।এর মধ্যে ছোট খালার মেয়েটি রুমে ঢুকে।তামীমকে ভেতরে দেখেই মেয়েটি আঁতকে উঠে কারন তামীমের যে দৃষ্টি ভালো না তা ও খুব ভালো করেই জানে।আবার এদিকে ওর মাও বাসায় নেই। তামীম ওকে দেখেই একটা শয়তানি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
তামীম:- কেমন আছিস?
লাবিবা( তামীমের খালাতো বোন) :- ভা-ভা-ভালো!
তামীম:- তোতলাচ্ছিস কেন?
লাবীবা:- ক-ক-কই তোতলাচ্ছি?
তামীম:- তুই কি ভয় পাচ্ছিস?
লাবীবা:- না-নাহ ! কেন ভয় পাবো!
কথক:- তামীম কে দেখে আসলেই লাবীবা ভয় পাচ্ছে আর তাই কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তামীম বুঝতে পেরে লাবীবাকে আরো ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। বারবার বিচ্ছিরি দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।লাবীবা মাত্র গোসল করে এসেছে তাই ওর চুল ভেজা মুখ মন্ডলেও এখনো বিন্দু বিন্দু পানির ছিটা । ও বারবার নিজের জামা ,ওড়না ঠিক করছে।আর তামীম তার লোলুপ দৃষ্টিও সেদিকে রেখেছে এটা দেখে বাচ্চা মেয়েটি আরো ভয় পাচ্ছে। তামীম এইবার বলে,
তামীম:- তুই তো দেখছি একদম বড় হয়ে গিয়েছিস। একেবারে খাশা! তোকে তো বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত! দেয়না কেন? প্রেম টেম করিস নাকি? যেই হট আর সেক্সি হয়েছিস(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার) আমার তো মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাহলে তুই কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করিস?
কথক:- তামীমের এরুপ কথায় মেয়েটা অসস্থি আর ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। আবার এদিকে পুরো ঘরে শুধু ওরা দুজন। আশেপাশের বাড়িগুলো ওদের বাড়ি থেকে অনেক দুরে। তামীমের খালারা মুলত একটা চরের মধ্যে বাড়ি বানিয়েছেন।যার দরুন প্রতিবেশী বাড়িগুলো অনেক দুরে দুরে। আর তামীম এই সুযোগটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তামীম জেনেই এসেছে ওর খালা আজ বাসায় থাকবে না। দুপুরের একটু আগে তামীম ওর মায়ের ফোনে ওর খালার কথা শুনতে পায় ,ওর খালা ওর মাকে বলছিলো সে আজ তার বড় মেয়ের বাসায় যাবে আসতে আসতে অনেক রাত হতে পারে। লাবীবা বাসায় একা থাকবে। তাই রাতের মধ্যেই চলে আসবে। ওর খালার কথা শুনে তামীম বুঝতে পারে লাবীবা মানে ওর ছোট খালার মেয়ে, যার প্রতি ওর দৃষ্টি অনেক আগে থেকেই পড়েছিলো, শুধু মাত্র মেয়েটি নিতান্তই বাচ্চা আর আত্নীয়দের মধ্যে বলে কিছু করতে পারছে না। একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজের রুমে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে থাকে। সিগারেট শেষ করে কিছু মাদক নিয়ে বসে।গ্রামে এসেও বেশ কিছু কাস্টমার পেয়েছে। কিন্তু তার আগে নিজেই একটু নিয়ে নেয়।এত কিছুর মাঝেও লাবীবা বাসায় একা এই কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনিতেই লাবীবাকে নিয়ে কুৎসিত ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার উপর এখন পুরোদমে নেশাগ্রস্ত তাই সব ছেড়েছুড়ে চলে যায় ছোট খালার বাসায়।আজ লাবীবাকে তার চাই-ই। তামীমের কথায় লাবীবা ভয়ে দরজা দিয়ে বের হয়ে যেতে নিলেই তামীম উঠে খপ করে লাবীবার হাত ধরে ফেলে,এরপর একটানে লাবীবাকে বিছানায় ছুড়ে মারে,দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে লাবীবার দিকে আগাতে দেখেই লাবীবা জোরে কান্না করে দেয়। তামীম দৌড়ে গিয়ে লাবীবার ওড়না দিয়ে লাবীবার মুখ বেঁধে ফেলে,মাথায় থাকা গামছাটা দিয়ে ওর হাত বেঁধে ফেলে। পুরো ঘরে লাবীবার নিরব আত্নচিৎকার আর তামীমের নিস্বংসতা ছাড়া কিছুই ছিলো না। এই ঘটনার পর পরই তামীম গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসে কারন লাবীবার বাবার গ্রামে বেশ আধিপত্য ছিলো। লাবীবার বাবা মা তামীমের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিতে চাইলে তামীমের মায়ের আকুতিতে আর নিজেদের মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে প্রথমে কিছু করতে চায়নি, তবে গ্রামের কর্তাদের কথায় আর সচেতন মানুষের বুদ্ধিতে তামীমের বিরুদ্ধে মামলা করলে পুলিশ তামীমকে ফেরারি ঘোষনা করে এরপর থেকেই তামীম একরকম গা ঢাকা দিয়ে শহরে লুকিয়ে আছে। তামীমের জন্য লাবীবাকে বৌ করে আনতে চাইলে লাবীবার মা বাবা নিষেধ করে ,এমন দুঃশ্চরিত্র ছেলের কাছে মেয়ে দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বেরিয়ে আসে গ্রামে তামীমের মাদক ব্যবসার কথা। মাদকের জন্যও মামলা হয়। তারপরই তামীম কয়েক বছর এদিকসেদিক ঘুরে এক বন্ধুর মাধ্যমে এই চাকরিটা পেয়েছে। কিন্তু কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না,এদের সারাজীবন বেঁধে রাখলেও বাকাঁই থাকে। তামীমের বেলায়ও তাই ।ও ওর বসের কাজকর্ম দেখেই চিনে ফেলেছে যে সেও তার মতোই দুঃশ্চরিত্রের। কিন্তু প্রমানসহ ধরার অপেক্ষায় আছে। আর সেই সুযোগ ও এসে পড়ে একদিন।
তামীম কাজে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরের ঘটনা,
তামীম কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ম্যানেজারের কাছে থেকে সই করিয়ে নিয়ে আসছিলো।তখন দুপুরের খাবারের সময়। সবাই লাঞ্চে গেছে।তামীম বসের কেবিনে ঢোকার জন্য অনুমতি চাওয়ার জন্য দরজায় নক করে তার কিছু সময় পরেই একটি মেয়ে বের হয়ে আসে,মেয়েটার মুখশ্রীতে ভয়ের ছাপ। তামীম কিছু সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে কি হয়েছে। কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য বসের কেবিনে ঢুকে বসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মেহতাব মজুমদার তামীমকে দেখে কিছুটা নড়েচড়ে বসে, তার পোশাকের এলোমেলো ভাবই বলে দিচ্ছে এখানে অপ্রীতিকর কিছু একটা হতে যাচ্ছিলো।তামীম বুঝেও না বোঝার ভান করে নিজের কাজ শেষ করে সেখান থেকে চলে আসে। সন্ধ্যায় মেহতাব মজুমদার তামীমকে কাজে বাইরে পাঠিয়ে দেয় ।রাত সাড়ে আটটার দিকে তামীম অফিসে ফিরে আসে। কিছু একটা মনে করে কোনরকম অনুমতি ছাড়াই দরজা খুলে থ মেরে দাঁড়িয়ে যায়! ভেতরে সেই মেয়েটি, ফ্লোরে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছে, যাকে সকালে ভয়ার্ত চোখে বের হয়ে যেতে দেখেছিলো।তার সাথে বসকে এরকম অবস্থায় দেখে কিছুক্ষণের জন্য থম মেরে দাড়িয়ে থাকে। মেহতাব মজুমদারের গর্জনে তামীম হুশে আসে। অনুমতি ছাড়া প্রবেশের কারনে মেহতাব মজুমদার যথেষ্টই বিরক্ত তার উপর। তামীম মাথা নুইয়ে বলে,
তামীম:- সরি স্যার!
কথক:-মেহতাব মজুমদার কিছুটা দমে গিয়ে তামীমের কাঁধে রেখে বলে,
মেহতাব মজুমদার:- যা দেখেছো তা নিজের মধ্যেই রাখো কাউকে বলো না ।আমি তোমাকে খুশি করবো।
কথক:- তামীম একটা বাকা হাসি দেয় সেতো এটাই চেয়েছিল!
কথক:- মেহতাব মজুমদার কাপড় ঠিক করতে করতে তামীমকে চোখের ইশারায় মেয়েটার দিকে দেখিয়ে বলে,
মেহতাব মজুমদার:- মেয়েটাকে তুলো, হুঁশ ফেরাও!
কথক:- তামীম মেয়েটার কাছে গিয়ে হাত ধরে ডাকার চেষ্টা করে কিন্তু কোনরকম সাড়া না পেয়ে পানির ছিটা দিয়ে হুশ ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শরীরে ধাক্কা দিয়ে বুঝতে পারে মেয়েটা মারা গেছে।ও চমকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। ভয়ার্ত চোখে মেহতাব মজুমদারকে জানায় মেয়েটা মারা গেছে।এই কথা শুনে মেহতাব মজুমদার ঘাবড়ে যায়।যদি এই কথা কোন ভাবে বাইরে যায় তাহলে তার ফ্রেম, রেপুটেশন, পজিশন সব হারাবে। তামীম প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও বসের ভয়ার্ত চেহারা দেখে ওর শয়তানী মস্তিষ্ক কাজ করা শুরু করে দেয়। ও এখন বসকে খুশি করে নিজেকে বিশ্বস্ত প্রমান করে নিজের একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে একটা চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করতে চাইছে।যেটা এখন ও চাইলেই বসের থেকে আদায় করতে পারে। ও মেহতাব মজুমদারকে আশ্বস্ত করে জানায়,
তামীম:- স্যার আপনি চিন্তা করবেন না।আমি দেখি কি করা যায়!
কথক:-মেহতাব মজুমদার তামীমের আশ্বাসে সাহস পেয়ে ওর হাত ধরে অনুরোধ করে বলে,
মেহতাব মজুমদার:- প্লিজ কিছু করো,এই কথা যদি বাইরে যায় তাহলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে। তুমি প্লিজ কিছু একটা করো।দেখো আমি তোমাকে খুশি করে দিবো তুমি যত টাকা চাইবে তাই দিবো। তবুও তুমি আমাকে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি দাও!
কথক:- তামীম বসের কথায় সায় দিয়ে,তাকে আশ্বস্ত করে কিছু সময় নিয়ে কিছু একটা ভাবে তারপর মেয়েটার লাশটা পাঁজাকোলে তুলে টেবিলের পাশে টেবিলের সাথে(লেখিকা শেখ রীমা আক্তার )লাগোয়া দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে বসিয়ে রাখে। এরপর বসকে বলে ফ্রেশ হয়ে চলে যেতে। মেহতাব মজুমদার বুঝতে পারছেনা তামীম ঠিক কি করতে চাইছে। তবুও কিছু না বলে তামীমের কথা অনুযায়ী কাজ করতে লাগে। তামীম সবাইকে জানায় বস চলে গেছে। যেহেতু বস চলে গেছে সেহেতু বসের কেবিনে কারো কোন কাজ নাই। সুতরাং আপাতত কিছু সময়ের জন্য নিরাপদ। রাত যখন সাড়ে বারোটার দিকে।তখন তামীম একটা বস্তা নিয়ে মেয়েটির লাশ সেই বস্তায় ঢুকিয়ে টেনে হিচড়ে লিফ্টের কাছাকাছি নিয়ে আসে। তারপর লিফট দিয়ে নিচে নামিয়ে পিছনের দরজার দাড়োয়ানের সাহায্যে কোম্পানির জুট/ বজ্য ফেলানোর জন্য ব্যবহৃত একটা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যায়। গাজীপুর ছাড়িয়েও বেশ দুরে ঘন জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসে। তামীম সেদিন টাকা দিয়েই কিনে নিয়েছিলো দাড়োয়ানকে যদিও দাড়োয়ান জানতো না সেই বস্তায় কি ছিলো তবুও তো বুঝতে পেরেছিলো নিশ্চিত এমন কিছু আছে বস্তায় যার দরুন পিছনের দরজা ব্যবহৃত হচ্ছে। অবৈধ বা গোপনীয় কিছু তাই সেও সুযোগের পুরো ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেখান থেকেই শুরু তামীম আর মেহতাব মজুমদারের এই নোংরা খেলা। তামীম শুধু টাকা নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং সেও মেয়েদের সাথে একই কাজ করতো। এবং গোপনে মেহতাব মজুমদার আর মেয়েদের ভিডিও করে নিজের কাছে রেখে দিতো যাতে নিজের সময় মতো সেগুলো ব্যবহার করে মেহতাব মজুমদার কে ফাঁসাতে পারে, এছাড়া এইসব ভিডিও দেখিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো ভুক্তভোগী মেয়েদের থেকেও টাকা হাতিয়ে নেওয়া, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যখন তখন মেয়েদের শারীরিকভাবে হেনস্থা করাও ছিল তার পৈচাশিক কাজের আরেকটা ধরন। এসব বেশিরভাগ মেয়েই মুখ বুজে সহ্য করতো,আর যারা না পারতো তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এভাবেই সখ্যতা হয় আয়েশার সাথে। আয়েশা এই গার্মেন্টসের একজন সাধারণ হেল্পার থেকে কাজ করে যখন সুপার ভাইজার হিসেবে পদোন্নতি পায় তখনই তার দৃষ্টি পড়ে বসের লোলুপ নজরে। আয়েশা সম্পূর্ণরূপে একজন ব্যাভিচারিনী!
চলুন একবার আয়েশার ইতিহাস দেখে নেই!
আয়েশা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান । বাবা রিক্সাচালক,মা কখনো অন্যের বাসায় কাজ করে, অথবা কখনো কারখানায় কাজ করেই তাদের সংসার চলতো। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিন বোন দুই ভাই।আয়েশা বোনদের মধ্যে মেজো, ভাইবোনের মধ্যে সেজো। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।বড় ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকে। তাদের খোঁজখবর তেমন নেয়না,সংসারেও টাকা পয়সা দেয় না। আয়েশার যখন মাত্র ১৫ বছর তখন আয়েশা গার্মেন্টসের কাজে যোগ দেয় । আয়েশার বড় বোনের তখন মাত্র বিয়ে হয়। আয়েশার বোন জামাই জাহাঙ্গীরও গার্মেন্টসে চাকরি করতো।সেই লাগিয়ে দিয়েছিল কাজে আয়েশাকে। একসাথে কাজে যাওয়া আসা করতে করতেই আয়েশার সাথে তার দুলাভাইয়ের একটা অবৈধ সম্পর্ক তৈরি হয় ।প্রায়ই দুজন এদিক ওদিক গিয়ে একান্ত সময় কাটাতো। এই খবর যখন জানাজানি হয় তখন আয়েশা সরাসরি তার পরিবারকে জানায় সে তার দুলাভাইকে বিয়ে করতে চায়। এতে পরিবারের সবাই তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে যায়।তার বাবা জোর করে তাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সে তার দুলাভাইকে জোর করে তাকে বিয়ে করার জন্য কিন্তু জাহাঙ্গীর অস্বীকার করে বিয়ে করতে। ওদিকে আয়েশার সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখার জন্য আয়েশার বোন তার স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিলে জাহাঙ্গীর ডিভোর্স দিতে রাজী হয় না। এদিকে আবার আয়েশাও জাহাঙ্গীরকে ছাড়তে রাজী হয় না। নিজের বোনের সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে তাতেও ওর কোন অনুশোচনা নেই। এরপর একরকম জোর করেই অন্যত্র বিয়ে দিলে সেই সংসারও বেশি দিন টেকেনি। মাত্র ৫ মাসের মাথায় ডিভোর্স হয়ে যায়। কারন ছিল আয়েশার উচ্ছৃঙ্খলতা। আয়েশার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আয়েশার পরিবার আর জাহাঙ্গীর মানে ওর বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অনেক বোঝানোর পর আয়েশার বড় বোন স্বামীর সংসারে যেতে রাজী হয়। আয়েশার বিয়ের তিন/ চার মাস অবধি সবকিছু ভালোই ছিলো ওর বোনের সংসারে। কিন্তু আয়েশার বেপরোয়া চিন্তা আর কাজকর্ম বেশিদিন ভালো থাকতে দেয়নি। আয়েশার স্বামীও খুব একটা স্বচ্ছল ছিলো না। তাই আয়েশা সংসারে প্রচন্ড অশান্তি করতো। ফোনে, সরাসরি বিভিন্ন উপায়ে বিভিন্ন ছেলেদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতো, ছেলেদের থেকে নানান জিনিস আদায় করে নিতো। টাকার জন্যই বিয়ের পরপরই আবারও ও ওর দুলাভাইকে নানানভাবে আকর্ষিত করার চেষ্টা করে। এবং এক পর্যায়ে দুজনই আবার সেই আগের মতোই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে। প্রথমে প্রথমে ওর স্বামী আন্দাজ করতে পারলেও সরাসরি কখনো দেখেনি তাই কিছু বলতে পারতো না। কিন্তু হঠাৎ ই একদিন একদম হাতে হাতে ধরে তাও নিজের ঘরে।এরপরই একে একে জানতে পার একাধিক ছেলের সাথে আয়েশার সম্পর্কের কথা। এমনকি আয়েশার যে ওর দুলাভাইয়ের সাথে বিয়ের আগে থেকেই সম্পর্ক ছিলো তাও। সবকিছু জানতে পেরেই তালাক দিয়ে দেয় ওর স্বামী। আয়েশার বোনও জাহাঙ্গীরকে তালাক দিয়ে দেয়। আয়েশার বাবা মা আয়েশাকে ত্যাগ করতে চাইলে আয়েশা ক্ষমা চায় কিন্তু তারা ক্ষমা করে না।আয়েশা পরিবার থেকে আলাদা থাকা শুরু করে, এরকম করে কয়েক মাস আলাদা থাকার পর হঠাৎ করে আবারও এক ছেলের সাথে আয়েশার সম্পর্ক তৈরি হয়। এবং এক পর্যায়ে দুজন বিয়ে করে। কিন্তু এখানেও আয়েশা শান্তি পায় না ।আসলে নোংরা মনের মানুষেরা পৃথিবীর কোথাও শান্তি পায় না ।আয়েশার ক্ষেত্রে ও ঠিক তেমনি হয়েছে। ওর বর্তমান স্বামীর সংসারে প্রথম কয়েকদিন ভালো থাকলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে ওর স্বামী একজন মাদকাসক্ত , এবং একাধিক পরনারীতে আসক্ত। প্রথমে প্রথমে আয়েশার খারাপ লাগলেও পরে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কারন ছিল অর্থ আর ক্ষমতা।আর আয়েশা বরাবরই এই দুটোর প্রতি দুর্বল।আর তাছাড়া নিজেও তো স্বামি ছাড়াও অন্য পুরুষের প্রতি দুর্বল। এই সংসারেও ননদের স্বামীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। যেহেতু ননদ বিদেশে চাকরি করে, সেহেতু তার ছেলে মেয়ের দেখাশোনা করার কথা বলে তার স্বামী সন্তান সবই নিজের করে নিয়েছে। যদিও সেটা এখনও অনেকের অগোচরে রয়েছে। আয়েশার বর্তমান স্বামী মাদক সেবনের পাশাপাশি একজন মাদক বিক্রেতাও। এলাকায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বেশ সখ্যতা। তাই মানুষ জানার পরও কিছু বলতে পারে না। স্বামীর এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আয়েশা এলাকায় লোকজনের অগোচরেই অনেক অবৈধ কাজ করতো। তবে বছর দুয়েক আগেই এক মামলায় ওর স্বামীর পাঁচ বছরের সাজা হয়। আইনের দৃষ্টিতে আয়েশাও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহের তালিকায় থাকলেও প্রমানের অভাবে বেঁচে তো যায় কিন্তু পুলিশের ইনফর্মাদের নজরবন্দী হয় থাকে তাই নিজেকে সাধু প্রমান করতেই গার্মেন্টসের কাজে লাগে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে অনেক পুরুষের সাথেই বেড়েছে তার আন্তরিকতা, গড়েছে অস্বাভাবিক সখ্যতা।স্বামী ও ননদের অনুপস্থিতিতে ননদাইয়ের সাথে গড়ে উঠেছে অঘোষিত স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক।সব কিছু মিলিয়ে আয়েশা একজন ভয়ংকর লোভী, স্বার্থপর ব্যাভিচারে লিপ্ত নারী। গার্মেন্টসে লাগার কয়েক মাস নিজেকে সাধু হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর মধ্যেই কাজের প্রমোশন হতেই নজরে পরে মেহতাব মজুমদারের।
পর্ব ২০
কথক:- মেহতাব মজুমদার সবাইকে যেভাবে নিজের মনোবাসনা জানান দেয় আয়েশাকে সেভাবে জানানোর প্রয়োজন পড়েনি বরং এক্ষেত্রে বলা যায় আয়েশা নিজেই এগিয়ে এসে মেহতাব মজুমদার আর তামীমের সাথে হাত মেলায়। কারন এতে করে সে মেহতাব মজুমদারের বিশেষ নজরে থাকতে পারে যার কারণে নিজের ইচ্ছা মত টাকা হাতিয়ে নিতে পারে, এবং অবলীলায় গার্মেন্টসের ভেতরে মাদক ব্যবসা করতে পারে যদিও সেটা সরাসরি নিজে করে না। মাদকের কাজটা সে তামীমের মাধ্যমেই করে। কিন্তু গার্মেন্টসের ভেতরে শুধু মেহতাব মজুমদারের একার সঙ্গেই শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়। তামীম জানলেও আয়েশার ধুর্ততার কাছে টিকতে পারেনি বরং বলা যায় আয়েশা তামীমকে গোনাই ধরেনি কখনো। তামীমও আয়েশার প্রতি ঐরকম কোন আগ্রহ খুঁজে পাইনি।তাই একে অপরের জন্য কোন রুপ ক্ষতির কারনও কখনো হয়নি। কিন্তু তামীম বরাবরই আয়েশার সাথে যতবার লেনদেন করেছে ততবারই গোপনীয়তার সহিত ভিডিও করে রেখেছে যাতে করে সে নিজের দরকারে যেকোন সময় ব্যবহার করতে পারে। আয়েশা অশিক্ষিত মুর্খ।যতই চালাক হোক না কেন এই ধরনের চিন্তা ভাবনা তার মাথায় যে আসবে না সে বিষয়ে সে নিশ্চিত ছিলো। যাই হোক মেহতাব মজুমদার আগে যাই করতো তা অফিসের বাইরে তার একান্ত বাগান বাড়িতে কিংবা খুবই গোপনীয় জায়গায় করতো।তবে তামীম আয়েশার সাথে পরিচয় হওয়ার পর অফিসে তার নিজের রেস্টের জন্য নির্ধারিত রুমটিকেই ব্যবহার করে এবং এটাকে এমনভাবে তৈরি করে যে বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না এটার ভেতরে কি হচ্ছে। তামীম চালাকির সহিত খুব ভয়াবহ মাদকে আসক্ত করে ফেলে মেহতাব মজুমদারকে। যৌন উত্তেজনা বাড়াতে এবং অস্বাভাবিক পরিমানে উত্তেজিত করতে যাতে করে মেহতাব মজুমদার আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠে এরকম মাদক নিয়মিত দিতে শুরু করে।আর মেহতাব মজুমদারও নিজের জীবনের এই দিকটা উপভোগ করতে শুরু করে। আগে মেয়েদের সন্ধান নিজের করতে হলেও আয়েশার সাথে পরিচয় হওয়ার পর সেটা সহজ হয়ে যায়।কারন আয়েশা নিজেকে সবার সামনে ভালো, ভদ্র সাজিয়ে খুব সহজেই মিশে যেতো।কাজ এবং ব্যবহার দিয়ে মেয়েদের সাথে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতো এবং সময় সুযোগ বুঝে মেয়েদের মেহতাব মজুমদারের সামনে নিয়ে যেতো। মেহতাব মজুমদার অফিসের ভেতর গোপন রুম তৈরি করার পর আরো ভয়ানক হয়ে উঠে। তার যাকে মনে ধরতো তাকে নিজের ইচ্ছা মতো নির্যাতন করতো । এমনকি নিজের পরিচিত এরকম স্বভাবের লোকদের এনে অথবা ডিলারদের দাওয়াত করে খুশি করতে এই মেয়েদের ব্যবহার করতো।এক কথায় নিজের ব্যবসায় প্রসারের জন্য এই মেয়েদের ব্যবহার করতো। তারপর শুরু করলো মেয়ে বিক্রি করা।গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি মেয়ে বিক্রি করেছে।যারা তার কথায় ভয় পেতো না কিংবা আইনের ভয় দেখাতো তাদেরই সে বিভিন্নভাবে বিক্রি করে দিতো।এই বুদ্ধিটা তামীম দিয়েছিলো।কারন যদি সব মেয়েদের ছেড়ে দেয় এবং এই মেয়েরা পরবর্তীতে তাদের কুকীর্তির কথা বাইরে ফাঁস করে দেয় তাহলে তারা সবই ফেঁসে যাবে। আয়েশার কাজ ছিলো মেয়ে যোগান দেওয়া আর তামীমের কাজ ছিলো সেই মেয়েদের প্রথমে সম্রভ হানি করতে সাহায্য করা , পরবর্তীতে সেই মেয়েদের স্থায়ী ব্যবস্থা করা যাতে তাদের কোন বিপদে পড়তে না হয়।
আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত কথা আছে," অন্যের জন্য কুয়া করলে ,সেই কুয়ায় নিজেকেই পড়তে হয়!" এই ক্ষেত্রে ও তাই হয়েছে। তামীম, মেহতাব মজুমদার সব সময় একে অপরকে ফাঁসাতে, কিংবা অসহায়, ভুক্তভোগী মেয়েদের ভয় দেখাতে যেই ভিডিওগুলো করতো সেগুলো সবই ছিল তাদের দুজনের ল্যাপটপে এবং কয়েকটি পেন ড্রাইভে। যেগুলো খুবই কড়া সিকিউরিটি কোড ব্যবহার করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। যা তারা অন্যের ক্ষতির জন্য রেখেছে আজ তা তাদের পাপের ফলাফল দেওয়ার জন্য সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেহতাব মজুমদার এবং তামীমের ল্যাপটপ ঘেঁটেই পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে খাটানোর মতো অজস্র প্রমান। এবং তার সাথে হদিস মিলেছে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কমপক্ষে ১৫-১৮ টি মেয়ের।যাদের মধ্যে ৩ জনকে মেরে ফেলা হয়েছে। বাকী ১২-১৫ টি মেয়েকে বিক্রি করা হয়েছে। আর যাদের ধর্ষন করে ছেড়ে দিয়েছে তাদের অনেকেই এখন আর আগের ঠিকানায় নেই। আবার গুটি কয়েক আত্নহত্যা করে নিজেকে এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রায় ২০/২৫ টি মেয়ের অসহায়ত্বের ভিডিও পাওয়া গেছে তামীমের মোবাইল ও পেনড্রাইভ থেকে। এমনকি মহিলা বাথরুমেও তামীম গোপন ক্যামেরা লাগিয়েছিলো, যেগুলো নিজের মোবাইলের সংরক্ষণ করে রেখেছে। সেখানে আরো অনেক মেয়ের ভিডিও পাওয়া যায়। পুলিশ তদন্তে করতে গিয়েই মেহতাব মজুমদার, তামীম,আয়েশার কালো অতিত,ভয়াবহ বর্তমানের সাথে পরিচয় হয়। তিনজনই ভয়ংকর বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ।সবরকম তথ্য প্রমানের ভিত্তিতে পিয়ন,দাড়োয়ান সহ সেই গাড়ীর ড্রাইভার এবং অফিসে তামীম, আয়েশাকে মাদক ব্যবসায়ে সাহায্য করার জন্য জুনাইদ নামে আরো একজনকে সহ হত্যার পর মৃতদেহ গুম করতে সহযোগিতা করা, মাদক ব্যবসায় সহযোগিতাসহ ধর্ষনে সহযোগিতার দায়ে যথাযোগ্য শাস্তি দেওয়া হয়। মেহতাব মজুমদার, আয়েশা, তামীম সহ তিনজনকেই ধর্ষন, হত্যা,হত্যাচেষ্টা,পর্নোগ্রাফি এবং আত্নহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া, এবং সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ক্ষতির হুমকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত করার দায়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযোগ্য শাস্তি দেওয়া হয়।
অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার খবরে পুরো কোর্ট চত্বরে সাধারণ জনগণের মাঝে খুশির বন্যা বয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের পরিবারের লোকেরা খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করে। অনেক বড় বড় ল-ইয়ারেরাও দম ছেড়ে বাঁচে। মেহতাব মজুমদারের মতো এত নামীদামী জনপ্রিয় মানুষের মাঝে যে এত ভয়াবহ একটা মানুষ লুকিয়ে ছিল তা যেন অনেকেরই বিশ্বাসের বাইরে। দীর্ঘ এগারো মাসের এক যু্দ্ধের পর যেন অতি অনাকাঙ্ক্ষিত বিজয়টি হাতে পেয়েছে ঝিলিক আনন্দ । খুশিতে ঝিলিক হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। আনন্দও আজকে আর বাঁধা দেয় না।কাদুক,আজ মন ভরে কাদুক! মেহতাব মজুমদারের ল- ইয়াররা যদিও উচ্চ আদালতে আপিলের কথা বলেছেন তবুও সবাই নিশ্চিত যে আপলি গ্রহন হবে না। সেটা অবশ্য মেহতাব মজুমদারের উকিলেরাও জানে তবুও। কোর্টের কাজ শেষ করে ঝিলিক আনন্দ চলে আসে নিজেদের বাসায়।আজ অনেক দিন পর যেন ঝিলিক আনন্দ একটা শান্তির ঘুম দিবে।
সময় বড়ই স্বার্থপর।যদি সেটা হয় সুখের তাহলে তো কথাই নেই।সে যেন আপন মনেই বয়ে যায়। দুঃখটাকে ভারী করার জন্যই হয়তো কষ্টের বিষয়ে সময়ের এতো অলসতা।তা না হলে এমন কেন হয়, সুখের সময়টাকে ছোট আর দুঃখকালীনকে বিশাল আকার মনে হয়! আসলেই কি তাই নাকি আমাদের অনুভুতির প্রকাশটাই এমন করে হয়। কিন্তু যাই হোক সেই দিনের পর হাসি কান্নার মাঝেই কেটে গেছে আনন্দ ঝিলিকের জীবন থেকে দুই দুইটি বছর। আনন্দ এখন একটি গার্মেন্টস কোম্পানির ম্যানেজার। ঝিলিক এখন আর চাকরি করে না। পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়ির পাশেই দুইটা টিউশনি করে । যদিও আনন্দ প্রথমে রাজী হচ্ছিলো টিউশনি করতে দিতে কারন আনন্দ চায় ঝিলিক সংসারের পর সবটুকু সময় নিজের পড়াশোনায় দিক। কিন্তু ঝিলিকের আহ্লাদে আটখানা হয়ে বাচ্চাদের মতো করে আবদার করাটাকে অবজ্ঞা করার সাহস যে আনন্দের নেই।
পর্ব ২১
আনন্দ:- ঝিলিক, ঝিলিক!
কথক:- ডেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে টাই বাঁধতে বাঁধতে জোরে জোরে ডাকছে
ঝিলিক:- জ্বী আসতেছি!
কথক:- আনন্দ আবারো যেইনা ঝিলিকের নাম ধরে ডাকতে যাবে সেই মুহূর্তে ঝিলিক দরজায় পা রাখে তাই দেখে আনন্দ চুপ হয়ে যায়।জানে এরপর কি হতে চলেছে।
ঝিলিক:- কি সমস্যা আপনার? এভাবে সকাল সকাল চিৎকার না করলে হয় না?
আনন্দ:- এখনো রেডি হচ্ছোনা কেন? তোমাকে ভার্সিটি নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসে যাবো।
ঝিলিক:- আমি বলছিলাম আজকে না গেলে হয় না!
কথক:- ঝিলিক মুখটাকে বাচ্চাদের মতো করুন করে বললো। কিন্তু আনন্দ সেদিকে ধ্যান না দিয়ে অন্যদিকে মুখ করে নিজের শার্টের ইন ঠিক করতে করতে বললো,
আনন্দ:- নাহ যেতেই হবে। এমনিতেই তুমি আজকাল পড়াশোনা নিয়ে অনেক হেয়ালি করছো! ইয়ার ফাইনালের রেজাল্ট খারাপ হলে আমি কিছুতেই মানতে পারবো না!
ঝিলিক:- কিন্তু.--!
আনন্দ:- কোন কিন্তু নয়! চুপচাপ রেডি হয়ে নিচে আসো ।আমি বাইক বের করছি।
কথক:- ঝিলিককে আর বলতে না দিয়ে এবার অনেকটা কড়া চোখেই ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো, ঝিলিক ও আর কোনরকম কথা না বলে চুপ করে তৈরি হতে শুরু করলো। এমনিতেও তর্ক করে বাঘকে ক্ষেপানোর ইচ্ছা আপাতত নেই। কিন্তু আজ শরীরটা সত্যিই খারাপ লাগছিলো, তবুও কিছু করার নেই,যেতে আজ হবেই। বেশ কয়েকদিন ক্লাস কামাই দেওয়ার জন্যই এমনি ক্ষেপে আছে,তার উপর যদি আজ না যায় তাহলে নিশ্চিত কপালে শনি নামাবে। ঝিলিক তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে সব কিছু ঠিক করে দেখে নিয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে নিচে নেমে দেখে আনন্দ বাইকে বসে অপেক্ষা করছে।ওকে দেখে হেলমেটটা ঝিলিকের মাথায় সুন্দর করে পড়িয়ে তারপর চলে গেল। ভার্সিটির গেইটে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল নিজের অফিসে। ঝিলিক পরপর তিনটা ক্লাস করে গ্যাপ আওয়ারে ক্যান্টিনের পাশে বসে বন্ধুদের সাথেও আড্ডা দিচ্ছিলো,এমন সময় সিনিয়র একজন আপু এসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলো,তার সাথে কিছু সময় কথা বলে, নিজের ফ্রেন্ডকে নিয়ে চলে গেল পাশের একটি ফটোকপির দোকানে। সেখান থেকে বিগত কয়েকদিনের নোট ফটোকপি করে নিলো নিজের বন্ধুর নোট থেকে। দোকান থেকে আবার ও যখন ক্লাসের উদ্দেশ্য ক্যাম্পাসে পা দিলো ঠিক তখনই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠলো, পড়ে যেতে যেতে পড়লো না। হাত দুটো দুদিকে দিয়ে নিজের ব্যালেন্স নিয়ন্ত্রণ করে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে ধীরে হেঁটে গেল সামনের দিকে। ও দাড়িয়ে যাওয়াতে ওর ফ্রেন্ড কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল কিন্তু ওর পিছিয়ে পড়া দেখে আবারও ওর দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো সব ঠিক আছে কিনা? ঝিলিক মৃদু আওয়াজে বললো,
ঝিলিক:- হুম।
কথক:- তারপর আস্তে আস্তে হেঁটে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল। ক্লাস রুমে ঢুকে বসতে যাওয়ার সাথে সাথেই মাথা ঘুরিয়ে নিচে পড়ে যায়।তা দেখে ওর ক্লাস ফ্রেন্ডরা চিৎকার করে উঠে। কয়েকজন মেয়ে বন্ধু এগিয়ে এসে ওকে তোলার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। এর মধ্যেই একজন খেয়াল করে ঝিলিকের মাথার পিছনের এক কোন থেকে রক্ত বের হচ্ছে। ও হাত দিয়ে দেখে আসলেই রক্ত।ওরা প্রথমে নার্ভাস হলেও পরে দ্রুত ভার্সিটির প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে যেতে যেতেই ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু আনন্দকে ফোন করে, আনন্দ নাম্বারটি দেখেই সামান্য কপাল কুঁচকে ফেলে, তারপর দ্রুত ফোনটা রিসিভ করেই,
আনন্দ:- হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম!
মনিকা( ঝিলিকের ক্লাস ফ্রেন্ড):- ওয়া আলাইকুম আসসালাম ভাইয়া! ভাইয়া আপনাকে দ্রুত ভার্সিটি আসতে হবে।
কথক:- মনিকার কথায় আনন্দ চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- কেন ,সব ঠিক আছে? ঝি-ঝিলিক কোথায়?
মনিকা:- ভাইয়া আপনি চিন্তা করবেন না। এমনিতে সব ঠিক আছে। শুধুমাত্র ঝিলিক মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিল আর তাতে সামান্য আঘাত পেয়েছে।
কথক:- আনন্দ চিৎকার করে বলে উঠলো,
আনন্দ:- মানে! মানে পড়ে গেছে মানে কি? কিভাবে পড়লো? উফ এই মেয়েটা না একটু কেয়ারফুলি চলতে পারে না!
মনিকা:- ভাইয়া আসলে ও ! আপনি আসুন।ও আপাতত ভার্সিটির প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে আছে।
আনন্দ:- হ্যা হ্যা আমি আসছি।আমি অলরেডি বাইক বের করছি!
কথক:- আনন্দ কথা বলতে বলতেই অফিসের গ্যারেজে পৌঁছে গেছে। বাইক বের করে একটানে ঝিলিকের ক্যাম্পাসে।রাস্তায় সামান্য সময়ের জন্য ট্রাফিক জ্যামে থাকাকালীন অবস্থায় অফিসের বসকে ফোন করে সবটা জানিয়ে আজকে পুরো দিনের ছুটি নিয়ে নিয়েছে এবং না বলে অফিস থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমাও চেয়েছে। ভার্সিটি পৌঁছে এক দৌড়ে প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে দেখে ঝিলিক চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।ওর মাথায় হালকা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ও ঝিলিকের পাশে বসে মাথায় হাত রাখতেই ঝিলিক চোখ মেলে তাকালো, আনন্দ ঝিলিককে চোখ মেলে তাকাতে দেখেই অস্থির হয়ে পড়ে,
আনন্দ:- কি --কি--কিভাববে পড়লে? আর এখন কেকেমন লাগছে?
ঝিলিক:- আমি ভালো আছি, আপনি শান্ত হোন!
কথক:- ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকিয়ে ওর অস্থিরতা দেখে ওকে শান্ত করার জন্যই উক্ত কথাটি বলে। তারপর একটু উঠে বসার চেষ্টা করলে আনন্দ হাত ধরে বসতে সাহায্য করে। ঝিলিক উঠে বসে আনন্দের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে আনন্দের মনের প্রশ্নটা? তাই নিজের থেকেই উত্তর দিয়ে দেয়,
ঝিলিক:- বুঝতে পারলাম না কিভাবে পড়ে গেলাম! শুধু মাথাটা ঘুরাচ্ছিলো, কিছু বুঝে উঠার আগেই পড়ে গেলাম! এরপর আর কিছু মনে নেই।আর এখন তো চোখ মেলে সবার আগে আপনাকেই আমার পাশে দেখলাম! এইতো!
কথক:-আনন্দ মুখটা ছোট করে ঝিলিকের কপালের ব্যান্ডেজটা দেখছে।হাত দিয়ে ধরতে গিয়েও ধরলো না যদি ব্যথা পায়। এর মধ্যেই ডাক্তার এসে ঝিলিকের কেবিনের পাশে দাড়ালো,
ডাক্তার:- হ্যালো!
ঝিলিক:- হ্যালো ডক্টর!
ডাক্তার :- এখন কেমন লাগছে?
ঝিলিক:- জ্বী আলহামদুলিল্লাহ! ধন্যবাদ আপনাকে!
ডাক্তার:- You most welcome! But don't give me thanks! You should thanks to your friend! ওরা যদি ঠিক সময় মতো না আনতো তাহলে হয়তো অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো!
ঝিলিক:- জ্বী অবশ্যই!
আনন্দ:- এখন ওর অবস্থা কেমন! আর হঠাৎ এমন মাথা ঘুরানো মানে কি?
কথক:-ডাক্তার হালকা করে মৃদু হেসে তারপর ঝিলিকের প্রেশার মাপতে মাপতে বললো,
ডাক্তার:- আপনি শান্ত হোন,তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় বলেই মনে করছি। প্রেশারটা একটু ফল্ট করেছে।আর তাছাড়া ওর শরীরও বেশ দুর্বল। মনে হয় খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করে না। আমি যা সন্দেহ করছি তা যদি ঠিক হয় তাহলে এই সময়ে ওনার নিজের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। ঠিক মতো সুষম খাদ্য খাওয়া উচিত। আর যদি ঠিক না হয় তাহলেও আরো অনেক কারন থাকতে পারে, তাই আমি সাজেস্ট করছি এখান থেকে গিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ভালো কোন ডাক্তার দেখাতে ।তবে ভালো হয় একবার প্রেগন্যান্সি টেস্ট করালে!
কথক:-ডাক্তারের কথায় আনন্দ ঝিলিকের মুখের দিকে তাকায় ,,আর ঝিলিক প্রেগন্যান্সির কথা শুনে লজ্জ্বায় মাথা নুইয়ে রেখেছে। আনন্দ এখনো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।ওর মাথা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে! কি ভাববে,কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটাও ভুলে গেছে, বুঝতে পারছে না।। ডাক্তার প্রেশার মাপার পর টুকটাক আরো কিছু পরামর্শ দিয়ে ঝিলিককে সাবধানে থাকতে বলে চলে যায়। আনন্দ ঝিলিককে নিয়ে বের হয়ে আসে ভার্সিটি থেকে। তৎক্ষণাৎ পাশের একটি হসপিটালে নিয়ে যায়, ঝিলিক না যাওয়ার জন্য অনেক পাঁয়তারা করার পরেও আনন্দ নিয়ে যায়। এখন ওরা বসে আছে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে। অনেক লম্বা সিরিয়াল। এত লম্বা সিরিয়াল দেখে আনন্দ একটু চিন্তায় পড়ে যায়। ঝিলিকের শরীরটা দুর্বল।বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে । এদিকে আনন্দ ঝিলিকের শারীরিক অবস্থা জানতেও উদগ্রীব। তাছাড়া ডাক্তারের প্রেগন্যান্সির কথা শুনে আরো বেশি উদগ্রীব। ঝিলিক মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে বসে আছে। আনন্দ ঝিলিকের শুকনো মুখ দেখে ডাক্তারের পিএর সাথে কথা বলে পরের দিনের এ্যাপয়নমেন্ট নিয়ে চলে আসে বাসায়। বাসায় এসে ঝিলিককে ফ্রেশ করিয়ে নিজের হাতে খাবার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দেয়। ঝিলিক চেয়ে চেয়ে শুধু আনন্দের কাজকর্ম দেখছে। সেদিন এভাবেই চলে যায়। পরের দিন ডাক্তারের দেওয়া সময় অনুযায়ী ঝিলিককে সাথে নিয়ে উপস্থিত ডাক্তারের কেবিনে। ডাক্তার ঝিলিকের অবস্থা দেখে টুকটাক প্রাথমিক চিকিৎসা করে কয়েকটি পরীক্ষা দিলেন তার মধ্যে প্রেগন্যান্সি টেস্টও ছিলো। প্রাথমিক অবস্থায় পজেটিভ দেখাচ্ছে। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য সম্পূর্ণ টেস্ট রিপোর্ট এর জন্য আবার আগামীকাল আসতে বলেন। রেজাল্ট পজেটিভ দেখে ঝিলিক আনন্দের দিকে তাকায়, আনন্দ খুশি না রাগ বোঝা যাচ্ছে না।ওর মুখশ্রী একদম প্রতিক্রিয়াহীন। চোখ দুটোও শান্ত।ঝিলিকের বুকটা ধক করে উঠলো। আনন্দ কি বেবির খবরে খুশি নয়?
ঝিলিক:- হ্যা! খুশি হবে কেন! খুশি হওয়ার তো কথা নয়! উনি তো স্পষ্ট বলেছিলেন আমার গ্রাজুয়েশন এর আগে বেবি নয়! কিন্তু তাই বলে কি এখনও এমন করবে?!
কথক:- কথাগুলো ঝিলিক মনে মনেই ভাবছিলো। আনন্দ ডাক্তারের সাথে কথা বলে ঝিলিকের হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঝিলিকের মেয়েলী অনেক শারীরিক সমস্যা আছে।যার জন্য নিশ্চিত হতে পারছে না প্রেগন্যান্সীর বিষয়ে। কিন্তু আনন্দের মতিগতিও কিছু ঠাওর করতে পারছে না।এসব চিন্তা ভাবনার মাঝেই আনন্দের ফোনটা বেজে উঠলো।হাতে নিয়ে দেখে আনন্দের মা ফোন করেছেন। আনন্দ ফোন রিসিভ করে,
আনন্দ:- আসসালামু আলাইকুম মা!
আনন্দের মা:- ওয়া আলাইকুম আসসালাম।কেমন আছো তোমরা?
আনন্দ:- এইতো মা আমি আলহামদুলিল্লাহ!
মা:- ঝিলিক কেমন আছে,ও কোথায়? কাল সারাদিন ও একবার ফোন দিলো না?
আনন্দ:- আছে ও আমার সাথেই আছে।কথা বলবে ? দাঁড়াও দিচ্ছি!
মা:- তোমার সাথে মানে? তুমি কি এখন অফিসে নও?
আনন্দ:- না।আমি এখন হসপিটালে আছি!
মা:- হসপিটালে কেন? কার কি হয়েছে?( মা অস্থির হয়েই বলে)
আনন্দ:- মা শান্ত হও ! কারো তেমন কোন কিছু হয়নি।
মা:- কিছু না হলে দুজনেই হাসপাতালে কেন?
আনন্দ:- ঐ,আসলে গত পরশু দিন ও হঠাৎ করে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিল ক্যাম্পাসে। তো ডাক্তার অনেক কিছুই ধারনা করছে ,তবে তার জন্য কিছু টেস্ট করাতে বলেছিলো তার জন্যই আসা।
মা:- হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাওয়ার মানে কি? আচ্ছা রিপোর্টে কি এসেছে? এতবড় ঘটনা ঘটে গেল অথচ কিছুই জানালে না!
আনন্দ:- মা এখন ও রিপোর্ট দেয়নি।আর যেহেতু রিপোর্ট পাইনি তাই কিছু না জেনে তোমাদের কি জানাবো বলো? যাই হোক, দোয়া করো যেন যাই হয় ভালো হয়।
মা:- সেটা আবার বলতে হয়! মা বাবার দোয়া সন্তানদের প্রতি সবসময় থাকে! তুমি ওকে দাও ওর সাথে কথা বলি ।
আনন্দ:- হুম নাও!
কথক:- আনন্দ ফোনটা ঝিলিককে দিলো, ঝিলিক সালাম বিনিময় করে আরো টুকটাক কথা বলে, শ্বাশুড়ি মায়ের থেকে কিছু পরামর্শ নিয়ে এবং তাঁকে সাবধানে থাকতে বলে ফোনটা কেটে দিলো। এরপর দুজনেই বাসায় চলে গেলো। পরের দিন রিপোর্ট আনতে আনন্দের যাওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ অফিসের জরুরী কাজে আটকে যাওয়ার জন্য আর যেতে পারেনি। ঝিলিকই ক্লাস শেষে রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে বাসায় চলে আসে। রাতে আনন্দ ঘরে ফিরে সবার আগেই রিপোর্ট দেখতে চায়।ভয় আর লজ্জায় ঝিলিকের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আনন্দ ঝিলিকের মুখের নমুনা দেখেই যা আন্দাজ করার করে নিয়েছে। তারপরও রিপোর্ট খুলে দেখেই থম মেরে দাড়িয়ে থাকে।কি হবে খুশি নাকি ঝিলিককে কড়া করে কয়েকটা দিবে? সত্যি বলতে এখন ওর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু এই খুশির খবরের জন্য এই মুহূর্তে কিছুতেই প্রস্তুত ছিলোনা। ওর মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে সামনে ঝিলিকের ইয়ার ফাইনাল।আর কিছুতেই গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগে ঝিলিককে মাতৃত্বের বাঁধনে বাঁধতে চায়নি। কিন্তু এই মেয়ে তো!
আনন্দ:- কনগ্রাচুলেশন!
কথক:- আনন্দের হঠাৎ এমন কথায় ঝিলিক মুখ তুলে তাকায়, আনন্দ বেশ ক্রোধানিত চাহনিতেই তাকিয়ে আছে। বেশিক্ষণ আনন্দের মুখের দিকে না তাকিয়ে, আবারও মাথা নুইয়ে ফেলে।
আনন্দ:- তো এখন খুশি? অবশ্য খুশি হবে না কেন ? তুমি তো ইচ্ছে করেই করেছো।
কথক:- ঝিলিক মাথা নত রেখেই বলে,
ঝিলিক:-আমি ইচ্ছে করে করিনি! এটা একটা এক্সিডেন্ট!
আনন্দ:- এক্সিডেন্ট! এক্সিডেন্ট কি করে হয়! আমি তোমাকে বারবার সাবধান করেছি!
কথক:- চিৎকার করে কথাটি বলে উঠে আনন্দ তারপর মাথাটা একটু ঠান্ডা করে তারপর বলে,
আনন্দ:-যাক যা করেছো ,করেছো।ভালো করেছো! তবে একটা কথা মাথায় ঢুকিয়ে নাও আমি না পড়াশোনায় গাফিলতি বরদাস্ত করবো আর না আমার সন্তানের প্রতি অবহেলা সহ্য করবো। এই সময়ে কন্সিভ করার সিদ্ধান্ত তোমার একার ছিলো, সো সবটা তুমি একাই সামলাবে। বিকেয়ার ফুল!
কথক:- আনন্দের এহেন ধমকে ঝিলিকের চোখ ভরে আসে,ও ছলছল দৃষ্টিতে আনন্দের দিকে তাকায়, আনন্দ ঝিলিকের চোখের পানি সহ্য করতে পারে না এখনও তাই হলো কিন্তু বুঝতে না দিয়ে নিজেকে শক্ত দেখিয়ে কঠিন স্বরেই বললো,
আনন্দ:- এখন দাড়িয়ে আছো কেন? যাও গিয়ে প্রস্তুতি নাও পরের যুদ্ধের জন্য!
কথক:- ঝিলিককে শাসানোর পর নিজেকে ঠান্ডা করা জরুরি মনে করে টাওয়াল,কাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এসে সবার আগে নিজের মা বাবাকে জানালো খুশির খবরটা। তারপর ঝিলিকের মা বাবাকে। সবাই খুব খুশি। আনন্দের মা জানিয়েছে সে কালই ঢাকায় আসছে। এরকম সময়ে সে কিছুতেই তার বৌমা আর ভবিষ্যত বংশধরকে একা রাখবে না! তাই সে কালকেই ঢাকা পৌঁছাবে। এর মধ্যে ঝিলিকের মাও চলে আসার কথা বলেছে। আনন্দ দু মায়ের কথা ভেবে হেসে উঠলো।সত্যি বলতে আনন্দ নিজেও অনেক খুশি।
আনন্দ:- প্রথমবার বাবা হবার অনুভূতি অন্যরকম। বাবা হবে অথচ খুশি হবে না এরকম পুরুষ পৃথিবীতে আছে নাকি?একটি মেয়ের কাছে মাতৃত্ব যেমন অন্যরকম অনুভূতি ঠিক একটি ছেলের কাছেও তাই। কিন্তু আমার চিন্তা তোমার পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে। তবে তুমি চিন্তা করো না আল্লাহ চাইলে আগেও যেমন তোমার পাশে ছিলাম তেমনি ভবিষ্যতেও থাকবো। কিছুতেই তোমার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নষ্ট হতে দিবো না। এটা আমার নিজের কাছে নিজের ওয়াদা।
কথক:- আনন্দ নিজের সাথে নিজেই কথা বলেই কিচেনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। ঝিলিক একটা একটা করে সব কিছু টেবিলে এনে রাখছে। আনন্দ তা দেখেই দৌড়ে গিয়ে ওকে সাহায্য করতে লাগলো। তারপর ঝিলিক কে চেয়ারে বসিয়ে,
আনন্দ:-এখানে বস! চুপ করে বসো! আমি নিজের খাবার নিজেই নিয়ে খেতে পারবো।
কথক:- আনন্দ নিজে প্লেটে খাবার নিয়ে নিজেও খেলো সাথে ঝিলিককেও খাইয়ে দিলো ।খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঝিলিক প্লেট-বাটি গোছাতে গেলে আনন্দ ধমক দিয়ে বলল,
আনন্দ:- চুপচাপ রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো। এগুলো আমি গোছাতে পারবো।
কথক:-ঝিলিক আনন্দের ধমক খেয়ে মুখটা কাচুমাচু করে ধীর পায়ে হেঁটে বেডরুমে চলে গেল। ঝিলিকের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আনন্দ মুচকি হাসলো। ঝিলিক বিছানায় মাথা হেলিয়ে নিজের ডান হাতটা পেটের উপরে রেখে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করে হেসে দিলো। আবারও মুখটা কালো হয়ে গেলো আনন্দের রিএ্যাকশনের কথা মনে করে। ঠিক মতো শুয়ে পেটের উপর ডান হাতটা রেখেই চোখ বন্ধ করলো, কিছু সময় পর পেটের উপর কারো নরম ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করলো।চিনতে অসুবিধা হলোনা এই ছোয়া কার। কিন্তু হঠাৎ পেটের উপর, ভাবতেই খুশিতে ঝিলিক চোখ মেলে তাকালো, আনন্দ ও ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে ! ঝিলিক আনন্দকে হাসতে দেখেই এবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আনন্দ শোয়া থেকে টেনে তুলে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো। ঝিলিক কিছু সময় কান্না করে তারপর থামলো। আনন্দ বুকের থেকে সরিয়ে কপালে আলতো ছোঁয়া দিয়ে আবারও জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো।
পাঁচ বছর পর,,,,
খুশি:- মাম্মাহ!
ঝিলিক:- জ্বী মাম্মাহ্!
খুশি:- পাপাহ কই ( অভিমান করে গাল ফুলিয়ে বলে কথাটি)
ঝিলিক:- ওলে আমার সোনা বাচ্চাটা! অভিমান হয়েছে বুঝি পাপার উপর! ( আহ্লাদ করে গালে আলতো ছোঁয়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলো)
খুশি:- Hmm! I angry with papah! Papa's princess angry with papah! ( ঠোঁট টা ফুলিয়ে রাগ প্রকাশ করার অভিনয় করে বলে কথাটি)
ঝিলিক:- ওহ তাই! ঠিক আছে ,একদম ঠিক আছে! রাগ করাই উচিত, সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ! প্রিন্সেসকে একটুও সময় দেয় না! আজকে আসুক আজকে প্রিন্সেস আর মাম্মাহ্ মিলে পাপাকে বকা দিবো ওকে? ( ঢং করে কথাটি বলে, যাতে করে খুশি খুশি হয়ে যায় কিন্তু হলো উল্টোটা।ঝিলিকের কথা খুশির পছন্দ হয়নি)
খুশি:- No! You can't scold my papah! Papah is princess super hero! So only princess can scold him! You don't!
ঝিলিক:- বাবার চামচা,বাবা যাই করুক বাবাই ভালো! থাক তুই তোর বাবাকে নিয়ে!
কথক:- কথাগুলো ঝিলিক মনে মনে বলে। এরমধ্যেই আনন্দের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে পিছনে ঘুরে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে আনন্দ হাঁটু গেড়ে বসে দুই কানে হাত দিয়ে রেখেছে।দুই পাশে দুটো বড় বড় ঠেডি। খুশি ঠোঁট উল্টে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে রেখে নিজের পাপাকে দেখছে!
আনন্দ:- Papa sorry princess! এতগুলো sorry! আর কখনো দেরি হবে না!
কথক:-আনন্দের Sorry বলার ধরন দেখে খুশি খুশি হয়ে যায়।আসলে খুশি যতই বলুক বাবার প্রতি তার রাগ টিকিয়ে রাখতে পারে না।তার কাছে তার পাপাহ ই সব। মাকে ও ভালোবাসে তবে পাপার প্রতি টানটা একটু বেশিই। দৌড়ে গিয়ে আনন্দের গলা জড়িয়ে ধরে। আনন্দ মেয়ের রাগ পড়েছে বুঝতে পেরে জড়িয়ে ধরেই উঠে দাঁড়িয়ে ঝিলিককে চোখ মারে আর তা দেখে ঝিলিক তেতে উঠে,
ঝিলিক:- যতসব ঢং! বুড়ো বয়সে ভীমরতিতে ধরেছে।
কথক:- ঝিলিকের কথায় আর বলার ধরনে আনন্দ শব্দ করেই হেসে উঠে। খুশি কিছু বুঝুক আর না বুঝুক মায়ের মুখশ্রী আর বাবার হাসি দেখে সেও হেসে উঠলো।
পর্ব ২২ (শেষ পর্ব)
আনন্দ মেয়েকে কোলে রেখেই টেডি দুটো উঠিয়ে চলে গেল মেয়ের রুমে।
খুশি:- পাপাহ!
আনন্দ:- জ্বী মা!
খুশি:- দাদু কখন আসবে?
আনন্দ:- চলে আসবে।এইতো কিছু সময় পরেই।
আপনি দুপুরে খেয়েছিলেন?
খুশি:- হুম; মাম্মাহ খাইয়ে দিয়েছে ।
আনন্দ:- ওকে তাহলে এখন আপনি আপনার এই টেডি নিয়ে খেলুন পাপা একটু ফ্রেশ হয়ে নেই।
খুশি:- ওকে!
কথক:-আজকে আনন্দ ঝিলিকের একমাত্র কন্যা সন্তান, আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহারের চতুর্থ জন্মদিন ! আজ সে পাঁচ বছরে পদার্পণ করবে। সেই উপলক্ষে আনন্দ বেশ বড়সড় আয়োজন করেছে। তাছাড়া আরো একটি কারন কাছে যেটা খুশিটাকে আরো দ্বিগুন বাড়িয়েছে ! তাইতো সকাল থেকে এত ব্যস্ততা। মসজিদে মিলাদ দিয়েছে।এতিমখানায়ও খাবার আর বেশ কিছু কাপড় দিয়েছে।এর পাশাপাশি চারজন অসহায় মানুষের স্থায়ী ব্যবস্থা করেছে। মেয়েকে ঘরে রেখে চলে গেল নিজের রুমে। ঝিলিক আলমারি থেকে আনন্দের কাপড় বের করছিলো, আনন্দ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে পেটের উপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো,
আনন্দ:- জুনিয়র কেমন আছে?
কথক:- ঝিলিক মুচকি হেসে আনন্দের বাঁধন থেকে নিজেকে আলগা করে সামনে ঘুরে দাড়ালে আনন্দ ঝিলিকের কপালের ঠোঁট ছুঁইয়ে পেটের উপরের কাপড়টা সরিয়ে সেখানে আলতো চুমু দিলো।
আনন্দ:- চ্যাম্প কেমন আছেন! বাবা আপনাকে আজকে সময় দেইনি বলে বাবার উপর রাগ করবেন না,বাবা খুব ভালোবাসে আপনাকে। আপনার হিংসুটে মাকেও!
ঝিলিক:- কিহ আমি হিংসুটে! এই ছাড়ুন আমাকে! যান নিজের আহ্লাদী ঢঙি মেয়ের কাছে যান!
আনন্দ:- এই যে দেখো রেগে গেল! আমি তো শুধু মজাই করছিলাম!
ঝিলিক:- গুল্লি মারি আপনার মজার! শুধু আমার ছেলেটা আসুক তারপর বের করবো আপনার আর আপনার মেয়ের মজা।
আনন্দ:- বাহ এখনই দলাদলি শুরু করে দিয়েছো?
ঝিলিক:-হা তো! মেয়েটা তো আপনার ই আমার একটা কথাও শোনেনা! তাই আমিও ঠিক করে নিয়েছি আমার ছেলে আসলে আমিও দেখিয়ে দিবো,হুহ!
কথক:- আনন্দ ঝিলিকের বাচ্চামো দেখে শব্দ করেই হাসে , আনন্দের হাসিতে ঝিলিকের মুখেও হাসি ফুটে। নিজের বাচ্চামোতেও তার প্রচুর হাসি পায়। আনন্দ ঝিলিক কে জড়িয়ে রেখেই চুলের উপরেই আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করে,
আনন্দ:- দুপুরে খেয়েছিলে?
ঝিলিক:- হুম! আপনি?
আনন্দ:- হুম , এতিমখানায় বাচ্চাদের সাথেই খেয়েছি।
ঝিলিক:- আচ্ছা বাবা কতদূর?
আনন্দ:- আসছে রাস্তায় আছে , কিছুক্ষণ আগেই কথা হয়েছিলো।
ঝিলিক:- যেই কাজের জন্য রয়ে গিয়েছিল সেটা হয়েছে?
আনন্দ:- হুম।হয়ে গেছে।জমিটা মেপে দাগ দিয়েছে।এখান থেকে গিয়ে তারপর দেওয়াল উঠাবে। সবাইতো চলে এসেছে তাই না?
ঝিলিক:- হুম
আনন্দ:- তো আমার একমাত্র শালিকা কই? আর তার স্বোয়ামীও বা কই?
ঝিলিক:- আসেনি এখনো !
আনন্দ:- মানে? সন্ধ্যা হয়ে গেলো বলে?
ঝিলিক:- বলেছে তো সন্ধ্যার আগেই চলে আসবে। ওর বাচ্চার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না!
কথক:- ঝিলিক কথাটা চিন্তিত হয়েই বলে, আনন্দ আশ্বস্ত করে বলো,
আনন্দ:- চিন্তা করো না ভালো ডাক্তার দেখালেই ঠিক হয়ে যাবে। যাও তুমি রেডি হয়ে নাও। আমাকেও কাপড় দাও।
-------রাত ৯ টা;
বড় একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিশাল আয়োজন করেছে আনন্দ। একে একে সব মেহমান এসে পড়েছে। আনন্দের বাবা, মা,বোন,ঝিলিকের পরিবারের সবাই, মাজেদ সপরিবারে, সোহাগ ও অন্যান্য পরিচিত সবাই সপরিবারে এমনকি সেই মেহতাব মজুমদারের ম্যানেজারও সপরিবারে এসেছেন। আনন্দকে চাকরি পেতে এই ম্যানেজার সাহেবই সাহায্য করেছিলেন। আনন্দ সেই পুলিশকেও দাওয়াত দিয়েছিলো,তিনি নিজে আসতে পারেনি তবে নিজের পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়েছে। আনন্দ সব আত্নীয়, নিজের পরিবারের সবাইকে একত্র করে নিজের খুশিটাকে ভাগ করে নিলো।
আনন্দ:- আসসালামু আলাইকুম সবাইকে! সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাই এই কারনে যে নিজেদের জীবনের এত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে,আমার পরিবারের এই খুশির দিনে সময় দিয়েছেন। আমাদের সাথে সামিল হয়ে আমাদের খুশিটাকে দ্বিগুণ করেছেন। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি সবার কাছেই আর্জি রাখবো সবাই নিজেদের দোয়ার মোনাজাতে আমার পরিবারকে, আমার সন্তানদের রাখবেন। আল্লাহ যেন আমার সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সামর্থ্য দেন। তাদের যেন সুস্বাস্থ্য দান করেন।
সবাই:- আমীন!!!
মাজেদ:- সবই বুঝলাম কিন্তু সন্তানদের কথাটা ঠিক বুঝলাম না! না মানে একজনই তো জানতাম তাহলে সন্তানদের কিভাবে?
কথক:-মাজেদের কথায় আনন্দ মিটমিট করে হাসছে আর ঝিলিক তো লজ্জায় মরে যাওয়ার মতো অবস্থা! আনন্দ সবাইকে জানাবে জানতো এভাবে পাবলিকলি বলবে তা বুঝতে পারেনি। এর মধ্যেই আনন্দের মা ঝিলিক কে জড়িয়ে ধরে খুশিতে ঝিলিকের মুখে চোখে চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগলো।এসব দেখে ঝিলিক যে সন্তান সম্ভবা সেটা অনেকেই বুঝে গেছে কিন্তু মাজেদের মতো অনেকেই আবার বুঝেনি।তাই আনন্দ নিজেই বললো সবার উদ্দেশ্যে।
আনন্দ:- উপরওয়ালার রহমতে আমি আবারও বাবা হচ্ছি। আমার ঘরে আরো একজন সদস্য যোগ হচ্ছে!
কথক:-সবাই একসাথে বলে উঠল , আলহামদুলিল্লাহ!
আনন্দ:- সবাই আমার মেয়ে আর অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া করবেন! আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ ও সুন্দর ভাবেই পৃথিবীতে আসতে দেন। যে আছে তাকে ও সুস্থ রাখেন।
কথক:-সবাই আবারো একসাথে বলে উঠল, আমীন!
আনন্দ:- চলুন কেকটা কাটি,যদিও আমি এরকম ভাবে জন্মদিন পালন করা পছন্দ করি না তবুও শুধু মেয়ের খুশির জন্য করেছি তাই কেউ বিষয়টা নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করবেন না দয়া করে। চলো প্রিন্সেস!
কথক:- শেষের কথাটি মেয়ের হাত ধরেই বলে।
কথক:-অনুষ্ঠান শেষে বাসায় এসে খুশিকে ওর রুমে শুইয়ে দেয়। অতিথি বেশি দেখে আনন্দ ঝিলিক খুশির রুমে গিয়ে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেদের রুমটা আনন্দের মা বাবার জন্য ছেড়ে দিয়েছে। বাকীরা অন্য রুমসহ ড্রয়িং রুমে যে যার ইচ্ছা মতো শুয়েছে। আনন্দ খুশির বেডে এক পা ঝুলিয়ে বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করে তারপর ঘুমিয়ে পড়ে।
কথক:-সকালে, আনন্দ তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছে,,,
আনন্দ:- ঝিলিক! ঝিলিক!
ঝিলিক:- জ্বী!
কথক:-দৌড়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলো,
আনন্দ:- গত পরশুর নীল কালার ফাইলটা কই?
ঝিলিক:- আছে দিচ্ছি!
আনন্দ:- শোনো আমি মিটিং এটেন্ডের সময় তোমাকে ভিডিও কলে রাখবো,সো তুমি মেন্টালি প্রিপ্রেয়ার থেকো! বুঝেছো?
কথক:-ঝিলিক আনন্দের হাতে ফাইল দিয়ে বললো,
ঝিলিক:- হুম!
কথক:-আনন্দ ঝিলিকের ডান গালে নিজের হাত রেখে,
আনন্দ:- রিল্যাক্স থাকবে ; হাইপার হবে না। ঠান্ডা মাথায় পুরো মিটিং এটেন্ড করবে।ওকে?
ঝিলিক:- হুম! আপনিও!
আনন্দ:- চলো
কথক:-আনন্দ ড্রয়িং রুমে এসে দেখলো ওর মা আর শ্বাশুড়ি বসে গল্প করছে।ও মায়ের কাছে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
আনন্দ:- দোয়া করো আজকে আমার একটা বড় মিটিং আছে।যদি সাকসেস হই তাহলে অনেক বড় একটা অর্ডার পাবো।এতে করে আমার ফ্যাক্টরিটা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
মা:- অবশ্যই দোয়া করি। সবসময় দোয়ার মাঝে তোমার সফলতাই কামনা করি। আল্লাহ তোমাকে জীবনে সবধরনের কাজে সফল করুক।
কথক:-ঝিলিক,ঝিলিকের মা, আনন্দ একসাথে বললো,আমীন!
কথক:- মা কথা শেষ করেই আনন্দের কপালে চুমু দিয়ে দিলো। আনন্দ মায়ের থেকে মুখ ঘুরিয়ে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে বসেও দোয়া চেয়ে নিলো,তিনিও মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দিয়ে দিলেন। ঝিলিকের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল অফিসে। ঝিলিক ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে, খুশিকে ঘুম থেকে তুলে,রেডি করিয়ে স্কুলে দিয়ে চলে গেল ফ্যাক্টরিতে। ওহ হ্যা বলাই হয় নি আনন্দ চাকরির পাশাপাশি নিজের একটি ছোট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলেছে।যেখানে আপাতত কাজ করে বিশটি মেশিনের কর্মচারী। মাত্র ১ বছর ৩ মাস হলো ওর কোম্পানীর।এর মধ্যে বেশ ভালো অর্ডার পেয়েছে। এবং বেশ কিছু ডেলিভারিও দিয়েছে। ঝিলিক এখন সংসারের পাশাপাশি, মেয়েকে সামলানো, নিজের মাস্টার্সের পড়াশোনা করার পাশাপাশি আনন্দের কোম্পানিরও দায়িত্ব পালন করেন। আনন্দের কোম্পানি বললে ভুল হবে,এই কোম্পানির ওনারশীপ আনন্দ ঝিলিকের নামেই করেছে। আনন্দ চাকরির পাশাপাশি নিজের সবটুকু সময় দেওয়ার চেষ্টা করে নিজের পরিবার আর নিজের কোম্পানীতে। এভাবেই ভালোবাসা আর কর্তব্যের মাঝেই কেটে যাচ্ছে ঝিলিক আনন্দের খুশির দিনকাল! এভাবেই ভালোবাসায় ভরে থাক পৃথিবী! সব নোংরা পরিস্কার হয়ে যাক ভালোর ছোঁয়ায়! সব অপবিত্রতা কেটে যাক পবিত্রতার আবেশে। সব অন্ধকার পরিষ্কার করে দিক আলোর দেখা! আমরা সবাই ঝিলিকের জন্য ঝিলিকের জীবনের আনন্দ খুশির জন্যও দোয়া করি।
নাম দিলাম ; আমার পূর্ণতায় তুমি!
এটা আমার লেখা দ্বিতীয় এবং সবার সামনে তুলে ধরা প্রথম গল্প।জানিনা কেমন হয়েছে,কেমন লিখতে পেরেছি তবে চেষ্টা করেছি নিজের সবটুকু দিয়ে। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যেন সুন্দর সুন্দর গল্প লিখতে পারি। আমি শেখ রীমা আক্তার আপনাদের দোয়া প্রার্থী।
সমাপ্ত







0 মন্তব্যসমূহ